সেহরি নাকি সাহরী? বাংলা অভিধান কী বলে?
প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০৭:১৯ বিকাল
নিউজ ডেস্ক

|| মুফতি শেখ মু. নাঈম বিন আ. বারী ||

সেহরি বা সেহেরি বা সাহরী (আরবি: سحور, প্রতিবর্ণীকৃত: সুহুর, অনুবাদ 'ঊষার পূর্বের খাবার বা ভোরের আহার') হল রমজান মাসে ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা রাখার পূর্বে সেহরি হলো শেষ খাবার। রোজার সময় যে ক্লান্তি বা খিটখিটে ভাব আসতে পারে, ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী সেহরি সেই সমস্যাগুলো এড়াতে সাহায্য করে এবং বরকম বয়ে আনে। সেহেরি শব্দটি আরবি শব্দ সাহুর (سحور) থেকে এসেছে। সহীহ আল-বুখারীর একটি হাদিসে বর্ণিত আছে যে, আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেছেন, "নবীজি (সা.) বলেছেন, 'সেহরি খাও, কেননা সেহরির মধ্যে অনেক কল্যাণ নিহিত রয়েছে।"

ইসলামি রীতি অনুসারে, দিনের অন্যান্য তিনটি প্রধান খাবারের (নাস্তা, দুপুরের খাবার, রাতের খাবারের) পরিবর্তে রমজান মাসে দুটি প্রধান খাবার খাওয়া হয় - একটি হলো সুহুর, অপরটি হলো ইফতার। কোনো কোনো স্থানে ইফতারের পর রাতে আরেক দফা রাতের খাবারও খাওয়া হয়।  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

تَسَحَّرُوا فَإِنَّ فِي السَّحُورِ بَرَكَةً

“তোমরা সাহুর (সেহেরি) করো, কারণ সাহুরে (সেহেরিতে) বরকত রয়েছে।” (বুখারি ও মুসলিম)। উক্ত হাদিসে ভোর রাতের খাবার বুঝাতে ‘সাহুর’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু বাংলা ভাষায় তা ‘সেহরি’ ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ সেহেরি শব্দটি এখন বাংলা। এটাই যুগে যুগে বাংলা সাহিত্য, পত্র-পত্রিকা, গল্প-উপন্যাস, পুঁথি-কবিতা ইত্যাদিতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সর্বস্তরের মানুষের নিকট সুপরিচিত। এখন আরবি বললে এটাকে সাহুর বলতে হবে, আর বাংলায় বললে সেহরি বলতে হবে। এর বাইরে আর কোনো শব্দ নেই। আর বাংলা ব্যাকরণের দৃষ্টিতে বিদেশী কোন শব্দ যখন বাংলা ভাষায় ‘আত্তীকরপডণ’ হয় তখন সেটাকে পরিবর্তন করা ভাষা বিকৃতির শামিল। যেমন: ইংরেজিতে Table (টেবল) কিন্তু সেটা বাংলায় টেবিল। Apple (এ্যাপল) বাংলায় আপেল। এমন বহু বিদেশী শব্দ বাংলায় প্রবেশ করেছে। এখন কোন অতি পণ্ডিত ব্যক্তি এসে যদি বাংলায় কথা বলার সময় টেবিলকে ‘টেবল’ আর আপেলকে ‘এ্যাপল’ বলা শুরু করে তাহলে তা নি:সন্দেহে হাস্যকর ও ভাষা বিকৃতির শামিল বলে গণ্য হবে। সে কারণে প্রচলিত ‘সেহেরি/সেহরি’ শব্দকে ভুল আখ্যা দিয়ে ‘সাহারি' বলা অনুচিত বলে মনে করি। কারণ সেহেরি শব্দটি বহুল প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ বাংলা। তাছাড়া প্রকৃতপক্ষে ভোররাতের খাওয়া বুঝাতে হাদিসে ‘সাহুর; শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে; সাহারি নয়।
সুতরাং কেউ হুবহু হাদিসের শব্দ ব্যবহার করতে চাইলে ‘সাহুর’ শব্দটি ব্যবহার করতে পারে; সেহেরি বা সাহারি কোনটাই নয়। ব্যবহারিক বাংলা অভিধান মতে, সেহেরি/সেহেরী/সেহরি অর্থ: রোজা রাখার জন্য মুসলমানগণ সুবেহ সাদিকের আগে যে খাবার গ্রহণ করেন। এখানে সাহারি বা সাহারী কোনও বানান নেই। 

যে শব্দ'টি নিয়ে আলোচনার বিষয়বস্তু সে শব্দটি  আসলে শুদ্ধ ! ‘সেহেরি’ মানে কি যাদু? অনেকেই বলছেন, ‘সেহেরি’ মানে না কি যাদু। কিন্তু এ কথা সঠিক নয়। বরং আরবিতে 'সাহরুন' বা 'সিহরুন' উভয় শব্দের অর্থ: যাদু। যেমন: আরবি অভিধানে লেখা হয়েছে,

سحَرَ يَسحَر ، سَحْرًا وسِحْرًا ، فهو ساحِر ، والمفعول مَسْحور

আর ‘আস সাহারু’ অর্থ: শেষ রাত-ফজরের পূর্ব মূহুর্ত।

السَّحَرُ :آخرُ الليل قبيل الفجر

সুতরাং দেখা গেল, ‘সেহেরি’ শব্দটির অর্থ 'যাদু' বলা অভিধান সঙ্গত নয়।

ভোররাতের খাবার বুঝাতে ‘সাহরি’ শব্দটি শুদ্ধ নয়:
ভোর রাতের খাবার বুঝাতে ‘সাহরী' শব্দটি শুদ্ধ নয়। কারণ হল, হাদিসে ‘সাহরী’ শব্দের অর্থ: আমার বক্ষ বা সিনা। যেমন: নিম্নোক্ত হাদিসটি,
আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি প্রায়ই বলতেন, تُوُفِّيَ فِيْ بَيْتِيْ وَفِيْ يَوْمِيْ وَبَيْنَ سَحْرِيْ وَنَحْرِيْ

“আমার প্রতি আল্লাহর এটা নি'য়ামাত যে, আমার ঘরে, আমার পালার দিনে এবং আমার গণ্ড ও সিনার মাঝে রসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ইন্তেকাল হয়।” [সহিহ বুখারি, হা/ ৪৪৪৯]
সর্বোপরি, এটা এমন কোন শব্দ নয় যে, পরিবর্তন করলে তা শরিয়ত পরিপন্থী কাজ হবে বা গুনাহ হবে। যেমন: কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম ইত্যাদি।এগুলো পরিবর্তন করা শরিয়ত সম্মত নয়।
মোটকথা, সর্বস্তরের বাংলাভাষী মানুষ যে শব্দটি উচ্চারণ করে ও বুঝে এবং বাংলা ভাষা সাহিত্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ সে শব্দটি অবিকৃত রাখাই ভালো মনে করি। সুতরাং ‘সাহরি’ নয় বরং ‘সেহেরি/সেহরি/সেহেরী’ বলাই অধিক উপযুক্ত। এটি একান্তই আমার ব্যক্তিগত অভিমত। এ ক্ষেত্রে যৌক্তিকভাবে যে কেউ দ্বিমত করার অধিকার রাখে। আল্লাহু আলাম।

তথ্যসূত্র: বাংলা একাডেমি 'ব্যবহারিক বাংলা অভিধান',  সময়-ধর্ম মুফতি আবদুল্লাহ তামিম, মূল প্রবন্ধ: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।

 

আইএইচ/