রমজানে যে চার আমল বেশি বেশি করবেন
প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১১:৫০ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

রমজান ইবাদত ও আমলের বিশেষ মাস। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় এ মাসে মুসলমানরা বেশি বেশি ইবাদতে মনোযোগী হন। অনেকেই যারা সারা বছর নিয়মিত নামাজ আদায় করেন না, তারাও রমজানে মসজিদমুখী হন। রমজানের শুরুতে মসজিদগুলোতে উপচেপড়া ভিড় দেখা যায়। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই উপস্থিতি কিছুটা কমে আসে, তবুও রমজানের প্রাথমিক দৃশ্যই মুসলিম সমাজের ধর্মীয় উদ্দীপনার পরিচয় বহন করে।

রাসুলুল্লাহ (সা.), সাহাবায়ে কেরাম এবং পরবর্তী যুগের অনুসরণীয় আলেম ও নেককার ব্যক্তিরা রমজান মাস আমল ও ইবাদতে কাটাতেন। তাই এই বরকতময় মাসে কিছু আমল বিশেষভাবে বেশি বেশি করা উচিত।

১. কুরআন তিলাওয়াত

আল্লাহ তাআলা মানবজাতির হেদায়েতের জন্য পবিত্র কুরআন নাজিল করেছেন। এতে মানুষের জীবন পরিচালনার সব নির্দেশনা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন, নিজে তিলাওয়াত করেছেন এবং তিলাওয়াতে উৎসাহিত করেছেন।

রমজান হলো কুরআন নাজিলের মাস। তাই এ মাসে বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা সুন্নতস্বরূপ আমল। প্রত্যেক মুসলমানের উচিত অন্তত প্রতিদিন কিছু সময় কুরআন তিলাওয়াত করা, যদিও তা অল্পই হোক। আল্লাহ তাআলা বলেন—

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ

‘রমজান মাস, যাতে কুরআন নাজিল করা হয়েছে—মানুষের জন্য হেদায়েত, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।’ (সুরা বাকারা: আয়াত ১৮৫)

হাদিসে পাকে এসেছে—

كَانَ جِبْرِيلُ يُعَارِضُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْقُرْآنَ كُلَّ سَنَةٍ مَرَّةً، فَعَارَضَهُ مَرَّتَيْنِ فِي الْعَامِ الَّذِي قُبِضَ فِيهِ

‘প্রতি রমজানে জিবরিল (আ.) নবীজি (সা.)-কে একবার কুরআন শোনাতেন। কিন্তু তার ইন্তেকালের বছরে দুইবার কুরআন শোনান।’ (বুখারি ৬২৮৫)

২. দান-সদকা

রমজানে কুরআন তিলাওয়াতের পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলোর একটি হলো দান-সদকা। যদিও দান করা সারা বছরের আমল, তবে রমজানে এর ফজিলত বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এই মাসে দান করলে আল্লাহ তাআলা অনেক বেশি সওয়াব দান করেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানে বিশেষভাবে বেশি দান করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَجْوَدَ النَّاسِ، وَكَانَ أَجْوَدَ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ

‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল। আর রমজান মাসে তিনি আরও বেশি দানশীল হয়ে উঠতেন।’ (বুখারি ৬, মুসলিম ১৮০৩)

আল্লাহ তাআলা বলেন—

مَثَلُ الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنْبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ

‘যারা আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয় করে, তাদের দৃষ্টান্ত একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়।’ (সুরা বাকারা: আয়াত ২৬১)

৩. ইস্তেগফার পাঠ

ইস্তেগফার বা ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বান্দার গুনাহ মাফ করে দেন এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। মানুষ শয়তানের ধোঁকা, নফসের প্ররোচনা ও পরিবেশগত প্রভাবের কারণে নানা গুনাহে জড়িয়ে পড়ে। এসব গুনাহ থেকে পবিত্র হওয়ার বড় মাধ্যম হলো ইস্তেগফার। রমজান মাসে বেশি বেশি ইস্তেগফার করা বিশেষভাবে উপকারী আমল। আল্লাহ তাআলা বলেন—

فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا

‘আমি বলেছি, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর; নিশ্চয়ই তিনি অতিশয় ক্ষমাশীল।’ (সুরা নূহ: আয়াত ১০)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

مَنْ لَزِمَ الِاسْتِغْفَارَ جَعَلَ اللَّهُ لَهُ مِنْ كُلِّ هَمٍّ فَرَجًا وَمِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا

‘যে ব্যক্তি বেশি বেশি ইস্তেগফার করে, আল্লাহ তার সব দুশ্চিন্তা দূর করেন, সব সংকট থেকে উত্তরণের ব্যবস্থা করেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’ (আবু দাউদ ১৫১৮)

৪. জাহান্নাম থেকে মুক্তি প্রার্থনা

রমজান মাসে মানুষ বেশি বেশি নেক আমল করে এবং আল্লাহর রহমতের দরজা উন্মুক্ত থাকে। এ সময় দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি। তাই নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী দোয়া করার পাশাপাশি আল্লাহর কাছে জাহান্নাম থেকে মুক্তি প্রার্থনা করা উচিত। দুনিয়াবি প্রয়োজন অনেক থাকলেও সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো আখিরাতে মুক্তি লাভ করা। যে ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে, সে প্রকৃত সফলতা অর্জন করবে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

فَمَنْ زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ

‘যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সেই সফলতা লাভ করবে।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৮৫)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

إِنَّ لِلَّهِ عُتَقَاءَ مِنَ النَّارِ وَذَلِكَ كُلُّ لَيْلَةٍ

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা প্রতিদিন (রমজানের প্রতিটি রাতে) অনেক মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন।’ (তিরমিজি ৬৮২)

রমজান হলো আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সর্বোত্তম সময়। এই মাসে কুরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা, ইস্তেগফার এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির দোয়া—এই চার আমল বেশি বেশি করলে রমজানের প্রকৃত সুফল অর্জন করা সম্ভব। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত এই বরকতময় মাসকে মূল্যবান মনে করে যত বেশি সম্ভব নেক আমলে নিজেকে নিয়োজিত রাখা।

এনএইচ/