
|
কওমি সিলেবাসের সংস্কার: কিছু ভাবনা
প্রকাশ:
১৮ এপ্রিল, ২০২৫, ০৬:০৯ সকাল
নিউজ ডেস্ক |
|| মাওলানা মাহবুবুল হাসান আরিফী || কওমি সিলেবাসের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমরা অনেকেই সিলেবাসের সংস্কার ও যুগোপযোগী করার কথা বলি। প্রশ্ন হলো- কেন সেটা সম্ভব হচ্ছে না? আর কেনই-বা আমাদের সিলেবাসের যুগোপযোগী সংস্কার সম্ভব নয়; অবশ্যই এর কিছু কারণ আছে। এই লেখায় এবিষয়ে কিছু আলোকপাত করার চেষ্টা করব। এরপর নেসাবের সংস্কার সংক্রান্ত মৌলিক কিছু কথা বলার প্রয়াস চালাব ইনশাআল্লাহ। এক. ক. আমরা পুরো লেখাটি মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। লেখাটি ছিল সিলেবাস থেকে ‘শরহে আকাইদ’ কিতাবটি উঠিয়ে দেওয়া প্রসঙ্গে। লিখেছেন জামিয়া রাহমানিয়ার ছাত্রবৃন্দ। লেখাটি পড়া শেষ হলে উসতাদের মুহতারাম আমাদেরকে বললেন, তোমরা এর জবাব দাও। তখন আমাদের পক্ষ থেকে এর একটি জবাবি লেখা ইনকিলাবে পাঠানো হয়েছিল। লেখাটি তৈরি করেছিলেন সহপাঠী ভাই এহতেশাম হক কাসিমী। আমাদের লেখাটিও যথাসময়ে ইনকিলাবে ছাপা হয়েছিল। বছরখানেক পরের কথা। আমি তখন মাদানীনগর মাদরাসায় আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে পড়ি। হঠাৎ একদিন জামেয়া রাহমানিয়া থেকে ফারেগ আমার এক সহপাঠী যখন জানতে পারলেন আমি সিলেট দরগা মাদরাসায় পড়েছি, তখন তিনি বললেন আরে তোমরাই তো আমাদের আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলে! আমি আগা মাথা কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। তখন তিনি বিস্তারিত বলতে লাগলেন। তিনি বললেন, আমরা যখন মিশকাত জামাতে পড়তাম তখন ঢাকার বড় বড় কয়েকটি মাদরাসার ছাত্ররা মিলে একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। প্রত্যেক মাদ্রাসার ছাত্ররা একেকটি পত্রিকায় সিলেবাস সংস্কারের দাবি নিয়ে লিখবে। সে অনুযায়ী আমরাই প্রথম ‘শরহে আকাইদ’ সম্পর্কে লেখা শুরু করেছিলাম। ইনকিলাবে আমাদের লেখা ছাপা হওয়ার পরই আপনাদের জবাবি লেখা পেলাম। এদিকে আমাদের ‘শরহে আকাইদে’র উস্তাদ কিতাবটির একটি ব্যাখ্যা গ্রন্থের কাজ করছিলেন। ইনকিলাবে আমাদের লেখাটি ছাপা হওয়ার পর উসতাদে মুহতারাম ক্লাসে এসে খুব বকাঝকা করলেন। রাগারাগি করলেন। জামিয়া রাহমানিয়া যেহেতু দুটি তাই আমরা বললাম, হুজুর আমরা নই; ওই রহমানিয়ার ছাত্ররা এটি লিখেছে। হুজুর আর কিছু বলেননি। উপরের আলোচনায় আমরা দেখতে পেলাম দুজন উস্তাদ ‘শরহে আকাইদ’ কিতাবটি সিলেবাস থেকে উঠিয়ে দেওয়ার বিরোধিতা করেছেন, কারণ দুজনই দুটি ব্যাখ্যা গ্রন্থের কাজ করছিলেন। খ. লক্ষ্য করুন, ‘রওজাতুল আদব’ কিতাবটির চমৎকার বিকল্প এখন আমাদের সামনেই আছে। কিতাবটি তখন বেশ উপযোগী ছিল যখন এর সুন্দর কোনো বিকল্প ছিল না। আজ যেহেতু এর চমৎকার বিকল্প এসে গেছে, তাই আমরাও মনে করি এই কিতাবটি বাদ দিয়ে এর পরিবর্তে ঐগুলো যুক্ত করা হোক। কিন্তু ছাত্রদের লাভ এবং উপকার কতটুকু হবে সে চিন্তায় না গিয়ে, শুধু বোর্ডের আর্থিক দিক বিবেচনা করে কোনো গ্রন্থ সিলেবসে যুক্ত করার মতো মানসিকতা যদি বোর্ডের কর্ণধারদের থাকে, তাহলে আর যাই হোক সিলেবাসের যুগোপযোগী সংস্কার আদৌ সম্ভব হবে না, এটা নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে। গ. যাই হোক, আমার মূল আলোচনার বিষয় এটি নয়। বরং আলোচনার বিষয় হচ্ছে, ওই মিটিংয়ে যখন ‘আল-বালাগাতুল ওয়াযিহাহ’ কিতাবের প্রস্তাব রাখা হলো তখন অনেকে প্রশ্ন তুলেছিলেন- কিতাবটির তো নোট নেই, তাহলে আমরা কীভাবে পড়াব? আমার আলোচনার মূল পয়েন্ট এটিই। কথা হলো, সিলেবাসে কোনো কিতাব রাখা হবে, নাকি হবে না; বাজারে এর কী কী নোট আছে, কী কী ব্যাখ্যা গ্রন্থ আছে এর ওপর যদি নির্ভর করে; এই যদি হয় আমাদের শিক্ষকদের চিন্তাধারা, তাহলে এ বিষয়টি নির্দ্বিধায় বলা যায়, আমাদের কোনো শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমে নেসাবের সময়পযোগী সংস্থার কখনোই সম্ভব নয়। যাই হোক শেষ পর্যন্ত সেই কিতাবটি আর সিলেবাসে যুক্ত হয়নি। মুখতাসারুল মাআনী কিতাবকে উঠিয়ে এর বিকল্প কী আনা যেতে পারে কিংবা বালাগাতের কী কী কিতাব নেসাবে যুক্ত হতে পারে সেটা আমার আলোচনার বিষয় নয়। আমি যে পয়েন্ট নিয়ে আলোচনা করতে চেয়েছি সেটা হচ্ছে আমাদের সিলেবাসে উপযোগী সংস্কার কেন সম্ভব নয়। ঘ. প্রশ্ন হলো, বাস্তবেই যদি কিতাবটি দুর্বোধ্য হয়; ভাষা কিংবা বিষয়বস্তু যদি এতো কঠিন হয় যে আসলেই সেটা আমাদের ছাত্রদের উপযোগী নয়, তাহলে এমন কিতাব কীভাবেই-বা নেসাবে সংযোজন করা হয়। আর সিদ্ধান্তটি যদি উপযোগী হয়ে থাকে, তাহলে বুঝে নিতে হবে, আমাদের শিক্ষকদের অবস্থা এমন যে তারা যুগোপযোগী কোনো কিতাব পড়াতে অক্ষম। এই যদি হয় বাস্তবতা, তাহলে সুন্দর কোনো সংস্কারের চিন্তা করাই অনুচিত। ঙ. দেখুন, আমাদের মাদরাসাগুলোতে এখনও মিযানুর সরফ, পাঞ্জেগাঞ্জ ইত্যাদি ফার্সি কিতাবগুলো পড়ানো হয় এবং পরীক্ষায় কিতাবের ফার্সি ইবারতের