বুধবার, ২৭ মে ২০২৬ ।। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ১০ জিলহজ ১৪৪৭


রোযা: তাৎপর্য ও ঐতিহাসিক পাঠ

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

উবায়দুল্লাহ তাসনিম।।

ইসলাম ধর্মে রোযা বা সিয়াম সাধনা ফরজ। রোযা এটা ইসলামের 'আরাকানে খামসা'র (পঞ্চস্তম্ভ) একটি। ইসলাম ধর্মমতে, রোযার সাদামাটা অর্থ হলো- ব্যক্তির সুবহে সাদিক থেকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও যৌনসম্ভোগ থেকে বিরত থাকা।

রোযার তাৎপর্য :

মানুষ দেহ, রূহ (আত্মা) দু'টি উপাদানে গঠিত। এ দু'টোরই আলাদা আলাদা চাহিদা রয়েছে। দেহের চাহিদা ঠিক অন্যান্য জীব-জন্তুর মতো। যা খাবার-দাবার, যৌনসম্ভোগ, ইত্যাদি কে কামনা করে। এ জৈবিক চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে ইসলাম নিয়ন্ত্রিত অনুমোদন করেছে। বিশেষ প্রেক্ষাপট ( যেমন নামায ও রোযাবস্থা থাকা) ছাড়া হালাল যত খাবারের জিনিশ রয়েছে, সেগুলো খেতে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে হারাম খাবার থেকে ( সবসময়ই) নিষেধ করা হয়েছে। এমনিভাবে যৌন সম্ভোগেও অন্যান্য প্রাণীর মতো অবাধ না রেখে নিয়ন্ত্রণ আনা হয়েছে। শুধু স্ত্রী ও দাসী থেকে যৌন উপভোগ করার বিধান দিয়েছে ইসলাম।

দ্বিতীয় যে উপাদানটা, এর সঠিক ব্যবহারে ব্যক্তি পূর্বের প্রাণীসত্তা অতিক্রম করে মর্যাদায় ফেরেস্তারও স্তর ছাড়িয়ে যায়।

বিপরীতে অর্থাৎ শুধুই জৈবিক চাহিদা পূরণের মাধ্যমে এবং আত্মার অশুদ্ধ ব্যবহারে সে সাধারণ প্রাণীদেরও নিচে নেমে যায়। কুরআনের ভাষায়,তারা চতুষ্পদ প্রাণীর মতো, বরং আরো নিকৃষ্ট।(সূরা আরাফ,১৮৯)

সুতরাং 'শুধুই দৈহিক চাহিদা পূরণ ও আত্মার অপব্যবহার' এটা মনুষ্যবিকাশ সাধনে দুর্মর বাঁধা। আর, রোযা 'স্রেফ জৈবিক বাসনা পূরণ'কে নিয়ন্ত্রণ করার একটা অন্যতম সহায়ক বিধান। কুরআনুল কারিমেও এ দিকে ইশারা রয়েছে। রোযা কেন ফরজ করা হয়েছে? এ প্রশ্নটার উত্তর কুরআন এভাবে দিয়েছে-' যেনো তোমরা মুত্তাকি হতে পারো'-। দার্শনিকগণ মনে করেন, মানুষ যেনো পানাহার ও সম্ভোগ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে ফেরশতার স্তরে উপনীত হতে পারে এই জন্য রোযার বিধান।

রোযা তাই আধ্যাত্মিক উন্নতির সবিশেষ মাধ্যম।

ইসলামের প্রথম দিকে রোযা :

ইসলামের কিছু ইবাদত মৌসুম ভিত্তিক। যেমন হজ, রোযা ইত্যাদি। নিষিদ্ধ দিবস (দুই ঈদের দিন, আইয়্যামে তাশরিকের তিনদিন) ছাড়া সরা বছর রোযার নিয়ম থাকলেও আবশ্যকীয় রোযার মৌসুম হচ্ছে, রমজানের রোযা। দ্বিতীয় হিজরীতে রমজানের রোযা ফরজ করা হয়েছে।

ইসালামের প্রথম দিককার রোযার সাথে বর্তমানের রোযার আঙ্গিকগত পার্থক্য রয়েছে। বুখারীসহ অন্যান্য হাদিসের কিতাবে হযরত বারা ইবনে আযিব রা এর বর্ণণায় এসেছে, প্রথমদিকে ইফতারের পর ঘুমানোর পূর্ব পর্যন্ত পানাহারের অনুমতি ছিল। ঘুমিয়ে গেলে আর পানাহার সম্ভোগের সুযোগ ছিল না।

