অনাদৃত শিক্ষক ও শিক্ষকতা পেশার ভবিষ্যৎ
প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল, ২০২৬, ০৩:৪৭ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

|| মাওলানা আবু সাঈদ ||

‘কাঙিক্ষত শিক্ষার জন্য শিক্ষক: শিক্ষক স্বল্পতা পূরণে বৈশ্বিক অপরিহার্যতা।’ এটি ছিল ২০২৩ সালের শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য। শিরোনামটা আমাকে এই লেখা তৈরি করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। কারণ আমিও যে বিলুপ্ত হতে চলা এই মহান পেশার সাথে সম্পৃক্ত একজন নগন্য শিক্ষক।

ছোট বেলায় শিশুশ্রেণির বইয়ে একটি ছড়া পড়েছিলাম। ছড়াটি ছিল ‘যতনে রতন হয়, অযতনে ধ্বংস হয়’। ঐসময়ে ছড়াটির বার্তা না বুঝলেও এটা যে কত দামি কথা, এখন বুঝে আসে। সত্যিই, যতনেই রতন হয়। যত্ন করা হয় বলেই গাছ টিকে থাকে। যত্ন না করলে গাছ আর আগাছা উভয়ের পরিণতিই হয় অভিন্ন। আজকে শিক্ষকতা পেশায় শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। এ পেশা থেকে অধিকাংশ মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। খুদ শিক্ষকরাও এ পেশা ছেড়ে বিকল্প পেশা বেছে নিচ্ছেন। এর একমাত্র কারণ—শিক্ষকদের প্রতি অযত্ন, শিক্ষকতা পেশায় জড়িত ব্যক্তিদের প্রতি অবহেলা।

সরকার থেকে শুরু করে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের পরিচালক পর্যন্ত কেউই শিক্ষকের প্রতি যত্নশীল নয়। শিক্ষকরা প্রয়োজনীয় যত্নটা পান না কারোও কাছ থেকে। তাদেরকে যথাযোগ্য মূল্যায়ন করা হয় না। অনাদরে অবহেলায় মানবেতর জীবন কাটে বেশিরভাগ শিক্ষকের। তাহলে কিসের আশায় মানুষ শিক্ষকতার পেশা নিয়ে পড়ে থাকবে? পারিবারিক অবহেলা, সামাজিক অবজ্ঞা, প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়ন ও আর্থিক বঞ্চনার কারণে আজকে দক্ষ ও আদর্শ শিক্ষকের শূন্যতা তৈরি হয়েছে শিক্ষাঙ্গনগুলোতে। এই শূন্যতা দিনদিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, এ পেশার ভবিষ্যৎ খুবই অন্ধকার। অদূর ভবিষ্যতে চাকরি তালাশ করতে করতে টায়ারড অথবা চাকরি করে রিটায়ারড হওয়া লোক ছাড়া মেধাবী ও কর্মোদ্যমি কাউকে এ-অঙ্গনে পাওয়া মুশকিল হয়ে যাবে। মূর্খ বা অর্ধশিক্ষিতরা দখল করবে শিক্ষকতার জায়গা। তারা নিজেরাও বিপথগামী হবে গোটা জাতিকেও করবে বিপথগামী। এভাবে একটি অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত পঙ্গু জাতিতে পরিণত হবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

একজন শিক্ষক হিসেবে আমাকে যদি দুই কথায় শিক্ষক ও শিক্ষার হাল তুলে ধরতে বলা হয়, আমি বলবো,

১। রিজাল তৈরির (আদর্শ মানুষ গড়ার) মহৎ ব্রত নিয়ে শিক্ষকতা করেন; এমন মহান শিক্ষকের আজ খুবই অভাব।

২। কারোও কারোও মাঝে স্বল্প পরিমাণে এই মহৎ গুণ থাকলেও তারা ‘নিষ্ফলা মাঠের কৃষক’।

এরজন্য দায়ী নিশ্চয় সমাজ, রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের বর্তমান নিয়ন্ত্রক শ্রেণি। এদেরকে অভিশম্পাত করবে পরবর্তী প্রজন্ম।

মূল্যায়নের ভুল সংস্কৃতি:

ছোটেবেলায় আমাদেরকে শেখানো হতো, ‘লেখাপড়া করে যে, গাড়ি ঘোড়ায় চড়ে সে’। অবশ্য বাস্তবতা দেখে অনেকেইে এখন মজা করে বলে, ‘লেখাপড়া করে যে, গাড়ী চাপায় মরে সে।’ সবাই গাড়ি চাপায় না মরলেও মাইনকার চিপায় তো মোটামোটি অনেকেই পড়ে।

