উলামায়ে কেরামের বেতন কাঠামো, অতীত ও বর্তমান
প্রকাশ: ১৩ মে, ২০২৬, ০৩:০৬ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

|| আলী আহমদ কাসেমী ||

একদিকে দ্রব্যমূল্য আকাশছোঁয়া হয়ে উঠছে, প্রতিদিন কমে যাচ্ছে টাকার মূল্য। অন্যদিকে দ্বীনের খাদেমদের বেতন কমানো হচ্ছে। একটা সময় ছিল, মানুষ অল্প কয়েক টাকাতেই জীবনযাপন করতে পারত। কিন্তু বর্তমান যুগে একজন মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করাই যেন এক দুরূহ সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এমতাবস্থায় ভাবার বিষয় হলো, যে ব্যক্তি একেবারেই নিম্ন আয়ের, সে কীভাবে নিজের জন্য দু’বেলা আহারের ব্যবস্থা করবে?

দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির ফলে পরিবারের উপার্জনকারী ব্যক্তিরা চরম দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। জীবনযাপনের প্রয়োজনীয়তা পূরণে নিরলস পরিশ্রম করেও কোনো সুরাহা চোখে পড়ছে না। এমন পরিস্থিতিতেও যেসব উলামায়ে কেরাম অল্প বেতনে দ্বীনি খেদমতে নিয়োজিত রয়েছেন, তাদের জন্য এ যুগে উপযুক্ত বেতনের মানদণ্ড কী হওয়া উচিত? যাতে তারা স্বাভাবিকভাবে জীবন নির্বাহ করতে পারেন। বর্তমান বেতন কাঠামোর বাস্তবতা কী?

বেতন ব্যবস্থার ভারসাম্যহীনতার ফলে যে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হচ্ছে, তা কীভাবে দূর করা সম্ভব? আকাবিরদের যুগে বেতনের মান কেমন ছিল? এসব বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনার চেষ্টা করা হবে এ প্রবন্ধে। আশা করা যায়, বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে এ বিষয়ে উৎসাহ ও সচেতনতা সৃষ্টি হবে।

আকাবিরদের যুগ-

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী মূলত দ্বীনি খেদমতের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ বৈধ ছিল না। পূর্ববর্তী হানাফি ফকিহগণও এ মতই ব্যক্ত করেছেন। তখনকার সময়ে উলামায়ে কেরামের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব ছিল বায়তুল মালের ওপর। কিন্তু ইসলামি শাসনব্যবস্থার অবসানের সঙ্গে সঙ্গে যখন বায়তুল মালের ব্যবস্থাও বিলুপ্ত হয়ে যায়, তখন পরবর্তী হানাফি ফকিহগণ দ্বীনি খেদমতের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণকে বৈধ বলে ফতোয়া দেন। বর্তমানে এ ফতোয়াই অনুসৃত হয়ে আসছে।

হযরত আতা রহ. থেকে বর্ণিত আছে, মদিনা মুনাওয়ারায় তিনজন শিক্ষক শিশুদের শিক্ষা দিতেন এবং হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদি. তাঁদের প্রত্যেককে প্রতি মাসে পনের দিরহাম করে প্রদান করতেন। (তারীখে দামেস্ক ২৪/৩৫)

আল্লামা নববি রহ. খতীব বাগদাদি রহ. এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে লিখেছেন, ইমামের ওপর আবশ্যক হলো, যে ব্যক্তি নিজেকে ফিকহ ও ফতোয়ার কাজে নিয়োজিত রাখবে, তার জন্য এমন পরিমাণ ভাতা নির্ধারণ করা, যা তাকে অন্য পেশার প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়া থেকে বিরত রাখবে। এ ভাতা বায়তুল মাল থেকে দেওয়া হবে। এরপর তিনি হযরত উমর রাযি. এর আমলের উল্লেখ করেন যে, যিনি ফতোয়া দেওয়ার যোগ্য হতেন, তাকে বছরে একশত দিনার প্রদান করা হতো। (মুকাদ্দিমাতু রাসমিল মুফতী, পৃষ্ঠা: ১৫)

