
|
মানবজীবনে খোদাপ্রেম
প্রকাশ:
১৩ এপ্রিল, ২০২৬, ০৭:৪৯ বিকাল
নিউজ ডেস্ক |
|| মুসা আল হাফিজ || আমাকে কে হত্যা করতে পারে প্রেম ছাড়া? কিন্তু প্রেমের হাতে নিহত হলে আমি তো নিহত হই না। জীবনের নতুন অর্থে প্রবেশ করি। মৃত্যু আমাকে মারতে পারে না, এটা তো চূড়ান্ত। মরণের মারণে মরে না মানুষ। সে স্থানান্তরিত হয় মাত্র। এক জগত থেকে আরেক জগতে যায়। কিন্তু যে জগতেই যাক, মানুষের আত্মা খুঁজে বেড়াচ্ছে পরম মোক্ষ, সে নিহিত আছে প্রেমে। বিচার-বুদ্ধি, যুক্তি ও প্রজ্ঞার সকল বয়ান আমরা শুনি। তারা আমাদের পথ দেখায়। মশালের মতো। প্রদীপের মতো। তারা বলে এই দেখো সত্য এবং এগিয়ে যাও। কিন্তু সত্যের যে পথ, তার মর্মমূলে নিহিত আছে প্রেম। সুফিরা বলেন, প্রেম দুই রকম— ১. বাহ্যিক বা দৈহিক প্রেম (ইশকে সুরী ও যাহেরী): এর মানে হচ্ছে যা কিছু দৃশ্যত ও বাহ্যত আকর্ষণীয়, সুন্দর তার প্রতি মুগ্ধ টান, আকর্ষণ। ২. অভ্যন্তরীণ বা প্রকৃত প্রেম (ইশকে বাতেনী ও হাকীকী ): যেহেতু যা কিছু সুন্দর তা-ই আল্লাহ তায়ালার জামাল ও কামালের ( সৌন্দর্য ও পূর্ণতার) তাজাল্লি (বিকীরণ) ,সেহেতু বাহ্যিক প্রেম অতিক্রম করে প্রকৃত প্রেমের স্তরে উপনীত হওয়া সম্ভব। প্রেম হচ্ছে আধ্যাত্মিক তৎপরতার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ সত্তাকে বিশোধনের একটি পদ্ধতি। হৃদয় বিশুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন হবার পর আল্লাহ তায়ালার নূর গ্রহণ করার জন্য উপযুক্ত হয়। হৃদয় যখন এমন একটি আয়নায় পরিণত হয় যাতে আল্লাহ তায়ালার কুদরতের বহিঃপ্রকাশসমূহ (মাযাহের) প্রতিফলিত হয়,তখন তাতে প্রকৃত বাস্তবতা তথা সত্য মুদ্রিত হয়ে যায় এবং তাতে সুস্পষ্ট হাকিকতে প্রবেশ করে মানুষ। সে নিজের মধ্যে আল্লাহর রহস্যসমূহকে আবিষ্কার করে এবং তার সাথে সম্পর্কসূত্রকে জীবন্ত করে। এই সম্পর্কসূত্র হচ্ছে মানবেসত্তার চিরায়ত আমানত। মহাকবি হাফিজ বলেছিলেন “যে আমানতের বোঝা আসমান বহন করতে পারে নি তার ব্যাপারে ভাগ্য পরীক্ষার লটারীতে আমার মতো পাগলের নাম উঠল। হ্যাঁ, মানুষই এই নিখিলে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব, আনুগত্য ও দায়িত্বের আমানত বহন করছে। এর বহিরাঙ্গণে আছে শরিয়ার শৃঙ্খলা, ভেতরে আছে জাগ্রত খোদাপ্রেম। খোদার ভালোবাসার ভাবাবেগ যখন মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেয়, তখন চিন্তা ও কর্মের সকল শাখা-প্রশাখা তারই রঙে রঙ্গিন হয়ে যায়। জীবনের কোনো গলি বা গোপন কোণও তার আওতার বাইরে থাকে না। কিছু দিকের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে। (১) খোদায়ী