আলেমদের সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য ব্যারিস্টার আরমানের, সমালোচনার ঝড়
প্রকাশ: ২২ জানুয়ারী, ২০২৬, ০২:৪৩ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

সম্প্রতি এক পডকাস্টে ফ্যাসিবাদী আমলে গুমের শিকার হওয়া এবং ৫ আগস্টের পর ফিরে আসা ঢাকা-১৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ব্যারিস্টার আরমান বিন কাসেম আপত্তিকর বেশ কিছু কথা বলেছেন। একপর্যায়ে তিনি মন্তব্য করেন যে, পৃথিবীতে কোথাও ‘শরিয়াহ রাষ্ট্র’ নেই। এই মন্তব্যের পর তিনি হাসতে হাসতে বলেছেন, 'হুজুর will come after me with the চাপাতি’ (হুজুররা চাপাতি নিয়ে আমার পেছনে আসবে)। তার এই কথায় পাশে থাকা অন্য অতিথি ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমকেও হাসিতে ফেটে পড়তে দেখা যায়। তাদের এই আলোচনা নিয়ে নানা মহলে সমালোচনা হচ্ছে।

তরুণ আলেমদের সংগঠন ‘সাধারণ আলেম সমাজ’ এক বিবৃতিতে এই মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছে। সংগঠনটি বলছে, এই মন্তব্যটি কোনো নির্দিষ্ট উগ্রবাদী গোষ্ঠীর দিকে ছিল না, বরং এটি ছিল ঢালাওভাবে পুরো ‘হুজুর’ বা আলেম সমাজকে নিয়ে এক ধরনের কুরুচিপূর্ণ ব্যঙ্গ। প্রশ্ন জাগে, এই যে হুজুর মানেই রক্তপিপাসু, হুজুর মানেই চাপাতিধারী—এই কুৎসিত স্টেরিওটাইপিং কারা করে? এটি কি শাহবাগী বয়ানের পুনরুত্থান?

বিবৃতিতে বলা হয়, হুজুরদেরকে অসভ্য, বর্বর বা জন্তু হিসেবে উপস্থাপন করার এই লেন্সটি মূলত ‘শাহবাগী’ ঘরানার। পরিহাসের বিষয় হলো, সেই শাহবাগীরাই একসময় বিচারের নামে প্রহসন করে ব্যারিস্টার আরমানের বাবাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিল এবং তার নিজের গুম হওয়ার পেছনেও এক ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক বৈধতা তৈরি করেছিল। আজ যখন একজন ভুক্তভোগী নিজেই সেই জালিমদের সুরে আলেম সমাজকে তাচ্ছিল্য করেন, তখন একে বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়!

সাধারণ আলেম সমাজের বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের গত ৫০ বছরের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, চাপাতি, বন্দুক বা আগুনের রাজনীতিতে তথাকথিত ‘সেকুলার’ বা ‘গণতান্ত্রিক’ দলগুলোর রেকর্ড সবচেয়ে ভয়াবহ। দেশের ৯৯% রাজনৈতিক সহিংসতা যেখানে ছাত্রসংগঠন ও মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো করে, সেখানে আলেম সমাজকে ‘চাপাতিধারী’ হিসেবে চিহ্নিত করা চরম অবিচার।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে নিজেদের ‘সভ্য’ ও ‘লিবারেল’ প্রমাণ করার এক ধরণের মরিয়া চেষ্টা জামায়াতপন্থী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। তারা ভাবছেন, হুজুরদের ছোট করে বা সেকুলার ঢঙে কথা বলে তারা প্রগতিশীলদের মন জয় করতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যাদের খুশি করার জন্য এই প্রলাপ বকা হচ্ছে, তারা কখনোই তাদের আপন করে নেবে না।

মনে রাখা প্রয়োজন, ২০১৩ সাল থেকে আজ অবধি যখনই জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রশ্ন এসেছে, সাধারণ হুজুর বা আলেম সমাজই রাজপথে রক্ত দিয়েছে। জামায়াত নেতাদের ফাঁসির সময়ও এই সাধারণ মাদরাসা ছাত্র ও আলেমরা জীবন বাজি রেখেছিল। অথচ আজ সেই কৃতজ্ঞতাবোধ ভুলে গিয়ে লিবারেল স্টুডিওতে বসে হুজুরদের উপহাসের পাত্র বানানো হচ্ছে।

