আবাসিক মহিলা মাদরাসা বন্ধ করে দেওয়াই কি সমাধান?
প্রকাশ: ০৩ মে, ২০২৬, ০৯:৪১ রাত
নিউজ ডেস্ক

বিশেষ প্রতিনিধি

সম্প্রতি পরপর কয়েকটি নেতিবাচক সংবাদের শিরোনাম হয় দেশের কওমিভিত্তিক মহিলা মাদরাসাগুলো। জাতীয় গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ঘটনা তোলপাড় সৃষ্টি করে। যারা মাদরাসার অস্তিত্ব চায় না- তারা যেমন এসব ঘটনার প্রতিবাদে সরব হয়েছে, তেমনি কওমি মাদরাসা সংশ্লিষ্টরাও এসব ঘটনার বিচারে জোরালো দাবি জানিয়েছেন। মহিলা মাদরাসাগুলোর জবাবদিহিতা জোরদার করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তারা। মাদরাসার মতো দীনি পরিবেশে নৈতিক স্খলন কিংবা চারিত্রিক অধঃপতন কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার না। স্বাভাবিকভাবেই সবাই এসব ঘটনায় ব্যথিত হয়েছেন, মহিলা মাদরাসার ভবিষ্যৎ নিয়ে হয়েছেন চিন্তিত।

তবে কেউ কেউ আবাসিক ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। মহিলা মাদরাসায় আবাসিক ব্যবস্থাপনা বন্ধ করে দিতে বলেছেন। কিন্তু তাদের এই দাবি কতটা যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত সেটা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। মাথাব্যথায় মাথা কেটে ফেলে দেওয়া তো কোনো সমাধান না। দেশে কয়েক হাজার কওমি মহিলা মাদরাসা চলছে আবাসিক ব্যবস্থাপনায়। এসব মাদরাসার শিক্ষার্থীর সংখ্যাও লাখ লাখ। এই অবস্থায় আবাসিক ব্যবস্থাপনা বন্ধ করে দিলে কতজনের পড়াশোনা এখানেই থেমে যাবে, সেটা কি আমরা চিন্তা করে দেখেছি?

মাদরাসার আবাসিক পরিবেশে থাকলে মেয়েদের এক ধরনের ঝুঁকি আছে, এটা সত্য। আবার প্রতিদিন মাদরাসায় আসা-যাওয়ার পথের ঝুঁকি কি কোনো অংশে কম? যারা তাদের মেয়ে সন্তানদের মাদরাসায় দেয়, তাদের কয়জনের এমন সুযোগ বা সামর্থ্য আছে, প্রতিদিন মাদরাসায় নিয়ে আসা এবং ক্লাস শেষে নিয়ে যাওয়ার। এমন অনেক পরিবার আছে, যাদের এমন কেউ নেই। সুতরাং আবাসিক ব্যবস্থাপনা তুলে দিলে সেই পরিবারের মেয়েটির পড়াশোনার কী হবে!

দেশের দীনদার পরিবারগুলোর মধ্যে দিন দিন তাদের মেয়েদের মাদরাসায় পড়ানোর আগ্রহ ও প্রবণতা বাড়ছে। এটা অবশ্যই ভালো দিক। অনেকের বাড়ির আশপাশে স্কুল-কলেজ থাকলেও মাদরাসা সেভাবে নেই। ফলে দূর-দূরান্তে রেখেই মেয়েদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হয়। এই অবস্থায় আবাসিক ব্যবস্থাপনা তুলে দিলে অনেক মেয়ের পক্ষে আর পড়াশোনা চালানোই সম্ভব হবে না।

মহিলা মাদরাসার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আসে এর বেশির ভাগই আবাসিক মাদরাসাগুলোর বিরুদ্ধে, এটা ঠিক। তবে আবাসিক ব্যবস্থাপনা বন্ধ করে দেওয়াই এর একমাত্র সমাধান না। আবাসিক ব্যবস্থাপনা কীভাবে মেয়েদের জন্য আরও নিরাপদ করা যায় সেটা নিয়ে ভাবা যেতে পারে। যেসব মাদরাসায় আবাসিক ব্যবস্থাপনা মোটামুটি চলনসই নয় সেখানে বন্ধ করে দেওয়ার দাবি উঠতে পারে। কিন্তু ঢালাওভাবে পুরো আবাসিক ব্যবস্থাপনা বন্ধ করে দেওয়ার দাবি তোলা সমীচীন নয়।

মহিলা মাদরাসাগুলো চলে দেশের হাজার হাজার কওমি মাদরাসার আদলে। সেখানে ছাত্রদের ২৪ ঘণ্টা আবাসিক রেখে পাঠদান করা হয়। এটা কওমি মাদরাসার একটি বড় বৈশিষ্ট্যও। যেহেতু ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও সমানতালে কওমি মাদরাসায় পড়াশোনা করছে, এজন্য আবাসিক ব্যবস্থাপনা তুলে দিলে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা পিছিয়ে যাবে। এতে তাদের নিয়মতান্ত্রিক পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটবে।

মহিলা মাদরাসার ব্যাপারে ওঠা দুই চারটি অভিযোগও নিঃসন্দেহে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। কোনোভাবেই বিষয়টি হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। তবে এটাও সত্য, আমাদের সামগ্রিক সমাজব্যবস্থায় যেখানে অধঃপতন এসেছে এবং নৈতিকতার জায়গায় যে স্খলন ঘটেছে সেটা স্বাভাবিকভাবেই মাদরাসা ও আলেম-উলামাকে স্পর্শ করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এর জন্য পুরো শিক্ষাব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া কিংবা সিস্টেম আমূল পাল্টে দেওয়ার মতো দাবি তোলাও যৌক্তিক নয়। মাদরাসা-বিদ্বেষী একটি চক্র আছে, যারা এদেশে মাদরাসা থাকুক সেটাই চায় না- তারা তো তিলকে তাল করে মাদরাসার বিরুদ্ধে বলবে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের দেশের মিডিয়াও মাদরাসা সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলো যতটা ফলাও করে প্রচার করে, সাধারণ ধারার কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এর চেয়ে ভয়াবহ ঘটনাও ততটা প্রচার করে না। সেই গোষ্ঠীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঢালাওভাবে মহিলা মাদরাসা শিক্ষা বন্ধ করে দেওয়া কিংবা আবাসিক তুলে দেওয়ার মতো দাবি তোলার আগে একটু ভাবুন। মাদরাসাবিদ্বেষী চক্রের ফাঁদে আপনি পা দিচ্ছেন না তো!

তবে মহিলা মাদরাসার আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির দিন দিন অবনতি ঘটছে। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সংখ্যাও বেড়েই চলেছে। এসবের ওপর লাগাম এখনই টানতে হবে। আর এর জন্য দরকার, একটি শক্তিশালী কর্তৃপক্ষ। যতদিন কওমি মাদরাসার নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী কর্তৃপক্ষ না হবে ততদিন আবাসিক ব্যবস্থাপনা বন্ধ করেও পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো যাবে না। আবাসিকে ঝুঁকি বেশি থাকলে অনাবাসিকে কম ঝুঁকি হলেও আছে। খবরদারি বাড়ানো ছাড়া এই ঝুঁকি ঠেকানোর কোনো উপায় নেই।

আইও/