ভালবাসার সবচেয়ে গভীর প্রভাব মানুষের জীবনে কেন্দ্রিকতা সৃষ্টি করে । এই কেন্দ্রিকতা রবূবিয়্যত (প্রতিপালন) ব্যবস্থার একটি মহিমা এবং খোদার ওয়াহদানিয়্যত বা একত্বের উপর নিখুঁত বিশ্বাসের একটি অপরিহার্য ফলাফল। শিরক মানুষের চিন্তা ও কর্মের কেন্দ্রিকতাকে ধ্বংস করে। অতএব, এর চেয়ে গুরুতর কোনো মানবীয় পাপ হতে পারে না। এরপর যে জিনিস সেই কেন্দ্রিকতাকে সুগঠিত করে, ঈমানের আসল মহিমা, অটুট করে, এবং প্রকৃত অর্থে উজ্জীবিত করে, তা হলো মোহাব্বত ও ভালোবাসা। (২) যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সত্যিকার ভালোবাসার সম্পর্ক রাখে, সে সর্বদা নিজেকে তার সান্নিধ্যের অনুভবের মধ্যে আবিষ্কার করে। খোদার উপস্থিতির নিশ্চয়তা এমনভাবে হয়, যেন পরমকে তিনি নিজের চোখে দেখছেন। কবি ও সুফি মীর খুরদ রহ. হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া সম্পর্কে লিখেছেন যে, তিনি এই মনোভাব নিয়ে আল্লাহর দিকে অভিমুখী থাকতেন যেন তিনি তাঁকে দেখছেন।’ যখন একজন ব্যক্তি আল্লাহ তাআ'লাকে এইভাবে অনুভব করতে শুরু করে, তখন তার জীবনে সমস্ত পাপ রুদ্ধ হয়ে যায়। সে পাপ করতে সক্ষমই থাকে না, ‘বিচার দিবসের মালিকের’ দরবার সর্বদা তার চোখের সামনে থাকে। তিনি তার প্রিয়তমের উপস্থিতির অনুভবে এতটাই নিমজ্জিত হয়ে যান যে পাপ করার ফুরসতই তার মেলে না। হজরত শেখ আলী হুজবিরী (রহ.) লিখেন, আল্লাহ দেখছেন কেবল এই জাগ্রত চেতনা মানুষকে পাপ থেকে বিরত রাখে। (কাশফুল মাহজুব, পৃ. ১০) যখন একজন ব্যক্তি নিশ্চিতভাবে জানবে যে, খোদা তাকে দেখছেন, তখন তিনি কখনোই সে কাজ করবেন না, যা খোদার সামনে তাকে লজ্জিত করবে, অপরাধী করবে । (৩) আল্লাহর প্রেম যখন সম্পূর্ণরূপে প্রাধান্য পায়, তখন তা মানুষের উপর পার্থিবতার আধিপত্য থাকে না। তা কমতে কমতে মানুষের চোখে সোনা এবং পাথর বরাবর হয়ে যায়। (দেখুন হুজ্জাতুল্লাহ আল-বালিগা, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা ১৬৮) জড় জগতের আকর্ষণ তার জন্য অকার্যকর হয়ে উঠে। হজরত জুনাইদ আল-বাগদাদি রহ. এক রাতে আবদার করেন যে, হে আল্লাহ আপনি আমাকে বলে দিন বেহেশতের মধ্যে আমার বন্ধু ও সঙ্গী কে হবেন? আওয়াজ এলো, ওমুক রাখাল তোমার সঙ্গী। জুনাইদ বাগদাদি রহ. সেই রাখালের সাথে সাক্ষাৎ করলেন এবং কয়েক দিন ধরে তার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার পর জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি পাঁচওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে পড়েন, এ ছাড়া এমন কোনো কাজ করেন না। তাহলে