অনুবাদ করতে বলা হয়। ফার্সি ভাষা ও সাহিত্যের জ্ঞান লাভ করা এখনো আপনার কাছে তুলনামূলক জরুরি মনে হতে পারে, সেটা একান্তই আপনার ব্যাপার। এজন্য তো ‘ফার্সি পহলি’ ‘তাইসিরুল মুবতাদি’ ‘গুলিস্তা’ ‘বোস্তা’ এগুলো পড়াচ্ছেন; কিন্তু সরফ, নাহব ইত্যাদি অতি জরুরি ফনের কিতাব পড়ানোর জন্য কেন ফার্সি ভাষাকে মাধ্যম বানাতে হবে? কেন? সেদিন আমি যে উত্তর পেয়েছিলাম এটি নতুন কিছু নয়, সেই পুরোনো কথাই; এগুলো আকাবির থেকে চলে আসছে!! যেন এগুলো ওহি; এতে কোনো পরিবর্তন পরিবর্ধন করা যাবে না। আমার কথা হলো,. তারা যদি মাতৃভাষায় পাঠদানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে ফার্সি থেকে তাদের মাতৃভাষা উর্দুতে আসতে পারেন, তাহলে আমরা কেন মাতৃভাষায় পাঠ দানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে ফার্সি এবং উর্দু থেকে বাংলা ভাষায় আসতে পারব না? কেন? চ. দুই. কেউ কেউ মনে করেন সংস্কার মানে হচ্ছে অমুক কিতাব পরিবর্তন করে এর পরিবর্তে আরেকটি কিতাব যুক্ত করে দেওয়া কিংবা নতুন কোনো কিতাব সংযোজন করে দেওয়া। এতেই কাজ হয়ে যাবে। একারণেই বিভিন্ন মাদরাসায় ব্যক্তিগতভাবে নেসাবের পরিবর্তন ও পরিবর্ধনে হাত দিয়ে নেসাবের মধ্যে জগাখিচুড়ি এবং হ-য-ব-র-ল অবস্থা সৃষ্টি করে রেখেছেন। সুতরাং নেসাবের সংস্কার ব্যক্তিগতভাবে নয়; বরং এজন্য চাই সম্মিলিত গবেষণা এবং সুচিন্তিত পরিকল্পনা। তিন. আল্লাহর কালাম বুঝার জন্য আমরা তাফসিরের কিতাবসমূহের দ্বারস্থ হই। অথচ তাফসিরে বাইযাবির মুসান্নিফ তাঁর ইবারতের দ্বারা কী বুঝাতে চেয়েছেন, তাঁর ইবারতের মর্ম উদ্ঘাটন করতে করতেই আমাদের ছাত্রদের বছর শেষ হয়ে যায়; আল্লাহর কালামের মর্ম বুঝার তাদের সময় কোথায়! আর তাফসিরে জালালাইন তো বলতে গেল কুরআনে কারিমের আরবি অনুবাদ। তাহলে আমাদের ছাত্ররা দুটি বছরে আল্লাহর কালামের তাফসির কী শিখলো? আর কুরআনে কারিমে বিশুদ্ধ অনুবাদ? আমাদের ছাত্ররা এতে কতটা পারঙ্গম, এটা তো মাদরাসা সমূহের সাথে সংশ্লিষ্ট সবারই জানা থাকার কথা। ‘তাশহিযে আযহনে’র কথা বলে বর্তমান ছাত্রদের জন্য জটিল এবং দুর্বোধ্য কয়েকটি কিতাব নেসাবে রাখলেই তো চলবে না। দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত পড়ে শুধু কিতাব বোঝার যোগ্যতা অর্জন করলেই তো হবে না। কুরআন, হাদিস ও ফিকহের মৌলিক জ্ঞান যেন এই সময়েই অর্জন হয়ে যায় এবিষয়ের প্রতি লক্ষ রেখেই নেসাবের সংস্কার হচ্ছে সময়ের দাবি। তিন. |