৩ মে: স্মরণীয় শোকরগুজারির দিন
প্রকাশ: ০৩ মে, ২০২৬, ০৭:২০ বিকাল
নিউজ ডেস্ক

|| মাওলানা মামুনুল হক ||

১৮ এপ্রিল থেকে ৩রা মে। মাত্র ১৫ দিন। কিন্তু ১৮ এপ্রিল ২০২১ থেকে ৩রা মে ২০২৪ টানা ৩ বছর ১৫ দিন। বন্দীত্বের সময়। কারা প্রকোষ্ঠে একাকিত্বের দুর্বিষহ সময়। রাতের অন্ধকারে মাবুদের দরবারে একান্তে আত্মসমর্পণ করার সময়। এই পূর্ণ সময়টা এতটা দুঃখ-কষ্ট ও যাতনার ছিল সেটা আজো আমি অনুভব করি। তবে বলতে পারি না।

কারাগারে থাকতে অনেক সময় এমন মনে হতো, একদিন এই দুঃখ ঘুচে যাবে। কেটে যাবে যতনার দিনগুলো। মুছে যাবে সব গ্লানি। তখন আমি এই কষ্টের কী বিনিময় প্রত্যাশা করব?  সচেতন মন আমাকে জবাব দিত, যে দুঃখ কষ্ট লাঞ্ছনা আর অপমান আমাকে সইতে হয়েছে, পৃথিবীর কোন বিনিময়েই আমি তুষ্ট না। আমি এর বিনিময় চাই শুধু আল্লাহর কাছে এবং পরকালে।

কথাগুলো শুধু এখন বলছি তা নয়, কারাগারে বন্দি থাকার সময়ও বারবার এটা অনুভব করতাম।  আমার আত্মবিশ্বাস ছিল, একদিন আল্লাহ জুলুমের অবসান ঘটাবেন। আরোপিত সকল অপবাদ থেকে মুক্তি পাব। সসম্মানে আবারো আপনজনদের মাঝে ফিরব। সমাজ ও রাষ্ট্রে সমাদৃত করবেন আল্লাহ। এইসব আত্মবিশ্বাস থাকার পরেও সুচিন্তিতভাবে এমনটাই হতো আমার অনুভব।

কারা মুক্তির আজ দুই বছর পূর্ণ হল। স্মরণ করলে কৃতজ্ঞতায় মাথা নুয়ে আসে। অশ্রুসজল হয় চোখ। ভাষা খুঁজে পাই না মালিকের কাছে শোকরগুজারির। আজো আমি তীব্রভাবেই কামনা করি, সেই কষ্ট দুঃখ আর অপমানের বিনিময় যেন মালিক আখিরাতে দান করেন।

২.

প্রতিদিন আসরের পরপর লকআপ করে দেয়া হয়। সেদিন লকাপের সময় আমার রুম খোলা রাখা হলো। কারণ ইতিমধ্যে আমার মুক্তির পরোয়ানা চলে এসেছে কারাগারের অফিসে। হাই সিকিউরিটি কারাগার, কাশিমপুর গাজীপুর। সৈকত ভবনের তৃতীয় তলার ১৫ নম্বর রুম। প্রতিদিন আসরের পরে এখানে একটা মজমা বসে। আমি থাকি তালাবদ্ধ রুমের ভিতর। বাইরে থাকে এক দুজন কারারক্ষী, আর দুজন সেবক। বিশেষ রেসিপির চা তৈরি হয়। কোনদিন দুধপাত্তি, কোনদিন হরেক রকম মসলা দিয়ে লাল চা। বেশ সুস্বাদু। চায়ের সাথে থাকে টা। সেদিনও আয়োজন ছিল। তবে সাথে ছিল একটা অনিশ্চয়তা। কারণ ইতিমধ্যেই আমাকে জানানো হয়েছে আমাকে আজকে লকআপ করা হবে না। লকআপ করে গুণতি হয়ে গেলে পরে বের করা কঠিন হবে। তাই আজ বন্দীদের মধ্যে আমাকে গুনতি করা হবে না। তাই আমি থেকে গেলাম লকআপবিহীন। সামানপত্র সব প্রস্তুত। যেকোনো মুহূর্তে ডাক আসলে জেল গেটে যেতে হবে আর তারপর সেখান থেকে মিলবে কাঙ্ক্ষিত মুক্তি। প্রতীক্ষার প্রহর গুণছিলাম। মাগরিবের আজান হলে নামাজ পড়ে নিলাম। ততক্ষণে ডাক চলে এসেছে গেটে যাওয়ার। বেরিয়ে এলাম মুক্তির আশায়। গেটে বসে থাকলাম দীর্ঘ সময়। জানালা দিয়ে দেখি বাইরে লোকজনের আনাগোনা। আপনজনদের বিচরণ। আকারে ইঙ্গিতে কথা বলছে তারা। আমাকে নিতে এসেছে তারা। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা থেকে ক্লিয়ারেন্স চলে এসেছে। এরপরও মুক্তি দেয়া হচ্ছে না। ধীরে ধীরে বাড়ছে অনিশ্চয়তা। ঘিরে ধরছে দুশ্চিন্তা। তবুও শান্ত রাখার চেষ্টা করলাম নিজেকে। এক সময় জানানো হলো আজা আর মুক্তি হচ্ছে না। আগামীকালের জন্য আবার অপেক্ষা!  ফিরে গেলাম তিনতলার ১৫ নাম্বার রুমে।রাত কাটেনা। সময় গড়ায় না। ঘড়ির কাঁটা যেন থমকে আছে এক জায়গায়। নানা দুশ্চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে মাথায়। না জানি আবার কোন নতুন ফন্দী আটা হচ্ছে। না জানি থমকে যায় আবার মুক্তি প্রক্রিয়া। নানা দুশ্চিন্তায় পার্শ্ব বদল করতে করতে একসময় রাত ফুরালো। ফজরের আজান হলো। ফজর নামাজ পড়ে আবারও অপেক্ষা। গাছের পাতা পড়ার শব্দেও উচ্চকিত হয়ে ওঠে আমার কান। এই বুঝি আবার বার্তা এলো মুক্তির। আলহামদুলিল্লাহ খুব বেশি বিলম্ব হয়নি। ডাক চলে আসে। বের হয়ে আসি আমি।

মে মাসের ৩ তারিখ শুক্রবার। সকল জল্পনার অবসান ঘটে। অবশেষে মিলে বহু কাঙ্ক্ষিত মুক্তি। আজ সেই ৩রা মে।

সেই সময়ের রাতগুলো মাঝেমাঝেই অনুভব করি।

আল্লাহুম্মা লাকালহামদু ওয়া লাকাশশুকর।

লেখক: আমির, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস

আইও/