কীসের দ্বারা এতো উচ্চস্থান অর্জন করলেন? সম্ভবত এই উচ্চ অবস্থান অধিকার করেছেন কোনো বাতেনী গুণের কারণে। রাখাল বললো, খাজা জুনায়েদ! আমি একজন অজ্ঞ মানুষ। কৃতিত্ব কাকে বলে আর বাতেন কি জিনিস, আমি জানি না। তবে আমার দুটি গুণ আছে। একটি হলো আল্লাহ যদি এই সব পাহাড়কে সোনায় পরিণত করেন এবং সেগুলোর মালিক আমি হই, তাতে উল্লসিত হবো না। সেগুলো যদি হাতছাড়া হয়ে যায়, তাতে ব্যথিত হবো না। দ্বিতীয়টি হলো কেউ আমার প্রতি রাগ করলে মনে করি এর পেছনে আছে আল্লাহর ইরাদা বা ইচ্ছা। দয়া করলেও মনে করি তা আসলে আল্লাহর তরফে ঘটেছে। প্রতিটি ব্যাপারকে আমি এভাবেই দেখি। (আল মাজালিস, কলমি নোসখা, মজলিসে হাফতুম, উর্দু অনুবাদ, পৃ. ২৭) মানুষের উপলব্ধিজগতের এই সব মাত্রা খোদায়ী ভালোবাসা থেকে উদ্ভূত হয়। (৪) আল্লাহর ভালবাসা এমন এক পর্যায়ে যায় যেখানে সুফি মনে করেন, ‘আমি আমার তাবৎ বিষয়কর্ম আমার রবের কাছে অর্পণ করেছি, তিনি চাইলে আমাকে বাঁচিয়ে রাখুন, চাইলে জীবন ছিনিয়ে নিন। তিনি যেমনটি চান, আমি ঠিক তাতেই খুশি। এমনতরো উপলব্ধি মানুষের মধ্যে তওয়াক্কুল ও ইসতিগনার এক অদ্ভুত অবস্থা তৈরি করে। দুনিয়ার জাঁকজমক, ধন-দৌলতের জন্য সে মোটেও পেরেশান থাকে না, বলে আল্লাহ কি তার বান্দার জন্য যথেষ্ট নয়? আল্লাহর রবুবিয়্যতের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস মানুষকে তার উপার্জনের দাসত্ব থেকে মুক্তি দেয়। তিনি আল্লাহর প্রতিশ্রুতির প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রাখেন। তাঁর প্রতিশ্রুতি হলো যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন করে, আল্লাহ তার জন্য পথ বের করে দেন৷ আল্লাহ তার জন্য এমন জায়গা থেকে রিযিক প্রদান করবেন যেখানে কারও কল্পনাও পৌছায় না। আল্লাহর উপর ভরসাকারী ব্যক্তির জন্য আল্লাহ যথেষ্ট। সে উপার্জনের জন্য কোনো অন্যায্য পথকে প্রশ্রয় দেয় না মোটেও। মানুষের চরিত্রের বিকাশ ও গঠনে, তার আয়-উপার্জনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। উপার্জনের পথসন্ধানে মানুষ সবচেয়ে বেশি ভুল করে। কোনো পার্থিব শক্তির মুখাপেক্ষিতা তার চরিত্রে অত্যন্ত মারাত্মক প্রভাব ফেলে। খোদাপ্রেম তা থেকে উত্তরণ দেয়। তামীরে খুদী বা "আত্ম-নির্মাণ" ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয়, যতক্ষণ না একজন ব্যক্তি তার সমস্ত ইমানি প্রত্যয়ের সাথে মহান আল্লাহকে তার জীবিকানির্বাহী হিসাবে গ্রহণ করবে না। সারকথা হলো, মানুষের অন্তরে আল্লাহর ভালোবাসা জাগ্রত হলে তার জীবনের ধরণ পাল্টে যায়। চিন্তা ও কর্মের সমুন্নতি