আলোময় মায়াময় টুকরো টুকরো স্মৃতিতে যওক সাহেব হুজুর রহ.
প্রকাশ: ০২ মে, ২০২৬, ০৫:৫৩ বিকাল
নিউজ ডেস্ক

|| শায়খ মিসবাহ উদ্দীন মাদানী ||

আমার ওপর আল্লাহর একটি বিশেষ নেয়ামত হলো- বড় হুজুর আল্লামা মুহাম্মদ সুলতান যওক নদভী রহ.-এর সাক্ষাৎ ও সান্নিধ্যের সুযোগ লাভ। ছাত্র হিসেবে এক বছর এবং হুজুরের মাদরাসার শিক্ষক হিসেবে সাড়ে পাঁচ বছর হুজুরের ছায়ায় থাকতে পেরেছি, আলহামদুলিল্লাহ।

হুজুরের জীবনের বাঁকে বাঁকে আল্লাহপ্রেম ও মহান মালিকের সাথে সম্পর্ক এবং জজবায়ে এশকে নবী সা. এর আলো ঝলমল বহু ঘটনা হুজুরের ছাত্র, শিষ্য, ভক্ত ও সাধারণ মানুষের কাছে প্রকাশিত হয়েছে। একবার বড় হুজুর রহ. তার কামরায় আমাদেরকে বুখারি শরিফের দারস দিচ্ছেন। একজন ছাত্র এবারত পড়ে যাচ্ছেন, হুজুর প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা উপস্থাপন করছেন। আমাদের সহপাঠী ছাত্রটি পড়া শুরু করল 'বাবু লিকাইল্লাহি তা'আলা' অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার মুলাকাত ও দীদার সম্পর্কিত পরিচ্ছেদের হাদীসগুলো পড়ে চলছেন। আমরা শুনে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ একটা অস্বাভাবিক বড় চিৎকার! আওয়াজের অস্বাভাবিকতায় আমিসহ কয়েকজন চিৎকার দিয়ে উঠলাম। কী হল? একটা চিৎকার। অতঃপর নীরবতা। আমরা বুঝলাম, হুজুর রহ. এর কলবে আল্লাহপ্রেমের অস্বাভাবিক 'ধড়কন' ও 'ওয়াজদ' এর হালত এসে গিয়েছিল। ‘ওয়াজদ’ হল ব্যাকুলতা ও ঐশ্বরিক প্রেমের একটি গভীর রহস্যময় অবস্থা, যা অনিচ্ছাকৃত প্রতিক্রিয়া হিসাবে প্রকাশ পায়। হুজুর কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ থাকার পর হুজুরের বড় কামরার পর্দা লাগানো বিশ্রামের খাস অংশে চলে যান। আমাদেরকে কিছুই বললেন না। আমরা কিছুক্ষণ বসে থেকে চলে আসলাম।

বড় হুজুর রহ. আশেকে রাসূল সা. ছিলেন। নবীজী সা. এর সুন্নতের অনুসরণ, প্রেম ও আনুগত্যের বহু নজীর আমাদের হৃদয়ে এখনো ভাস্বর হয়ে আছে। একটা ঘটনা বলি, একবার বড় হুজুর রহ. কে চট্টগ্রামের লোহাগাড়াস্থ স্বনামধন্য চুনতী হাকিমিয়া কামিল মাদরাসায় ২০২২ সালে আয়োজিত প্রাক্তন বিশিষ্ট ছাত্রদের সম্মাননা অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। অনুষ্ঠান শেষে খাওয়া দাওয়ার পর হুজুরকে বসার ব্যবস্থা করা হয়। হুজুরের ছাত্র, ভক্ত ও স্থানীয় অনেকে হুজুরকে ঘিরে বসেন। সেখানে আমিও উপস্থিত ছিলাম। হুজুরের তখন খুবই মা'জূরি হালত ও শারীরিক দূর্বল অবস্থা। ঐ আসরে হুজুরের এক ছাত্রকে হুজুরের নিজের রচিত নবীজীর শান ও এশকের উপর একটি উর্দূ শে'র গাইতে বলা হয়। ছেলেটি সুন্দর কন্ঠে গাইতে লাগল। গাইতে গাইতে এক পর্যায়ে সবাই নিরব, হঠাৎ হুজুরের অস্বাভাবিক চিৎকার ও কান্না। আল্লাহু আকবর! এই এশক ও প্রেমের কি কোনো তরজমা হয়!

