
|
মুসলিম উম্মাহর সূর্যসন্তান পীর জুলফিকার আহমাদ নকশবন্দী রহ.-এর মিশন
প্রকাশ:
১৬ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১১:২৯ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
মুহাম্মাদ শামসুদ্দোহা কাসেমী জুলফিকার আহমাদ নকশবন্দী—শুধু একটি নাম নয়, একটি ইতিহাস। যে ইতিহাস শুধু পাকিস্তানের ঝং জেলার নয়; বরং মুসলিম উম্মাহর এক সোনালি ইতিহাস। পরবর্তী প্রজন্ম ইতিহাসের সোনালি পাতায় এটি যুগ যুগ ধরে পড়তে থাকবে, ইনশাআল্লাহ। পাকিস্তানের ভূমিপুত্র এই মহান সাধক মুসলিম উম্মাহর একটি বড় সম্পদ ছিলেন। তবে সেটি কোনো জাগতিক সম্পদ নয়—ছিলেন আত্মিক সম্পদ। যিনি অকাতরে উম্মাহর মাঝে সেই সোনালি ফসল বিতরণ করেছেন। কোনোটি বের হয়েছে তাঁর নূরানি কলম দিয়ে, কোনোটি বের হয়েছে তাঁর মোবারক জবান দিয়ে। তিনি যত কথা বলেছেন, সেগুলো সংরক্ষিত হয়েছে—কোনোটি বইয়ের মাধ্যমে, কোনোটি নেট-দুনিয়ার মাধ্যমে, আর কোনোটি আলোকিত হৃদয়ের মাধ্যমে। বিশ্ববাসী যে যে কারণে তাঁকে যুগ যুগ ধরে স্মরণ করবে, সেগুলো হলো তাঁর জীবনের অনুপম কর্মকাণ্ড— এক. তাআল্লুক মাআল্লাহ তিনি আমৃত্যু মানুষকে মহান আল্লাহ তাআলার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। কোটি কোটি হৃদয়ে প্রজ্বলিত করেছেন ইশকের প্রদীপ—যে প্রদীপ ধীরে ধীরে আলোকিত করেছে পৃথিবীকে। যারা মহান প্রভুকে চিনত না, তাদেরকে চিনিয়েছে। বিশ্বব্যাপী তাঁর দাওয়াতি সফর দেখলে তা গভীরভাবে অনুভব করা যায়। ৭২ বছর বয়সে তিনি আশিটি দেশ ভ্রমণ করেছেন। প্রতিটি দেশেই রয়েছে তাঁর অসংখ্য মুরিদ ও খলিফা। লাহোর থেকে বুখারা বইটি পড়লে মনে হয়—তিনি এসেছিলেন অন্ধকারাচ্ছন্ন হৃদয়গুলোকে আলোকিত করতে। নিজে যেমন প্রেমের আগুনে দগ্ধ হয়েছেন, তেমনি অপরকেও দগ্ধ করেছেন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র দুই–তিন ঘণ্টা ঘুমাতেন। সারারাত প্রায় বিনিদ্র থাকতেন। তাহাজ্জুদের সুবর্ণ সময়ে নিজেকে তাঁর রবের কাছে বিলিয়ে দিতেন। দুই. ইত্তিবায়ে সুন্নাহ আজীবন তিনি সুন্নাহর অনুসরণ করে চলেছেন এবং অপরকে চলতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। অসুস্থ অবস্থায় দুজন মানুষের সাহায্যে মসজিদে গিয়েছেন—শুধুমাত্র সুন্নাতে নববী অনুসরণ করার জন্য। তাঁর আপাদমস্তক ছিল সুন্নাহর এক অনুপম নিদর্শন। যা দেখলে শুধু চোখ জুড়াত না, বরং হৃদয় শীতল হয়ে যেত। তিনি ইলমে তাসাউফকে সুন্নাহর সঙ্গে একাকার করে দিয়েছেন। হাদিসের উঁচু সনদ লাভের জন্য ছুটেছেন পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। বড় বড় হাদিসবিশারদগণ তাঁকে সাগ্রহে হাদিসের উচ্চ সনদ প্রদান করেছেন—দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে সুদূর বুখারা পর্যন্ত। তিন. ইসলাহে উম্মাহ তিনি শুধু পাকিস্তানের মানুষকে ইসলাহ করেননি; বরং সমগ্র উম্মাহকে ইসলাহ করেছেন। সে কারণেই তিনি পরিচিত ছিলেন মাহবুবুল উলামা ওয়াস্-সুলাহা নামে—উলামা ও নেককারগণের হৃদয়বিজয়ী মনীষী। তাঁর বক্তৃতা-সংকলন