ঘটে, সৃষ্টির সেবা, ন্যায়পরায়ণতা ও সত্যতার মতো অসংখ্য গুণাবলী, এই আবেগের নদীস্রোতে তরঙ্গিত হয়। আপনি প্রেমের পথে যাত্রা করবেন। হৃদয়ের দিকে দৃষ্টি দিন। আসেন, ইরাদাকে (ইচ্ছা) পবিত্র করি। পবিত্রতাকে আহরণ করি ঈমান থেকে। ঈমান আমাদের নিয়ে যাবে ইতিবাচক বা সৎ জীবন-যাপন, নিশ্চিন্ততা ও অন্তরের প্রশান্তির দিকে। ইরাদার ( ইচ্ছা) বিশুদ্ধতা অর্জনের প্রাথমিক পর্যায়ে যখন আছেন, আপনি হলেন ‘মুরীদ’ (ইচ্ছাকারী), সুফিরা মুরিদকে বলেন শিষ্য। আপনার এবার চাই একাগ্রতা ও দৃঢ়তা। যা আত্মদমনে আপনাকে অনুপ্রাণিত করবে। এই যে আপনার পাপপ্রবণ নফস (নফসে আম্মারা), তাকে নিজের প্রশান্ত নফসের (নফসে মুতমায়িন্না) অনুগত করার দীর্ঘ পথে আপনি এখন অভিযাত্রী। এই যাত্রাপথে লক্ষ্যপূর্ণ করতে হলে তিনটি আধ্যাত্মিক এলাকা পাড়ি দিতে হবে। অর্জন করতে হবে তিন স্তর। সেগুলো হচ্ছে - ১. তাখলিয়াহ্: মানে ‘খালি করা’;পারিভাষিক অর্থে শরীরকে সকল প্রকার অপবিত্রতা থেকে মুক্ত করার জন্য নিজেকে প্রবৃত্তির কামনা বাসনা ও ঝোঁকপ্রবণতা থেকে মুক্ত করা। ২. তাহলিয়াহ্: মানে ‘অলঙ্কার দ্বারা সুসজ্জিতকরণ’; পারিভাষিক অর্থ ব্যক্তির নাফসকে উন্নত নৈতিক গুণাবলী দ্বারা ভূষিতকরণ। ৩. তাজলিয়াহ: মানে ‘আলোকোদ্ভাসিত হওয়া’;পারিভাষিক অর্থ ঐশী সত্তায় নিমজ্জিত হওয়া অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা এক এবং অদ্বিতীয় এবং তিনি ভিন্ন আর কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই-এ সত্যের যথার্থ স্বীকারোক্তির লক্ষ্যে স্বীয় আমিত্বকে পরিত্যাগ করা। আমিত্বকে পরিহার করবার মধ্য দিয়ে আপনি খোদাপ্রেমের বিশেষ সীমানায় প্রবেশ করলেন।আপনি প্রেমের হাত ধরেছেন। সে আপনাকে কত সাগর, মরুভূমি পার হবার দিশা দেবে। সাতটি উপত্যকা পাড়ি দিতে হবে প্রেমের পথে। কোনোটাই সহজ নয় আদৌ। সেগুলোর দিকে তাকান। ১. তালাব (আকাঙ্ক্ষা ও সন্ধান) : প্রেমিকের মধ্যে জ্বলন্ত থাকবে না পাওয়ার বেদনা ও প্রতীক্ষার অনুভূতি। তাঁর অন্তর হবে ব্যাকুল, উদগ্রীব, অদৃশ্যজগতের জন্য আকুল আকাঙ্ক্ষী । সে সর্বত্র প্রিয়তমের সন্ধান করে। সন্ধানের এই পর্বে হৃদয়কে দক্ষ করা চাই। ২. ইশক (প্রেম) প্রেমিকের উদগ্রীব প্রতীক্ষা ও ঐকান্তিকতা হৃদয়ে তৈরী করছে জ্বালা ও জ্বলন। সুমিষ্ট অনুভূতি মধুময় করছে চিত্তকে। বিরহের বেদনা দগ্ধ করছে হৃদয়কে। প্রিয়তমের সাথে মিলনের তীব্র আকাঙ্ক্ষায় ও বিচ্ছেদের আগুনের মাঝখানে প্রেমিক আবর্তিত। প্রিয়তমের সন্ধানে কোন চেষ্টা থেকেই প্রেমিক বিরত থাকবেন না । তাঁর চেষ্টাগুলোকে পথ দেখাচ্ছে শরীয়ত। ৩. ইরফান : শরীয়ত