২০১২ সালের শেষের দিকে হুজুর সৌদি বাদশাহর আমন্ত্রণে হজ্জের সফরে গেলে হজ্জের পর তিন দিন মদিনায় অবস্থান করেন। আমি মাত্র উচ্চ শিক্ষার জন্য মদিনায় গেলাম। এখনো হাজিরা মদীনায় আসা শুরু করেনি। মদীনার মসজিদে নববী প্রায় খালি।  এমন এক দিনে জুহরের পর আমি মসজিদে নববীর সম্প্রসারিত অংশের বাবে ওমরের কাছে ভিতরে বসে আছি একাকী। দেখি বাবুস সালামের উত্তর দিক থেকে তিনজন লোক এগিয়ে আসছেন, কাছে আসতেই দেখি বড় হুজুর রহ., ড. আফম খালিদ হুসাইন সাহেব ও ড. মুফতী ওলীয়ূর রহমান খান সাহেব নবীজী সা. এর রাওজা জিয়ারত সম্পন্ন করে এদিকে আসছেন। দৌড়ে গিয়ে হুজুরকে জড়িয়ে ধরলাম। হুজুরও মদিনায় আসার সাথে সাথে একজন প্রিয় শাগরেদকে পেয়ে খুশি হয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। হুজুরদেরকে সরকারিভাবে মসজিদে নববীর পাশেই ফাইভস্টার হোটেল দারুল ঈমানে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। আমিও লাগাতার তিনদিন হুজুরদের খেদমতে কাটিয়ে দিয়ে একটি পরম সৌভাগ্য লাভ করলাম। মদিনার মসজিদে নববীর পাশে বাঙালি মার্কেটে আমার আব্বার বাসা ও ব্যবসা থাকার কারণে হুজুরদের ভালভাবে খেদমত করতে আমার সুবিধা হয়। হুজুরদের জন্য আমার আব্বুর বাসা থেকে রান্না করে বাঙ্গালী খাবার, নাস্তা, ফলমুল ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আসতে পারতাম। এই সময় হুজুরের সাথে আমার শ্রদ্ধেয় প্রিয় বাবা হাজী আবু তাহের সওদাগরের ভাল পরিচয় ও সম্পর্কের সুযোগ হয়ে যায়। এরপর যখনই হুজুরের সাক্ষাতে গিয়েছি প্রায় প্রথমেই ‘তোয়ার বাজি কেন আছে?’ বলে আমার বাবা কেমন আছে জিজ্ঞেস করতেন। আমি মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে টিকার পর আমার বাবা খুশি হয়ে আমার জন্য একটা নিউ ব্র্যান্ডের সুজুকি কার কিনে দিয়েছিলেন। সেটি আমি লাইসেন্স নেওয়ার আগ পর্যন্ত আমার মেঝ মামা জনাব আনোয়ার হোসাইন ড্রাইভ করতেন। হুজুরসহ তিনজনকে আমার গাড়িতে করে মদিনার বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলাম।

একদিন সন্ধ্যায় কিছু সদাই পাতি কিনার জন্য হুজুরের সাথে বের হলাম। হুজুর সেন্ডেল কিনবেন, আমি বারবার এক জোড়া সুন্দর কালো সেন্ডেল এগিয়ে দিচ্ছিলাম। কিন্তু হুজুর বারবার এড়িয়ে যাচ্ছেন। আমি বুঝতে পারছিলাম না, হুজুর কেন বাদ দিচ্ছিলেন? আমি কয়েকবার এই সেন্ডেল এগিয়ে দেয়ার পর, হুজুর কিঞ্চিত হেসে বললেন, কা'বার কালো কিভাবে আমি পায়ে দিই! সুবহানাল্লাহ! যদিও শরীয়তে কোন বাধা নেই, কিন্তু হুজুর নিজের আবেগ ও অনুভূতিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। হুজুর দেশে ফেরার সময় হল। হুজুরকে বিদায় দিলাম। বিদায় দিয়ে কি যেন হারিয়ে ফেললাম! আমি কি হুজুরের প্রতি আমার ভক্তি ও মুহব্বত প্রমাণ করতে পেরেছি? অস্থিরতা থেকে হুজুরকে ম্যাসেজ করে ভাঙ্গাচোড়া আরবী দিয়ে লিখলাম, (قد ودعتكم يا شيخي والعين تبكي، اللسان صامت والقلب ينطق)। অর্থাৎ , "হে আমার শায়খ! আপনাকে বিদায় দিলাম, এদিকে আমার চক্ষু অশ্রুতে প্লাবিত। জবানে আপনার প্রতি ভক্তি ও মুহাব্বতের কিছুই প্রকাশ করতে পারিনি, কিন্তু হৃদয় সবাক ছিল।" হুজুর আমার ম্যাসেজ পেয়ে আমাকে ফোন দিলেন, "মিসবাহ, আমরা এখন বিমানে উঠব। চিন্তা করিয়োনা, আমি দোআ করছি। তোমার বাবাকে সালাম জানাইয়ো।" একথা বলে হুজুর মোবাইল কেটে দিলেন। কিছুটা সান্ত্বনা পেলাম যে, আমার ম্যাসেজ হুজুর পেয়েছেন। আমি পড়ালেখা শেষ করে দেশে আসলাম, দারুল মা‘আরিফে আমার নিয়োগ হল, কর্মজীবনে সফলতার ধারা শুরু হল, বড় হুজুরের স্নেহ ছায়ায় ৫ বছরের অধিক খেদমত করার সুযোগ, এরপর একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগদান, হুজুরের কাছ থেকে কষ্টকর বিদায়- আরো কত আলোকিত স্মৃতির সাথে জীবনের সাদাকালো কত কিছু ঘটে গেল- এসব অন্য কোথাও বিস্তারিত লিখব, ইনশাআল্লাহ। সংক্ষিপ্ত এই পরিসরে আজ এতটুকু।

আল্লাহ তা‘আলা হুজুরকে মাগফেরাত দান করে জান্নাতুল ফিরদাউসের আ'লা মাকাম নসিব করুন। আমাদেরকে তার কর্ম ও আদর্শের যত্ন নেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

هذا وصلى الله على سيدنا محمد و آله وصحبه أجمعين، و الحمد لله رب العالمين

লেখক: প্রধান, আরবি ভাষা ও ইসলামি দাওয়াহ বিভাগ, জামিয়া আরাবিয়া জিরি মাদরাসা, চট্টগ্রাম

জেডএম/