বর্তমানে শিক্ষা, নৈতিক শিক্ষা এবং নীতিবান শিক্ষিত মানুষেরা যে পরিমাণের অবজ্ঞা, অবহেলা, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার, তা দেখে নতুন প্রজন্ম আতঙ্কিত। তাদের মাঝে হীনম্মন্যতা বাসা বাঁধছে। ভুগছে তারা সিদ্ধান্তহীনতায়। হিসেব মিলাতে পারছে না যে, আখের এতো কষ্ট করে পড়ালেখা করার লাভ কী? প্রাপ্তির সম্ভাবনাই বা কতটুকু? সবজায়গায়ই তো শুধু অর্থ, ক্ষমতা, প্রদর্শনী ও লৌকিকতার জয়জয়কার।

পিছনের বেঞ্চের ছেলেটাই এলাকার বড় ভাইয়ের আশীর্বাদে ধাপিয়ে বেড়াচ্ছে সমাজে। রাজনীতির ডালপালা বেয়ে সম্মান ও ক্ষমতার মগডালে পৌঁছে যাচ্ছে। ক্লাস ফাঁকি দেওয়া, সকল পরীক্ষায় ফেল করা ছেলেটাই মানুষের হুজুগেপনার সুবাধে এখন দেশে প্রতিষ্ঠিত স্কলার। কিতাবের ইবারত পড়তে না পারা ছাত্রটি ইমামতি নিয়ে স্বাচ্ছন্দে জীবন যাপন করছে। অশিক্ষিতের এই বিজয়-উল্লাস দেখে মনোযোগী শিক্ষার্থীরা কিংকর্তব্যমিমূঢ়। প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন আর তেমন পড়াশোনা হয় না। পড়াশোনা নিয়ে কোনো প্রতিযোগিতাও নেই তেমন। মনমড়া হয়ে বসে থাকে ক্লাসে শিক্ষার্থীরা।

বিশিষ্ট আরবি ভাষাবিদ, মাওলানা মহিউদ্দিন ফারুকী এই বাস্তবতার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ‘প্রতিটি মাদরাসায় আবাসিক শিক্ষকদের বেতন পরিমাণে বেশি এবং নিয়মিত ক্লিয়ার রাখা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় মাদরাসাগুলোকে আবাসিক শিক্ষক সঙ্কটে ভুগতে হবে। সাধারণ শিক্ষকরা যখন দেখেন, ইমাম সাহেব সূতির মাড় দেয়া পাঞ্জাবি গায়ে পান খেয়ে ঘুরে বেড়ান, তখন মনে অনেক কষ্ট পান। আবাসিক থাকা বাদ দিয়ে ইমামতি খুঁজতে শুরু করেন।’ এটা তো কেবল এক দিকের কথা। সবদিক থেকেই এমন অসঙ্গতি ও উল্টো-স্রোতের জয়।

একসময় ‘শিক্ষার্থী ঝরে পড়া’ একটি গবেষণার বিষয় ছিল। ঝরে পড়ার কারণ উদঘাটনে শিক্ষাবিদরা আলোচনা করতেন। পরামর্শ দিতেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করতেন। বর্তমানে সেই সমস্যার সাথে যুক্ত হয়েছে ‘শিক্ষক ঝরে পড়া’র সমস্যা। হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বুঝেছেন। শিক্ষক ঝরে পড়াও এ যুগের একটি বড় সমস্যা। এটি নিয়েও গবেষণা হওয়া উচিত। এর যথাযথ কারণ উদঘাটনপূর্বক সমাধানে যত্নবান হওয়া প্রয়োজন। না হয়, অদূর ভবিষ্যতে শিক্ষাঙ্গন থাকবে। শিক্ষার্থীও থাকবে। থাকবে না মানুষ গড়ার কারিগর আদর্শ শিক্ষক।

যেখানে গাছের চেয়ে আগাছার কদর (যত্ন) বেশি, সেখানে গাছ জন্মায় না। জন্মালেও অযত্নে অবহেলায় একসময় তার মৃত্যু হয়। অথবা অস্তিত্বের স্বার্থে স্বকীয়তা বিলিয়ে দিয়ে নিজেও একসময় আগাছার মতো হয়ে যায়। শিক্ষাবিষয়ক কর্তৃপক্ষদের কি এগুলো নিয়ে ভাবার সময় হবে?

লেখক: মুহাদ্দিস, মাদরাসা দারুর রাশাদ মিরপুর

এমফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

জেডএম/