১৫ হিজরিতে যখন সকল মানুষের জন্য ভাতা নির্ধারণ করা হয়, তখন হযরত উমর রাদি. এর জন্যও অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় সাহাবাদের সঙ্গে বছরে পাঁচ হাজার দিরহাম নির্ধারণ করা হয়। (আল-ফারূক ২/২৯৮)

হযরত উমর রাদি. এর কাছে ব্যয় নির্ধারণের একটি তালিকা ছিল। সেখানে ব্যক্তির ইলম ও মর্যাদা বিবেচনা করা হতো। কেউ যদি বদরি সাহাবি হতেন, তবে তার ভাতা বেশি হতো। একবার তিনি আহলে বাইতের সদস্যদের বেশি ভাতা প্রদান করলে তাঁর পুত্র হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদি. আপত্তি করেন। (আল-ফারূক ২/২৯৮)

‘জামে সগির’ এ বর্ণিত হয়েছে, কুরআনের ধারক-বাহককে বায়তুল মাল থেকে প্রতি বছর দুইশত দিনার প্রদান করা হতো। (আল-জামিউস সাগীর ১/৩৩৬)

আল্লামা আব্দুর রাঊফ মুনাভি রহ. এ হাদিস উদ্ধৃত করার পর বলেন, যদি এ পরিমাণ তার ব্যয়ের জন্য যথেষ্ট না হয়, তবে প্রয়োজন অনুযায়ী তা বৃদ্ধি করা হবে। (তাইসির বি শরহিল জামিয়িস সাগির ১/৯৯৯) এক দিনার সাধারণত এক মিসকাল স্বর্ণের সমপরিমাণ ছিল। (ফতোয়ায়ে রহীমিয়্যাহ ৯/৭৬)

হযরত উমর রাদি. এর যুগে একজন মানুষের এক দিনের খাদ্যভাতায় অর্ধেক বকরিও দেওয়া হতো। এগুলো ছিল ইসলামের প্রাথমিক যুগের কিছু দৃষ্টান্ত। যেখানে দ্বীনের খাদেমদের যথাযথ মর্যাদা ও সহায়তা প্রদান করা হতো, যাতে তারা পূর্ণ মনোযোগের সঙ্গে দ্বীনি খেদমতে আত্মনিয়োগ করতে পারেন।

অল্প বেতনের নেতিবাচক প্রভাব-

আজ এমন বহু মানুষ রয়েছেন, যারা যোগ্যতা অনুযায়ী ইলম ও গবেষণার জগতে অসাধারণ অবদান রাখতে পারতেন। কিন্তু বেতনের অসামঞ্জস্য তাদের এ পথ থেকে সরে যেতে বাধ্য করেছে। বরং অনেক ছাত্র শুরু থেকেই মনস্থির করে নেয় যে, ফারেগ হওয়ার পর অন্য কোনো পেশায় যাবে। ইউরোপ কিংবা উপসাগরীয় কোনো দেশে পাড়ি জমাবে। কারণ, মাদরাসা বা মসজিদের সামান্য বেতনে জীবনযাপন কীভাবে সম্ভব?

গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার জন্য মানসিক প্রশান্তি ও একাগ্রতা প্রয়োজন। কিন্তু যখন একজন মানুষ সারাক্ষণ জীবিকার চিন্তায় ব্যস্ত থাকবে, তখন সে কবে গবেষণা ও ইলমি কাজের জন্য নিজেকে নিবেদিত করবে? এ কারণেই আজ গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার ময়দানে যোগ্য ব্যক্তিদের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। মেধাবীদের অবমূল্যায়ন গবেষণার জন্য বিষসম হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

যদি মাদরাসার দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেন, শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান দেন, তাদের আর্থিক সংকট থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করেন এবং গবেষণা, রচনা ও মানুষ গড়ার কাজে তাদের মনোযোগী করে তোলেন, তবে কি অতীতের গৌরবময় ইতিহাস আবার ফিরে আসতে পারে না?