অনুযায়ী আমলে আছেন প্রেমিক , তরীকতের পথ পাড়ি দিচ্ছেন। অন্তরে আসমানী ইলমের নুর চমকাবে। এই নুর নিয়ে আসবে সত্যউপলব্ধি। তা বাড়বে, বাড়তে থাকবে। আবার জোয়ার-ভাটাও চলতে থাকবে। প্রেমিক উপলব্ধি করবেন মহাবিশ্বে আল্লাহ তায়ালা ছাড়া অন্য কোন শক্তির অস্তিত্ব নেই। আত্ম উপলব্ধির বিকাশ ও স্বচ্ছতা উদযাপন করবেন। আল্লাহকে উপলব্ধি করার স্তরে উপনীত হবেন এবং সর্বত্র খোদায়ী নিদর্শন দেখবেন । ৪. ইসতিগনা (মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্তি) : এবার প্রেমিক কেবলই আল্লাহর দিকে , কেবলই তার সমীপে। আল্লাহ্ ছাড়া সবকিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন । হৃদয় কেবলই তার দিকে থাকবে। আর কোথাও নয়, আর কোথাও নয়। ৫. তাওহীদ: প্রেমিক এবার অনুভব করবেন মর্মরহস্য। তাঁর হৃদয়ে পরম প্রভুর তাওহিদ যেন সুস্থির, বাকমুখর। রহস্যের মর্মবাণী ও তাওহীদের শিখা নিজের হৃদয়ে জ্বলতে দেখবেন তিনি । ৬. হায়রাহ্ (দিশেহারা অবস্থা) : প্রেমিক এবার সর্বশক্তিমান ও মহামহিম আল্লাহ তায়ালার সীমা-পরিসীমাহীন মহিমার সামনে দিশেহারা ও হতবুদ্ধি অবস্থায় নিমজ্জিত। অনবরত এক বিস্ময় থেকে আরেক বিস্ময়ে হারিয়ে যেতে থাকবেন। এক তরঙ্গ থেকে আবর্তিত হবেন আরো অধিক তরঙ্গে। ৭. ফাকর ওয়া ফানা (দারিদ্র্য ও আত্মবিনয়) : প্রেমিকের বোধে এবার কোনো বহুত্ব নেই। জগতের কোথাও নেই। কারণ সকল কিছুই একত্বের শৃঙ্খলা। বহুত্ব একত্বের মাঝে বিলুপ্ত। নানা চরিত্রের ঢেউ, কিন্তু তারা সমুদ্রের সত্তায় বিলুপ্ত। প্রেমিক নিজেও বিলুপ্ত। কখনো নিজেকে হারান, কখনো ফিরে পান। প্রেমের দশায় তিনি এতোই প্রগাঢ়, প্রখর, প্রবল ও প্রদীপ্ত, যার মাত্রাগুলোকে জাহির করবার জন্য ভাষা অক্ষম হয়ে গেছে। খোদার প্রেমের শরাব পিয়ে প্রেমিক বেহুশ বটে, কিন্তু এই বেহুশির ভেতরে দুনিয়ার সকল হুশিয়ারের হুশকে অতিক্রম করে তিনি অনেক উর্ধ্বে, অনেক উর্ধ্বে। খোদায়ী প্রেমের বাস্তব পন্থা: আল্লাহর প্রতি ঈমানের ফল হলো আল্লাহর প্রেম— এ হাকিকত স্বীকার করার পর প্রশ্ন জাগে যে, বান্দার জন্য আল্লাহর ভালোবাসার বাস্তব পন্থা কী? মাওলানা আবুল কালাম আজাদ 'তরজমানুল -কুরআনে' (খণ্ড ১. পৃ. ১৮) এর জবাব প্রস্তাব করেন: "আল্লাহর ভালবাসার পথ তাঁর বান্দাদের ভালবাসার এলাকা দিয়ে এগিয়ে যায়। যে ব্যক্তি খোদার ভালবাসা চায়, তাকে অবশ্যই খোদার বান্দাদের ভালবাসতে শিখতে হবে। আল্লাহর ভালবাসায় তার সৃষ্টির জন্য সম্পদ ব্যয় করবে। কুরআন বলছে, তারা আল্লাহর ভালোবাসায় মিসকীন, এতিম এবং বন্দিদেরকে খাদ্য দান করে।"