ফলত, অনেক সাহাবীর জন্য তা কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কেউ কেউ এ বিধান যথাযথ রক্ষা করতে পারছিলেন না৷ কায়েস ইবনে সারমাহ আনসারী নামের এক সাহাবী সরাদিন ক্লান্ত -পরিশ্রান্ত হয়ে যখন ঘরে এলেন, তখন খাবারের মতো ঘরে কিছু ছিল না। পরে স্ত্রী কিছু রান্না করে নিয়ে আসলে তিনি ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছেন। পরদিন না খেয়েই রোযা রাখার ফলে দুপুরে বেহুঁশ হয়ে মাটিতে লুটে পড়েন।

অনেক সাহাবী গভীর রাতে ঘুম ভাঙ্গার পর স্ত্রী সহবাসে লিপ্ত হয়ে পড়তেন। পরক্ষণ থেকে তারা মানসিক পীড়ায় ভুগে কষ্ট পেতেন। ইরশাদ হয়েছে,রোযার রাতে তোমাদের স্ত্রীদের সাথে সহবাস করা তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে... এখন থেকে তোমরা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে সহবাস করো এবং যা কিছু তোমাদের জন্য আল্লাহ দান করেছেন তা আহরণ করো।( সূরা বাকারা,১৮৭)

রমজানের রোযা ফরজ হওয়ার আগেও ইসলামে রোযার বিধান ছিল। আয়শা রা থেকে বর্ণিত, জাহেলিযুগে আশুরার দিনে কুরাইশরা রোযা রাখত। রাসূলুল্লাহ সা ও সেদিন রোযা রাখতেন। মদিনায় যাওয়ার পর তিনি নিজে রোযা রাখার সাথে সাথে অন্য মানুষদেরও রোযা রাখার আদেশ দেন। এরপর যখন রমযানের রোযা ফরজ হল, তখন রমজানের রোযাই ফরয হিশেবে বহাল থাকল। (তিরমিযি, হাদিস, ৭৫৩)

রোযার ঐতিহাসিক পাঠ:

রোযা শুধু ইসলাম ধর্মের বিধান, তা না ; পূর্ববর্তী আসমানী ধর্মেও রোযার বিধান ছিল। কুরানের ইরশাদ, হে ঈমানদারগণ! রমজানের রোযা তোমাদের উপর ফরজ করা হয়েছে, যেমনভাবে ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যেনো তোমরা মুত্তাকি (পরহেযগার) হতে পারো। (সূরা বাকার,১৮৩)

এখানে রোযার বিধানের ঘোষণাটা একটি উপমাসহ দেওয়া হয়েছে। উপমা দিয়ে যেমন রোযার মতো কষ্টকর বিধানে শান্তনা দেওয়া হয়েছে, এর সাথে তেমনি রোযার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও তুলে ধরা হয়েছে।

সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেম মনে করেন, 'পূর্ববতী' শব্দটা এখানে ব্যাপক। এটা আদম আ থেকে নিয়ে ঈসা আ পর্যন্ত সব নবীর উম্মত ও শরিয়তকে বুঝায়। নামায যেমন সব নবীর শরিযতে ছিল, একইভাবে রোযার বিধানও ছিল।

সিয়াম সাধনার ব্যাপারটা অনেক পুরনো।

পৃথিবীর সর্বপ্রথম মানব আদম আ ও হাওয়া আ কেও (এক প্রকার)রোযার (আত্মসংযম) পাঠ দেওয়া হয়েছিল। তাদেরকে জান্নাতে সব ফলমূল খাওয়ার অবাধ অনুমতি দিলেও একটি গাছের ফল খাওয়া থেকে কড়া নিষেধ করা হয়। আল্লাহ তা'য়ালা ইরশাদ করেন, ' এবং তোমরা দু'জন এর যেখান থেকে ইচ্ছা, পরিতৃপ্তির সাথে খেতে থাকো। কিন্তু এই যে গাছটা,এর নিকটবর্তী হয়ো না।(সূরা বাকারা, ৩৫)

ঐতিহাসিকগণ মনে করেন, এটাই মানবেতিহাসের সর্বপ্রথম রোযা।

হযরত দাউদ আ রোযা রাখতেন। হাদিস শরীফে এসেছে, উত্তম রোযা হচ্ছে সওমে দাউদ (দাউদ আ এর অনুসৃত নীতির রোযা)।

এক ব্যক্তি রাসূল সা এর দরবারে এসে বেশি রোযা রাখার আগ্রহ প্রকাশ এবং রোযা বৃদ্ধির কামনা করলে তিনি বলেন, তুমি আরো বেশি রোযা রাখতে চাইলে হযরত দাউদ আ যেভাবে রোযা রেখেছেন সেভাবে রোযা রাখো৷ তিনি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি কিভাবে রোযা রাখতেন? তিনি বললেন, দাউদ আ একদিন রোযা রাখতেন, আরেকদিন খাওয়া-দাওয়া করতেন।(সহিহুল বুখারি)

