
|
যৌতুক ও কনে-বাড়ির ভোজ, প্রচলিত রোগ
প্রকাশ:
০২ মে, ২০২৬, ০৪:০১ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
|| মুহাম্মদ আরশাদ || বিয়ে একটি মহান ইবাদত। যার সূচনা হয়েছে আদি মানব হজরত আদম ও হাওয়া আ.-এর মাধ্যমে এবং তা জান্নাতেও অব্যাহত থাকবে। শরিয়তের দৃষ্টিতে বিয়ের মধ্যে কোনো জটিলতা, দুঃখ-বেদনা কিংবা বাড়াবাড়ি নেই। নেই কোনো ধরনের গুনাহের আয়োজনও। শরিয়ত মোতাবেক বিয়েতে রয়েছে বরকত আর রহমত; শান্তি আর গভীর ভালোবাসা। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো—বর্তমান সমাজে, সহজে পালনযোগ্য ইবাদতকে বিজাতীয় কালচারের সঙ্গে জড়িয়ে কঠিন থেকে কঠিনতর করে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা আজকাল মারাত্মক ব্যাধির রূপ ধারণ করেছে। যার মধ্যে ‘যৌতুক’ আর ‘কনে-বাড়ির ভোজ’ অন্যতম। এসব হিন্দু সমাজ কর্তৃক উদ্ভাবিত। যেমন ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া-তে উল্লেখ রয়েছে: হিন্দুদের বিবাহে যৌতুক বাধ্যতামূলক ছিল। আর তা দিতে হতো কনে বিদায়ের সময়। সে সময় পথে চোর-ডাকাতের আক্রমণের আশঙ্কায় যৌতুকের মাল রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরের সাথে অনেক লোক থাকত (কালক্রমে যা কনে-বাড়ির ভোজ রূপে রীতিতে পরিণত হয়)। হিন্দুদের সাথে সহাবস্থানের কারণে ধীরে ধীরে মুসলমানদের মধ্যেও এর অনুপ্রবেশ ঘটে। (ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া ১৩/১৯৯) বর্তমানে এই ভোজের আয়োজন ছাড়া বিয়ে যেন অসম্পূর্ণ। অথচ এটা শরয়িভাবে যেমন বর্জনীয়, তেমনি একজন বিবেকবান ব্যক্তির কাছেও তিরস্কারযোগ্য। কনে-বাড়ির ভোজ মানেই গুনাহের আয়োজন। হাকিমুল উম্মত আল্লামা শাহ আশরাফ আলী থানবী রহ. বলেন, ‘এ আয়োজনের আর কোনো মন্দ দিক থাকুক বা না থাকুক, এটা অবশ্যই আছে—বরযাত্রীর সংখ্যা দাওয়াতি সংখ্যার চেয়ে বেশি হয়, ফলে মেয়ে পক্ষকে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়।’ (ইসলামী শাদী: ১৭১) হাদিসে এ ধরনের মেহমানদের ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে— عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ دُعِيَ فَلَمْ يُجِبْ فَقَدْ عَصَى اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَمن دخل على غَيْرِ دَعْوَةٍ دَخَلَ سَارِقًا وَخَرَجَ مُغِيرًا» . رَوَاهُ أَبُو دَاوُد অনুবাদ: হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ‘ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দাওয়াত পেয়ে (ওযরবিহীন) প্রত্যাখ্যান করল, সে আল্লাহ ও রাসুলের অবাধ্যাচরণ করল। আর যে বিনা দাওয়াতে অংশগ্রহণ করল, সে যেন চোর সেজে প্রবেশ করল এবং লুণ্ঠনকারী হিসেবে বের হলো।’ (আবু দাঊদ: ৩৭৪১) এই হাদিসের অর্থ আবার এই নয় যে, সংখ্যা নির্দিষ্ট করে বরযাত্রী হলে এই আয়োজন বৈধ হবে! কারণ, যে আয়োজনে জুলুম বা (একপ্রকার) জোর খাটানো থাকে, নাম ও লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে থাকে—তা জায়েজ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যা আরও সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় নিচের হাদিস থেকে— وَعَن أبي حرَّة الرقاشِي عَن عَمه قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم: «أَلا تَظْلِمُوا أَلَا لَا يَحِلُّ মَالُ امْرِئٍ إِلَّا بِطِيبِ نَفْسٍ مِنْهُ» . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيُّ فِي شُعَبِ الإيمان হজরত আবু হুররাহ রক্কাশী (রহ.) তাঁর চাচা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘সাবধান! কারো ওপর জুলুম করবে না। মনে রেখো! কারো সম্পদ তার সন্তুষ্টি ছাড়া অন্যের জন্য হালাল নয়।’ (বায়হাক্বী-শু’আবুল ঈমান: ৫১০৫, মুসনাদে আহমদ: ২০৬৯৫) উল্লেখ্য: কনে পক্ষের মুখের কৃত্রিম হাসি সন্তুষ্টির পরিচয় বহন করে না। যদি করত, তাহলে ডাকাতদের ডাকাতি ও সন্ত্রাসীদের সন্ত্রাসও বৈধ হয়ে যেত। যদি কেউ প্রশ্ন করে—সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা কোনো প্রকার চাপ বা জোড়াজুড়ি ছাড়া স্বেচ্ছায় এই ভোজের আয়োজন করলে করলে অসুবিধা কোথায়? এর উত্তর হলো—হ্যাঁ, যাদের বিবেক আছে তারা অবশ্যই অসুবিধা খুঁজে পাবে। যেমন: ১। অবৈধ কাজ স্বেচ্ছায় করলে তা বৈধ হয়ে যায় না। ২। ব্যক্তিবিশেষের জন্য অবৈধ কাজ বৈধতা পায় না। ৩| সামর্থ্যবান ব্যক্তি যারা এমন ভোজের আয়োজন করে থাকেন, তারাও বাস্তবে নিজেদের কলিজার টুকরা কন্যার ভবিষ্যৎ চিন্তা করে বরের পক্ষকে আমন্ত্রণ জানান। কারণ, (তারা মনে করেন এবং অনেকাংশে যা বাস্তব)—এই আয়োজন না করা হলে মেয়েকে শ্বশুরবাড়িতে ছোট হয়ে থাকতে হবে; অনেক রকমের খোঁটা, তিরস্কার ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হবে। যদি আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়—স্বেচ্ছায় এই আয়োজনকে বরণ করার পেছনে এর চেয়েও আরও ভয়াবহ কারণ বের হয়ে আসবে। অতএব আসুন, বিবাহের মতো মোবারক ইবাদতকে বিজাতীয় কালচার থেকে মুক্ত করি। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেখানো সহজ ও সর্বোত্তম পথ অনুসরণ করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন। লেখক: মুহাদ্দিস জামিয়া ছমদিয়া আশরাফুল উলুম লোহাগাড়া চট্টগ্রাম আইও/ |