কওমি সনদের স্বীকৃতির শতভাগ বাস্তবায়ন কেন এখনো অধরা?
প্রকাশ: ১৪ মে, ২০২৬, ০৭:১৭ বিকাল
নিউজ ডেস্ক

ইমরান ওবাইদ, সাব-এডিটর

২০১৮ সালের ১১ এপ্রিল দেশের কওমি শিক্ষার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। দীর্ঘ আন্দোলন, দাবি ও আলোচনা শেষে আল হাইয়াতুল উলিয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়ার অধীনে পরিচালিত দাওরায়ে হাদিস সনদকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মাস্টার্স সমমান স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সেই সময় এটি কেবল একটি সনদের স্বীকৃতি ছিল না; বরং লাখো কওমি শিক্ষার্থীর শিক্ষা, মর্যাদা ও নাগরিক অধিকারের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসেবেই দেখা হয়েছিল।

কিন্তু স্বীকৃতির প্রায় আট বছর পরও প্রশ্নটি এখনো জোরালো—কওমি সনদের শতভাগ বাস্তবায়ন কি আদৌ সম্ভব হয়েছে? বাস্তবতা বলছে, কিছু সীমিত ক্ষেত্রে সুযোগ তৈরি হলেও জাতীয় পর্যায়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে নবীন আলেম, শিক্ষার্থী ও সচেতন অভিভাবকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। তাদের প্রশ্ন—রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি যদি বাস্তব সুবিধায় রূপ না নেয়, তাহলে সেই স্বীকৃতির কার্যকারিতা কতটুকু?

জাতীয় স্বীকৃতি প্রাপ্তির পেছনে যে উদ্দেশ্যগুলো ছিল, তা মোটাদাগে তিন রকম:

১. নাগরিক অধিকার: পরিচয়পত্রে শিক্ষার সঠিক মান নির্ধারণ ও লক্ষ লক্ষ মেধাবী শিক্ষার্থীকে মূলধারার কর্মসংস্থানে যুক্ত হওয়ার সুযোগ।

২. সামাজিক মর্যাদা: আলেমদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হিসেবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিশ্চিত করা।

৩. সমতা: আলিয়া মাদরাসা ও জেনারেল শিক্ষার্থীদের মতো কওমি শিক্ষার্থীদেরও নিজস্ব সনদে রাষ্ট্রীয় সুযোগ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা।

তবে জাতীয় স্বীকৃতির ৮ বছর গত হলেও এর বাস্তবায়ন হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন হারে বাস্তবায়ন হলেও তা অন্যান্য সনদের মতো শতভাগ নয়। দেশের নবীন আলেম ও চিন্তক অভিভাবকদের মধ্যে এ নিয়ে হতাশাও কাজ করে। তাদের একটাই প্রশ্ন—এ দেশে কখনো কি কওমি সনদের শতভাগ বাস্তবায়ন সম্ভব হবে?

জাতীয় স্বীকৃতির পরও এর বাস্তবায়ন কেন সম্ভব হয়নি? এ দেশ থেকে ফ্যাসিস্ট সরকার বিতাড়িত হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও শেষ হয়েছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরও কয়েক মাস কেটে গেছে। এই পুরো সময়ে বারবার সচেতন আলেম ও শিক্ষার্থীদের থেকে সনদ বাস্তবায়নের জোর দাবি উঠলেও কেন তা শতভাগ বাস্তবায়নের মুখ দেখছে না? এর নেপথ্যে কী কারণ?

নেটিজেনরা এর পেছনে যে কারণগুলো মনে করেন, তা মোটাদাগে এমন—

১. অবহেলা: প্রধান কারণ হিসেবে তারা মনে করেন, কওমি শিক্ষার নিয়ন্ত্রণকারীরা স্বীকৃতির শতভাগ বাস্তবায়নের চেষ্টায় অবহেলা করছেন। যার ফলে তা আজও বাস্তবায়নের মুখ দেখা থেকে পিছিয়ে রয়েছে।

২. বিকৃতির ভয়: কওমি শিক্ষার শতভাগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে গেলে সরকারি হস্তক্ষেপ আসবে—এটা স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে শিক্ষা নিয়ন্ত্রণকারীরা আশঙ্কা করেন, এর ফলে কওমি শিক্ষার বিকৃতি ঘটবে। দেওবন্দী ধারার ‘উসূলে হাশতেগানা’ থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।

তবে তাদের এই আশঙ্কা একেবারে অমূলক নয়। এক শ্রেণির শিক্ষা ধারাকে আমাদের চোখের সামনে বিগড়ে যেতে দেখেছি। কিন্তু সবসময় যে একই রকম হবে—সে ভাবনাও সঠিক নয়। দুনিয়ার সবকিছুই যখন পরিবর্তন হচ্ছে, আপডেট হচ্ছে—সেখানে শত বছরের পুরনো অবস্থান ধরে রাখা অনুচিত। এটি কওমি শিক্ষার ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়ার নামান্তর। লাখ লাখ কওমি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের কথা ভেবে হলেও তা থেকে কিছুটা পিছিয়ে আসা উচিত।

৩. প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের স্বীকৃতি না থাকা: তারা এর আরেকটি জটিল কারণ হিসেবে মনে করেন—কওমি সিলেবাসের উচ্চস্তরকে সরাসরি মাস্টার্সের সমমান স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের জাতীয় কোনো স্বীকৃতি নেই। যার ফলে কর্মক্ষেত্রে তারা তেমন সুবিধা করতে পারে না। কারণ, যে কোনো প্রতিষ্ঠানে উচ্চস্তরের সনদের পাশাপাশি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের জাতীয়ভাবে স্বীকৃত সনদের প্রয়োজন হয়।

তবে এই বিষয়ে চলতি মাসের প্রথম দিকে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন বলেছেন, তিনি এ বিষয়ে কওমি শিক্ষার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। অচিরেই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হবে।

৪. ২০১৮ সালে স্বীকৃতি প্রাপ্তির সময় নেতৃত্ব প্রদানকারী আলেমগণ স্পষ্ট করে বলেছিলেন, কওমি সিলেবাসে সরকারি হস্তক্ষেপ তারা মেনে নেবেন না। কিন্তু সমসাময়িক কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্কিলস, যেগুলোর ভয়াবহ ঘাটতি রয়েছে কওমি শিক্ষার্থীদের মাঝে—যেমন ইংরেজি, গণিত; সেগুলোকে যথেষ্ট পর্যায়ে সিলেবাসভুক্ত না করলে জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে তাল মেলানো কঠিন। এ বিষয়ে কওমি শিক্ষা নিয়ন্ত্রণকারীদের চিন্তা করা উচিত।

জেডএম/