খুতুবাতে জুলফিকার ও মাজালিসে ফকীর পড়লে বিষয়টি স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। আত্মশুদ্ধির লক্ষ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন দারুল ইহসান খানকাহ, যার শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়। চার. সকলকে আলেম বানানো নিজের সকল মুরিদ ও ভক্তকে যোগ্য আলেম হিসেবে গড়ে তুলতে তিনি আমৃত্যু চেষ্টা করেছেন। সে উদ্দেশ্যে গড়ে তুলেছেন মাহাদে ফকীর আল-ইসলামী নামক মাদরাসা। বর্তমান পাকিস্তানে বেসরকারি মাদরাসা শিক্ষা পর্ষদ বেফাকুল মাদারিসিল ইসলামিয়া-এর অন্তর্গত অসংখ্য মাদরাসা তাঁর ভক্তদের দ্বারা পরিচালিত। এই পর্ষদের অধীনে বর্তমানে প্রায় ২৭ হাজার মাদরাসা পরিচালিত হচ্ছে এবং প্রায় ৩৫ লক্ষ ছাত্রছাত্রী সেখানে অধ্যয়ন করছে। পাঁচ. যুগের ভাষায় কথা বলা মহান আল্লাহ তাআলা তাঁকে জাগতিক ও দ্বীনি—উভয় জ্ঞানের ধারক ও বাহক বানিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যেমন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন, তেমনি মাদরাসা থেকে হাফিয ও আলেম হয়েছেন। সেই সঙ্গে হয়েছেন উম্মাহর এক আধ্যাত্মিক রাহবার। একসময় উচ্চ বেতনে সরকারি চাকরিও করেছেন। ফলে দ্বীন ও দুনিয়াকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। যুগের ভাষায় কথা বলার কারণেই কোটি কোটি মানুষ তাঁর অনুরক্ত হয়েছে। একদিকে আধুনিক শিক্ষিত শ্রেণি তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছে, অপরদিকে ধর্মীয় ব্যক্তিত্বগণ তাঁকে একান্ত আপন ভেবেছেন। যাকে বলে সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব—তাঁর জানাযায় লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতিই তার প্রমাণ। লক্ষ প্রাণ তাঁর জন্য অঝোরে কেঁদেছে। সারা পৃথিবীতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বলেছেন— “মানুষের জানাযা দেখেই বোঝা যায়, সে ব্যক্তি হকের ওপর কতটা প্রতিষ্ঠিত ছিল।” আমার পীর ও শায়খ হযরত মাওলানা সালমান সাহেব বলেন— “শুধু ব্যক্তি হয়ে বেঁচে থেকো না; বরং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করো। কারণ ব্যক্তি একদিন চলে যায়, থেকে যায় তার ব্যক্তিত্ব।” আজ আমাদের মাঝে ব্যক্তি জুলফিকার আহমাদ আর বেঁচে নেই; শুধু আছে তাঁর অনুপম ব্যক্তিত্ব—যা তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন তাঁর অসংখ্য ভক্তবৃন্দ ও খলিফাদের মধ্যে। মহান আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের উচ্চ মাকাম দান করুন। তাঁর জিসমানি ও রুহানি সন্তানদের উত্তমরূপে ধৈর্য ধারণের তাওফিক দিন। তাঁর লাগানো ও সাজানো দ্বীনি বাগান সংরক্ষণের তাওফিক দিন। আমাদেরকে তাঁর চিন্তা-চেতনা, ভাব ও ভাবনার ধারক-বাহক বানিয়ে দিন। আর সমগ্র মুসলিম উম্মাহর পক্ষ থেকে তাঁকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমিন। লেখক: বিশিষ্ট আলেম লেখক ও চিন্তাবিদ, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত আরএইচ/ |