(সূরা আল-ইনসান: ৮) তাদের মন বলে যে, 'আমরা তো তোমাদের খাওয়াই কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। আমরা তোমাদের থেকে কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা কামনা করি না।"(সূরা আল-ইনসান: ৯)’' বিভিন্ন হাদীসে খোদাপ্রেমের ব্যবহারিক পন্থার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, হে মানব সন্তান! আমি অসুস্থ হয়েছিলাম, তুমি আমার সেবা করো নি। মানব সন্তান বলবে, হে আমার প্রভূ! কীভাবে আমি আপনার সেবা করব, আপনিতো সৃষ্টিকুলের প্রতিপালক? আল্লাহ বলবেন: তুমি কি জানতে না যে আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো? তুমি তো তাকে সেবা করো নি। তুমি কি জানতে না, যদি তার সেবা করতে তাহলে তার কাছে আমাকে পেতে? হে মানব সন্তান! আমি খাবার চেয়েছিলাম, তুমি আমাকে খাদ্য দাও নি। মানব সন্তান বলবে, হে আমার প্রভূ! কীভাবে আমি আপনাকে খাদ্য দেব, আপনিতো সৃষ্টিকুলের রব? আল্লাহ বলবেন: তুমি কি জানতে না যে আমার অমুক বান্দা খাবার চেয়েছিলো? তুমি তো খাবার দাওনি। তুমি কি জানতে না, যদি তাকে খাবার দিতে তাহলে তা আমার কাছে পেতে? হে মানব সন্তান! আমি পানি পান করতে চেয়েছিলাম, তুমি আমাকে পানি পান করাওনি। মানব সন্তান বলবে, হে আমার প্রভূ! কীভাবে আমি আপনাকে পানী পান করাবো, আপনিতো সৃষ্টিকুলের প্রতিপালক? আল্লাহ বলবেন: তুমি কি জানতে না যে আমার অমুক বান্দা পিপাসিত ছিল? তুমি তো তাকে পানী পান করাও নি। তুমি কি জানতে না, যদি তাকে পানী পান করাতে তাহলে তা আমার কাছে পেতে? (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৬৯।) হযরত বারা ইবনে আযিব থেকে বর্ণিত আছে যে, এক বেদুইন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর খেদমতে এসে হাজির হলো। এবং বললেন, আপনি আমাকে এমন কাজ শেখান যা আমাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে। নবীজি বললেন, মানুষকে গোলামি থেকে মুক্ত কর, মানুষের কাঁধকে ঋণের বোঝা থেকে মুক্ত কর, নিষ্ঠুর আত্মীয়ের হাত ধর। এটা না পারলে ক্ষুধার্তকে খাওয়াও এবং তৃষ্ণার্তকে পান করাও। আর ভাল কথা বল এবং খারাপ থেকে বিরত রাখ। যদি এটাও না পার, তবে নিজে অন্তত ভালো ছাড়া খারাপ বলো না। (ইমাম বোখারী : আদাবুল মুফরাদ) সুফিগণ খোদায়ী মোহাব্বতের এই ব্যবহারিক পন্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। মানুষের সেবায় নিবেদিত ছিল তাদের জীবন। মানুষের হৃদয়কে প্রেমের সম্পর্কসূত্রে গ্রথিত করতে তারা উদগ্রীব থাকতেন। কাউকে কষ্টে দেখলে মন খারাপ হয়ে যেত। ক্ষুধার্তের কথা মনে হলে গলার আহার আটকে যেত। মানুষের সেবাকে এই বুজুর্গরা তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বানিয়ে নেন। হযরত শায়খ নিজামুদ্দিন আউলিয়া রহ. বলতেন, কেয়ামতের বাজারে সবচেয়ে বেশি দামী পণ্যের নাম হলো মানুষের অন্তরকে শান্তনা দান। ’ (সিয়ারুল আওলিয়া, পৃ. ১২৮) হজরত নিজামুদ্দীন আওলিয়া (রহ.)