শিক্ষা ও পাঠদানে দুর্বলতার অন্যতম কারণও বেতন ব্যবস্থার অসামঞ্জস্য। প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তি চায়, তার প্রতিষ্ঠান উন্নতি করুক, এলাকার আদর্শ প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠুক, ছাত্রদের আগ্রহ বৃদ্ধি পাক এবং তার শিক্ষাব্যবস্থা সর্বত্র প্রশংসিত হোক। কিন্তু এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিশ্রম ও উপযুক্ত উপকরণ ব্যবহারে ঘাটতি রয়ে যায়। ফলে শিক্ষকরা ছাত্রদের ওপর কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ শ্রম দিতে পারেন না। সাময়িকভাবে একটি-দুটি উর্দূ শরাহ পড়িয়েই দায়িত্ব শেষ করা হয়। এর ফলস্বরূপ, অযোগ্য ছাত্রদের একটি বড় অংশ মাদরাসা থেকে বের হয়ে সমাজে প্রবেশ করছে, যারা কার্যত দ্বীনি খেদমতের উপযুক্ত নয়।

বেতনের মানদণ্ড-

ফতোয়ায়ে রহিমিয়্যাহর লেখক হযরত মুফতি আব্দুর রহিম লাজপুরি রহ. সাম্প্রতিক অতীতের অন্যতম প্রখ্যাত মুফতী ছিলেন। তাঁর ফতোয়াসমূহ আলেম ও সাধারণ মানুষের কাছে সমানভাবে সমাদৃত। তিনি তাঁর ফতোয়ায় বিভিন্ন স্থানে দ্বীনের খাদেমদের বেতন নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং উপযুক্ত বেতনের মানদণ্ড নির্ধারণ করেছেন। তিনি লিখেন, মসজিদের খাদেমগণ, যেমন ইমাম প্রমুখ এবং মাদরাসার শিক্ষকদের তাদের প্রয়োজন, ইলমি যোগ্যতা ও তাকওয়া-পরহেজগারির ভিত্তিতে বেতন দেওয়া উচিত। মসজিদের ওয়াকফের আয়ে সামর্থ্য থাকলে সেখান থেকে, অন্যথায় মুসলমানদের অনুদানের মাধ্যমে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী বেতনের ব্যবস্থা করা উচিত। (ফতোয়ায়ে রহিমিয়্যাহ ৯/২৯৩)

তিনি আরও বলেন, যদি মসজিদের আয় পর্যাপ্ত হয় এবং ইমাম-খতিব দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন, জুমআর দিনে বয়ানও করেন, নেক ও মুত্তাকি হন এবং পরিবার-পরিজনও থাকে, তবে দ্রব্যমূল্যের অবস্থা বিবেচনা করে তাদের বেতন বৃদ্ধি করা দায়িত্বশীলদের জন্য আবশ্যক। পর্যাপ্ত আয় থাকা সত্ত্বেও ইমামের পারিবারিক ব্যয় অনুযায়ী বেতন না দেওয়া জুলুম। (ফতোয়ায়ে রহিমিয়্যাহ ৯/১৫৩)

আরও এক স্থানে তিনি মসজিদ ও মাদরাসার কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে লিখেছেন, শ্রমিকের পূর্ণ মজুরি না দেওয়ার অর্থ শুধু তার প্রাপ্য মজুরি আত্মসাৎ করা নয়; বরং কাজের উপযুক্ত পারিশ্রমিক না দেওয়াও আত্মসাৎ এর অন্তর্ভুক্ত। বিশেষত তার অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে কম বেতনে কাজ আদায় করা। ফকীহগণ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “প্রয়োজন, ইলম ও মর্যাদা অনুযায়ী বেতন প্রদান করবে। এর কম দিলে আল্লাহর কাছে তাকে জবাবদিহি করতে হবে।”

