খানকা থেকে জাতীয় সংসদে পীর অলিউল্লাহ
প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০১:২৫ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

|| মুফতি শেখ মু. নাঈম বিন আ. বারী ||

মাওলানা মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহ পীর সাহেব (কেওড়াবুনিয়া) একজন বাংলাদেশি ইসলাম পণ্ডিত ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ।

তিনি ১৯৮৩ সালে বরগুনা জেলার কেওড়াবুনিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর পিতা পীর আব্দুর রশীদ র. মরহুম পীর সাহেব চরমোনাই ফজলুল করিম র. এর সুযোগ্য খলিফা ছিলেন। তাঁর দরবারের নাম কেওড়া বুনিয়া দরবার শরীফ। দীর্ঘদিনের বংশীয় ঐতিহ্য তাঁর বিজয়ের দার উন্মুক্ত করেছেন। খানকার পীর হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে একমাত্র সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় আরো একজন পীর সাহেব পূর্ব পাকিস্তান জমিয়তে ইসলাম সভাপতি পীর মোহসেন উদ্দিন দুদু মিয়া (র.) ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ ৩৫ ফরিদপুর-০২ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। দীর্ঘ ৬০ বছর পর পূর্বপাকিস্তান তথা বাংলাদেশে একজন পীর সাহেব সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। 

তবে বাংলাদেশ সংসদে কাওমি আলেমদের পদচারণা নতুন নয় বরং বহুকাল ধরেই চলছে। স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বপ্রথম কাওমি ঘরনার আলেম হিসেবে মুফতি ওয়াক্কাস (র.) তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর-৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তারপর চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচননে জাতীয় পার্টির সাংসদ হিসেবে দ্বিতীয় বার নির্বাচিত হয়েছেন। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের হয়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় ঐক্যজোট থেকে তৃতীয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৮৬ সালে থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কাওমি ঘরনার একমাত্র আলেম হিসেবে তিন বার এমপি ও দুইবার প্রতিমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরগুনার দুটি সংসদীয় আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে জয় পেয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী। বরগুনা-১ (বরগুনা সদর, আমতলী ও তালতলী) আসনে হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী কেওড়াবুনিয়া পীর আলহাজ্ব মাওলানা মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহ।

বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী জেলা বরগুনার রাজনীতিতে ভো‌টের ফল কেবল সংখ্যায় ধরা পড়ে না। কিছু ফল লেখা থাকে স্মৃতিতে, কিছু ফল গড়ে ওঠে দীর্ঘ অভ্যাসে। আমতলী, তালতলী আর বরগুনা সদর মিলিয়ে এবারের সংসদীয় ফল ঠিক তেমনই এক পুরনো ধারাবাহিকতার নতুন অধ্যায়।

আমতলীর ৬৫টি কেন্দ্রে হাতপাখা প্রতীকের দাপট চোখে পড়ার মতো। এখানে হাতপাখা পেয়েছে ৫৫ হাজার ৪৭৫ ভোট। ধানের শীষ থেমেছে ৪১ হাজার ৩৮২ ভোটে। কিন্তু পাশের সাগরতীরের উপজেলা তালতলীর ছবিটা ঠিক উল্টো। ৩০টি কেন্দ্রে ধানের শীষ এগিয়ে। সেখানে বিএনপির প্রার্থী পেয়েছেন ২৮ হাজার ২৬০ ভোট, হাতপাখা নেমে এসেছে ২০ হাজার ৬৪৫ ভোটে। বরগুনা সদরে এসে ভোটের লড়াই আরো টানটান। ৯৫টি কেন্দ্রে ধানের শীষ পেয়েছে ৬৩ হাজার ৬৯৫ ভোট, হাতপাখা ৬২ হাজার ৩৯২। ব্যবধান এতটাই কম যে বারবার হিসাব মিলিয়ে দেখতে হয়।

তিনটি উপজেলার সবগুলো কেন্দ্রের ফল যোগ করলে দেখা যায়, হাতপাখা এক লাখ ৩৮ হাজার ৫১২ ভোট পেয়ে এগিয়ে রয়েছে। আর ধানের শীষের ঝুলিতে পড়েছে এক লাখ ৩৪ হাজার ৩৩৬ ভোট। দুই প্রতীকে ভোটের ব্যবধান মাত্র চার হাজার ১৭৫। এই অল্প ফারাকেই জেলার রাজনীতিতে বড় ইঙ্গিত দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। কারণ বরগুনার ভোট বরাবরই শুধু বর্তমানের নয়, অতীতের ধারাবাহিকতায় তৈরি। 

বরগুনার ইতিহাস বলছে, ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছেন। ৩৫ বছর পর সেই ‘দুর্গ’ গুঁড়িয়ে দিয়ে ইতিহাস গড়লেন পীর অলিউল্লাহ। স্থানীয়রা বলছেন, এর পেছনে তার পিতা পীর আব্দুর রশীদ র. দীর্ঘ দিনের সামাজিক মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতারও প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে ছিল। 

 

আইএইচ/