বলেছিলেন: ইতাআত (আনুগত্য) দুই প্রকার: লাযেমী এবং মুতাআদ্দি। লাযেমী হলো যার উপকার কেবল কর্তাব্যক্তির কাছে পৌঁছায় এবং তা হলো নামায রোজা রাখা হজ ও তাসবীহ। মুতাআদ্দি হলো যা কর্তার মধ্যে সীমিত থাকে না, অন্যদের মধ্যেও উপকারের বৃষ্টি বইয়ে দেয়। অন্যের জন্য ব্যায় করা, সহানুভূতি প্রদর্শন করা ইত্যাদিকে মুতাআদ্দি আনুগত্য বলা হয়। এর সওয়াব অসংখ্য। (সিয়ারুল আওলিয়া, পৃ. ১২৮) মহান সুফিগণ প্রথম প্রকারের আনুগত্যে যেমন ছিলেন মগ্ন, তেমনি তাঁর সমগ্র জীবনকাল ছিল দ্বিতীয় ধরণের আনুগত্যের মোহনা । তারা নিজেকে ছাড়া বাকি সকলের জন্য ভাবতেন।মানে তাদের সকল সাধনা ছিলো সারা জাহানের মাখলুকের জন্য। নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন এ পথে। এমনকি আখেরাতের প্রাপ্তির প্রশ্নেও তারা ছিলেন ফেদা লি খালকিল্লাহ মানে আল্লাহর সৃষ্টির জন্য আত্মবিসর্জিত। নিজের জান্নাত-জাহান্নাম তার বড় চিন্তা ছিলো না, বড় চিন্তা ছিলো পুরো জগতের সমস্ত মুকাল্লাফের (মানুষ-জীনের) জান্নাত-জাহান্নাম। দুনিয়ার জীবনে তারা প্রত্যকের পেরেশানি ও দুশ্চিন্তা দূর করার জন্য প্রস্তত থাকতেন। লোকেরা যখন তাদের দুঃখকষ্টের গল্প বলত, তাদের হৃদয় অস্থির হয়ে উঠত। যেভাবে পারেন, সকলের হৃদয়কে তিনি শান্তির সন্ধান দিতেন , উপাদান জোগাতেন । শত্রুরা গালমন্দ করত, কিন্তু তাদের মন একে পাত্তা দিতো না । তারা বিশ্বাস করতেন, মন্দের প্রতিদান যদি মন্দ দিয়ে দেওয়া হয়, তবে এই দুনিয়ায় মানব জীবন সর্বনাশের হাতে সমর্পিত হবে। প্রকৃত তাসাউফ একমুখী , তার শেষ গন্তব্য মহাসমুদ্র; খোদার সন্তোষ ও সান্নিধ্য। কিন্তু তার পথ বিচিত্র । হাজারো নদীস্রোতে সে চলে। সকল নদীতে প্রবাহিত পানির নাম তাওহিদ। প্রধান স্রোতোধারার নাম খোদাপ্রেম ও সৃষ্টিসেবা। সত্যিকার আব্দিয়ত তথা খোদার দাসত্ব নদীর চলমানতা নিশ্চিত করে। এই আব্দিয়্তকে জীবন্ত করতে সুফি কত বাক, কত ভাঙন, কত চর আর জোয়ার-ভাটার মধ্য দিয়ে যান, তার কোনো ইয়াত্তা নেই। তার যাপনে যে হালতই আসুক, কম্পাসের কাটার মতো তার সত্তা মগ্ন -মনোযোগী থাকে আল্লাহর দিকে। জীবনের সকল প্রয়োজন ও আয়োজনের ভেতরেও তিনি আল্লাহর মারিফতের মধ্যে নিমজ্জিত থাকেন, যেভাবে আমাদের বেঁচে থাকা নিমজ্জিত থাকে হাওয়ার ভেতর। আইও/ |