অর্থাৎ মুতাওয়াল্লি ও মুহতামিমদের জন্য আবশ্যক হলো, মসজিদ ও মাদরাসার খাদেমদের প্রয়োজন, ইলমি যোগ্যতা এবং তাকওয়া বিবেচনা করে বেতন নির্ধারণ করা। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কম বেতন দেওয়া অন্যায়। আর এ বিষয়ে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে। (ফতোয়ায়ে রহীমিয়্যাহ ৪/১৩৮)

আল্লামা আলাউদ্দীন হাসকাফি রহ. আরও বলেন, কাজি, মুফতি ও মুদাররিসদের এমন পরিমাণ ভাতা দিতে হবে, যাতে তারা শুধু প্রয়োজনই পূরণ না; বরং সন্তুষ্টচিত্তে দ্বীনি কাজে অবিচল থাকতে পারে এবং পূর্ণ মনোযোগের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হয়। (দুররুল মুখতার ৭/২১৯)

দায়িত্বশীলদের উন্নত জীবনযাপন-

এ কথা সত্য যে, আমাদের আকাবিরগণ কখনও দ্বীনি খেদমতের জন্য বেতনকে মূল লক্ষ্য বানাননি; বরং এমন ঘটনাও আছে, কর্তৃপক্ষ বেতন বাড়াতে চাইলে তাঁরা তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে তা ছিল এমন সময়ে, যখন মানুষের চাহিদা সীমিত ছিল এবং দ্রব্যমূল্যের এ অবস্থা ছিল না। তখন শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষের জীবনযাত্রার মধ্যেও তেমন পার্থক্য ছিল না।

হযরত মাওলানা কাসিম নানুতাবি রহ. ছিলেন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তি, তবুও তাঁর জীবনে ছিল অসাধারণ সরলতা। হযরত মাওলানা খলীল আহমদ সাহারানপুরি রহ. দায়িত্বশীল হওয়া সত্ত্বেও অভাবের কারণে অজ্ঞান হয়ে যেতেন। কখনও কখনও তাঁর ঘরে চুলাও জ্বলত না। যদি আজও দায়িত্বশীলদের জীবন এমন হতো, তবে শিক্ষকেরাও অভাব সহ্য করতে প্রস্তুত থাকতেন।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজ অনেক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ ভিন্ন। নতুন নতুন পোশাক, নানান ধরনের জুতা, পকেটে সবসময় অর্থ এবং দামি মোবাইল-ফোন। চাকচিক্যের জীবন যেন তাদের স্বাভাবিক পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কথা অস্বীকার করা যায় না যে, তাদের প্রাথমিক জীবন কষ্টে কেটেছে। কিন্তু তাই বলে অন্যদেরও কষ্টে ফেলে রাখা কি ন্যায়সঙ্গত?

আজ সময়ের দাবি হলো, মসজিদ ও মাদরাসার দায়িত্বশীলরা বাস্তবতা উপলব্ধি করুন। পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হোন। বেতন ব্যবস্থায় ভারসাম্য আনুন এবং এমন পরিমাণ বেতন নির্ধারণ করুন। যাতে একটি মধ্যবিত্ত পরিবার স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে পারে। বেতন বৃদ্ধি করে দ্বীনের খাদেমদের প্রশস্ততা, মানসিক প্রশান্তি এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ করে দেওয়া জরুরি। কারণ, যেকোনো দ্বীনি খেদমতের জন্য মানসিক প্রশান্তি ও একাগ্রতা অপরিহার্য।

তথ্যসূত্র: মাসিক দারুল উলূম, সংখ্যা ৫, খণ্ড: ৯৮, রজব ১৪৩৫ হিজরি, মে ২০১৪ ইসায়ি

লেখক: তরুণ মুহাদ্দিস, লেখক ও অনুবাদক

জেডএম/