মহিলা মাদরাসা নিয়ে কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে কবে?
প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:১৮ রাত
নিউজ ডেস্ক

বিশেষ প্রতিনিধি

সম্প্রতি দুটি ঘটনায় নেতিবাচক খবরের শিরোনামে ‍উঠে এসেছে মহিলা মাদরাসা। একটি ঘটনা ঘটেছে কুমিল্লায়, আরেকটি নরসিংদীতে। দুটি ঘটনাই জাতীয় গণমাধমে ফলাও করে প্রচারিত হয়েছে। এর চেয়ে বেশি ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কুমিল্লায় একটি মহিলা মাদরাসার এক শিক্ষার্থীর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। ঘটনা আরও কিছু দিন আগের। তবে সম্প্রতি একটি টেলিভিশন চ্যানেল বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানী রিপোর্ট করেছে এবং সেখানে মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে দায়ী করা হয়েছে। আর নরসিংদীর ঘটনায় দশ বছরের এক ছাত্রীকে দিনের পর দিন ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে ওই মাদরাসার পরিচালকের বিরুদ্ধে। বিবিসিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবরটি ফলাও করে প্রকাশিত হয়েছে।

ঘটনা দুটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই ব্যাপক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কেউ কেউ মহিলা মাদরাসার বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছেন। এ জাতীয় মাদরাসা বন্ধ করে দেওয়ার দাবিও তুলেছেন কেউ কেউ।

উল্লিখিত ঘটনা দুটির সত্যতা কতটুকু সেটা তদন্তের দাবি রাখে। গণমাধ্যমে এলেই সব ঘটনা সত্য হয় না। এখানেও তেমনটি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আবার অনেক ঘটনা এমন আছে, যা ঘটে কিন্তু প্রকাশ্যে আসে না। মহিলা মাদরাসায় এ জাতীয় ঘটনা প্রায়ই ঘটে। কিছু ঘটনা প্রকাশ্যে আসে, কিছু আড়ালেই থেকেই যায়। এটা যে শুধু মহিলা মাদরাসায় ঘটে তেমন নয়, অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ঘটে। তবে মাদরাসা এবং আলেম-উলামার পরিবেশে এমন ঘটনা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। এটাকে স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যেকোনো মূল্যে এসব ঘটনা যেন আর না ঘটে সেটার ব্যবস্থা করা উচিত।

গত কয়েক দশক ধরে দেশে কওমি মহিলা মাদরাসার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। রাজধানীসহ সারাদেশেই শত শত মহিলা মাদরাসা গড়ে উঠেছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যাও হু হু করে বাড়ছে। দেশের দীনদার মানুষেরা তাদের মেয়ে সন্তানদের দীনি শিক্ষার উত্তম ব্যবস্থা হিসেবে মহিলা মাদরাসায় পাঠাচ্ছেন। নারী শিক্ষার প্রসারে নিঃসন্দেহে এসব মাদরাসা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

কিন্তু শুরু থেকেই মহিলা মাদরাসাগুলোর ব্যবস্থাপনাগত নানা সমস্যা ধরা পড়ছে। ঘিঞ্জি পরিবেশে, কয়েকটি কামরায় পরিচালিত হচ্ছে অনেক মাদরাসা। বেশির ভাগ মাদরাসাই আবাসিক। অথচ ছাত্রীদের থাকার মতো পরিবেশ নেই। অস্বাস্থ্যকর ও অনিরাপদ পরিবেশে থাকতে হয় শিক্ষার্থীদের। এর পাশাপাশি মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের কারো কারো দ্বারা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের খবরও প্রায়ই পাওয়া যায়। দীনি পরিবেশে এ ধরনের ছোটখাটো ঘটনাও অনেক গুরুতর। কেননা কেউ এখানে এ ধরনের কিছু ঘটবে সেটা কল্পনাও করে না। সেই আস্থা ও বিশ্বাস থেকেই দীনদার মানুষেরা তাদের মেয়েদের মাদরাসায় পাঠায়। স্কুল-কলেজ কিংবা আলিয়া মাদরাসায় এ ধরনের ঘটনা ঘটলে সেটাকে যতটা সহজভাবে নেওয়া হয়, সেটা কওমি মহিলা মাদরাসার ক্ষেত্রে নেওয়া হবে না- এটাই স্বাভাবিক।

শুরু থেকেই মুরব্বি আলেমদের কেউ কেউ কওমি মাদরাসার ব্যাপারে সতর্ক করে আসছেন। কেউ কেউ এসব মাদরাসার ঘোর বিরোধী। এর একমাত্র কারণ ফেতনার আশঙ্কা। তবে বৃহৎ কল্যাণের কথা চিন্তা করে ফেতনার আশঙ্কার পরও বেশির ভাগ আলেম-উলামা মহিলা মাদরাসার পক্ষে। দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী যেখানে নারী, তাদের উপযুক্ত দীনি শিক্ষার ব্যবস্থা ছাড়া জাতিকে সভ্য, নৈতিকতাসম্পন্ন ও খোদাভীরু বানানো সম্ভব নয়।

মহিলা মাদরাসার মূল সংকটের জায়গাটি হলো সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং তদারকির অভাব। যে যখন যেখানে খুশি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করছেন। অনেকে নিজের বাসার সঙ্গে কয়েক কামরা নিয়ে মাদরাসা গড়ে তুলছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দীনি ফায়দার চেয়ে ব্যক্তিগত ফায়দার বিষয়টি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। এতে অনেক ক্ষেত্রে নীতি-নৈতিকতা ও দীনিদারির বিষয়টি গৌণ হয়ে যাচ্ছে। তাতেই ঘটছে বিপত্তি। এর থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের ভাবতে হবে।

কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টাটি বাঁধবে কে? কওমি মাদরাসার তদারকির দায়িত্ব কে নেবে? দেশের সবচেয়ে বড় কওমি শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া। এর অধীনেই বেশির ভাগ মহিলা মাদরাসা। অথচ এই বোর্ডের পক্ষ থেকে দেশের হাজার হাজার কওমি মাদরাসা তদারকি করার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। আবার অনেক মাদরাসা এই বোর্ডের বাইরেও আছে। অন্যান্য বোর্ডগুলোর সক্ষমতা আরও কম। ফলে কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ অথরিটি আল-হাইয়্যাতুল উলয়া লিল-জামিয়াতিল কওমিয়ার ওপর বর্তায় এই দায়িত্ব। কিন্তু সেই সক্ষমতা কিংবা মানসিকতা কি আল-হাইয়্যার আছে? বেফাক-হাইয়্যা কারোই সেই মানসিকতা নেই। দিনের পর দিন মহিলা মাদরাসা নেতিবাচক সংবাদের শিরোনাম হলেও কোনো কর্তৃপক্ষেরই টনক নড়ছে না। কিন্তু এভাবে কতদিন- সেই প্রশ্ন উঠছে নানা মহল থেকে।

আইও/