ব্যারিস্টার আরমান বিন কাসেম যে অন্ধকার সময় পার করে এসেছেন, তার জন্য সবার সহানুভূতি রয়েছে। কিন্তু আয়নাঘরের অন্ধকার থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি যদি আলেম সমাজকে ‘কলোনিয়াল লেন্স’ দিয়ে দেখতে শুরু করেন, তবে তা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক।

আমরা 'সাধারণ আলেম সমাজ'-এর পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানাচ্ছি, হুজুরদের ‘চাপাতিধারী’ সাব্যস্ত করে যে দায়িত্বজ্ঞানহীন কৌতুক তিনি করেছেন, তার জন্য তাকে জনসমক্ষে ক্ষমা চাইতে হবে। নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করার জন্য আলেম সমাজকে বলির পাঁঠা বানানোর যে প্রবণতা তাদের মাঝে দেখা যাচ্ছে, এটি তাদের জন্য মোটেও সুখকর কিছু হবে না।

এদিকে আলোচিত অ্যাকটিভিস্ট ও শিক্ষাবিদ ড. মোহাম্মদ সারওয়ার হোসাইন দুজনের ছবি শেয়ার করে এক ফেসবুক পোস্টে লিখেন- নৈতিক গ্রাউন্ডে এই পোস্ট লিখতে বাধ্য হলাম। ছবির দুজনকে পছন্দ করতাম। একজন গুম সারভাইভর, আরেকজন ডাকসুর জনপ্রিয় নেতা। আরমান সাহেবের গুমের কাহিনী শুনে আমি চোখের পানি আটকে রাখতে পারিনি। লোকটার জন্য খুব মায়া হতো। অন্যদিকে সাদিকের বিজয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিলাম। একারণে আমাকে গুপ্ত হিসেবে নিয়মিত গালি সহ্য করতে হচ্ছে।

সম্প্রতি পডকাস্টে দেশের আলেম-ওলেমা তথা হুজুরদের লক্ষ্য করে জেনারালাইজডভাবে (সর্বোতভাবে) বাজে শব্দ ব্যবহার করে তাচ্ছিল্যের সাথে হাসাহাসি করেছেন যা সাধারণ মুসলিম হিসেবে শুনা পীড়াদায়ক। বিস্মিত হয়েছি।

ছবির দুজনের চেয়ে আমার বয়স অনেক বেশী। সিংগাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি/পোস্টডকের সময় (২০০২-২০১২) অনলাইনে ইসলাম বি/দ্বেষীদের অপপ্রচারের জবাব তৈরীতে কাজ করতাম, রাসুলুল্লাহ (সা) এর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার উন্মোচনে অনেক পরিশ্রম করেছি। তখন মুক্তমনা/ইসলামি বি/দ্বেষীরা ইসলামকে ডিমোনাইজ করতে গর্দান, চাপাতি নামক ট্যাগিংগুলো ব্যবহার করতো, খুব কষ্ট হতো।

এখন ইসলামপন্থী দলের মানুষরা সেই মুক্তমনাদের শব্দ ব্যবহার করে তাচ্ছিল্য শুরু করেছেন যা হজম করা অনেক অনেক কঠিন। আরমান সাহেব বলেছেন, সাদিক তা শুনে হাসাহাসি করেছেন। আপনারা এদেশের আলেম-ওলেমাদের তাচ্ছিল্য করে সামাজিকভাবে ইমেজ ধরে রাখতে পারবেন না, লিখে রাখেন।

কওমি ব্যাকগ্রাউন্ডের আলেম-ওলেমারা আপনাদের মতো পলিশড ওয়েতে কথা বলতে পারেন না, কিন্তু এ দেশে তাদের কারণেই ইসলাম টিকে আছে।

প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ হতে চাইলে আপনাদের পাবলিকলি ক্ষমা চাওয়া নৈতিক দায়িত্ব। ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত ভুল হয়ে থাকলে তা শুধরে নিন। দেখবেন, এতে মানুষের ভালবাসা পাবেন। আপনাদের শুভকাংখী।

আরএইচ/