হযরত মূসা আ ফেরাউনের কবল থেকে মুক্ত হবার পর রোযা রেখেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় এসে দেখলেন ইহুদিরা আশুরার দিন রোযা রাখে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী ব্যাপার, তোমরা এ দিন রোযা রাখছো যে!’ তারা বলল, এটি একটি মর্যাদাপূর্ণ দিন। এ দিন আল্লাহ তায়ালা ফেরাউন ও তার কউমকে ডুবিয়ে মারেন এবং মূসা আ. ও তাঁর অনুসারিদের ফেরাউনের কবল থেকে রক্ষা করেন। তাই শোকর আদায় করার জন্য মুসা আ এ দিন রোযা রেখেছিলেন। আমরাও তাই এ দিন রোযা রাখি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘মূসা আ.এর বিষয়ে আমরা তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার।’ এরপর তিনি রোযা রাখেন এবং অন্যদেরকেও রোযা রাখতে বলেন।(মুসলিম:হাদিস নং১১৩০)

হযরত মূসা আ তূর পাহাড়ে যাওয়ার পর ত্রিশদিন অবস্থানকালে রোযা রাখেন। পরে আরো দশদিন বৃদ্ধি হলে সে দিনগুলোতেও রোযা রাখেন।

কোন কোন বর্ণণায় পাওয়া যায়, হযরত ইদরিস আ সারা জীবন রোযা রেখে গেছেন।

বিভিন্ন ধর্মে রোযা:

ইসলাম ধর্ম ছাড়াও অন্যান্য ধর্মে (মৌলিক পার্থক্যসহ রোযার (যেটা মূলত উপবাস) প্রচলন রয়েছে। হিন্দু ধর্মে রোযা (উপবাস) একটা আনুসাংগিক বিষয়। ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং আঞ্চলিক রীতি অনুসারে হিন্দু ধর্মে বিভিন্ন উপবাসের ব্যাপার রয়েছে।

বিভিন্ন উপলক্ষে হিন্দুরা উপবাস করে। কেউ কেউ বছরের নির্দিষ্ট দিনগুলোতে যেমন একাদশি, প্রদোষ, পূর্ণিমাতে উপবাস পালন করে। কেউ আবার সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট দেবতার জন্য যেমন সোমবার শিবের জন্য, বৃহস্পতিবার বিষ্ণুর জন্য উপবাস পালন করে। ভারত বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের একজন চেয়ারম্যান হিন্দু ধর্মমত নিয়ে একটি প্রবন্ধে লিখেছেন, হিন্দু ব্রাহ্মণরা পূজো-পার্বনসহ বিভিন্ন উপলক্ষে তারা উপবাস (রোযা) পালন করে। যাদের বার্ষিক রোযার সংখ্যা ২৪ টি।

বৌদ্ধ ধর্মেও রোযার প্রচলন আছে। গৌতম বৌদ্ধ টানা ছ'মাস বৌদ্ধদের সিয়াম সাধনা করেছেন। বৌদ্ধধর্মে সপ্তাহের একদিন অষ্টবিধানুসারে রোযার বিধান রয়েছে যাতে দুপুর থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত উপবাসে কাটাতে হয়। এছাড়াও বৌদ্ধ কম খাবারের মাধ্যমে সংযমের তালিম দিতেন। তিনি নিজেও তার শিক্ষাজীবনে কম খাবারে থাকতেন।

তূলনামূলক ধর্মতত্ত্ব (Comparative Religion) ঘাটলে দেখা যাবে, প্রাচীন প্রায় সব ধর্মেই রোযা পানাহার ত্যাগ ইত্যাদির প্রচলন ছিল। জৈন ধর্ম, ব্যবলনীয় ধর্ম, মিশরীয় ধর্ম, মেক্সিকো আদিবাসীদের ধর্ম সব ধর্মেই পানাহার ও যৌন সম্ভোগ ত্যাগের একটা অস্তিত্ব রয়েছে।

জৈন ধর্মের বিশ্বাস মতে একজন জৈন ধর্মালম্বী সে উপবাস থাকতে থাকতে মারা গেলে তার জন্য রয়েছে ঢের মর্যাদা।

মেক্সিকোর আদিবাসীদের ধর্মীয় বিশ্বাস হলো, কেউ একজন যদি দেবতা হতে চায়, তাহলে পানাহার ত্যাগ করে, জিহব্বার গোড়ায় শলা টুকিয়ে এভাবে কেউ যদি ১৬০ দিন পর্যন্ত রোযা রাখতে পারে তাহলে, সে দেবতা হতে পারবে। এভাবে প্রাচীন ইরাকের ব্যবলিয়নীয় ধর্ম, প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতাতে উপবাস সাধনার বিভিন্ন নিয়ম ছিল।

লেখক: শিক্ষার্থী

-এটি


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