কোরবানির চামড়া কালেকশন ও আকাবিরের দৃষ্টিভঙ্গি
প্রকাশ: ১৫ মে, ২০২৬, ০৩:৪৩ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

বিশেষ প্রতিনিধি—

বছর ঘুরে আবার দুয়ারে হাজির পবিত্র ঈদুল আজহা। আর ঈদুল আজহা মানেই পশু কোরবানি। এই কোরবানির সঙ্গে দেশের হাজার হাজার কওমি মাদরাসার সম্পৃক্ততা রয়েছে। কোরবানির পশুর চামড়া কালেকশনের ধারা চলে আসছে বহু বছর ধরে। মাদরাসাগুলো বার্ষিক যে ব্যয় নির্বাহ করে এর একটি বড় অংশ আসে চামড়া কালেকশন থেকে।
তবে গত কয়েক বছর ধরে চামড়ার দর নিয়ে যে কারসাজি হয়ে আসছে তাতে দিন দিন এই খাত শুধু হতাশাই সৃষ্টি করছে। যত শ্রম, সময় ও মনোযোগ দিয়ে কোরবানির চামড়া কালেকশন করা হয় সেই অনুপাতে লাভবান হচ্ছে না মাদরাসাগুলো। এতে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে দিন দিন হতাশা ও ক্ষুব্ধতা বাড়ছে। ফলে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠছে কালেকশন পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার। এমনকি এবার সিলেট ও ঢাকার বেশ কিছু মাদরাসা ঘোষণা দিয়ে চামড়া কালেকশন থেকে বিরত থাকছে।  

চামড়া কালেকশন নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যে আমরা এখানে সর্বজন স্বীকৃত কয়েকজন আকাবিরের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরছি। তারা সাধারণ চাঁদা এবং বিশেষ করে কোরবানির কালেকশনের ব্যাপারে নিজেদের মতামত জানিয়েছেন। 

হাকিমুল উম্মত হজরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. এ প্রসঙ্গে বলেন- ‘আলেমদের চাঁদা কালেকশনের দ্বারা দীনের বড় অসম্মানি হচ্ছে। সাধারণ জনগণ মনে করে, আলেমরা বুঝি নিজেদের জন্যই এত দৌড়ঝাঁপ করছে। এজন্য আমার অভিমত হলো, আলেমগণ কিছুতেই চাঁদা কালেকশনে যাবেন না; বরং দীনের কোনো কাজ করতে হলে সমাজের গণ্যমান্য ধনাঢ্য ব্যক্তিদের একত্রিত করে বলে দেবেন, দীনের হেফাজতের জন্য অমুক কাজটি করা দরকার। আপনারাও চিন্তা করে দেখুন এর প্রয়োজন রয়েছে কি না। যদি আপনাদের দৃষ্টিতেও প্রয়োজনীয় মনে হয় তাহলে সকলে মিলে এ কাজটি আঞ্জাম দেওয়ার ব্যবস্থা করুন... আলেমগণ মূল কাজ করবেন। সম্পদশালীগণ অর্থের যোগান দিবেন। আর যদি সমাজের গণ্যমান্য ধনাঢ্য ব্যক্তিরা বলে এ কাজের প্রয়োজন নেই; বরং এটি অনর্থক তাহলে আলেমদের পক্ষে চাঁদা কালেকশনের প্রয়োজন নেই। সে কাজ বন্ধ করে ঘরে বসে থাকবেন। ব্যবসা, চাষাবাদ কিংবা অন্য কোন পেশায় লিপ্ত হোন এবং অবসর সময় যতটুকু সম্ভব দীনের কাজ করুন... আমার মতে আলেমদের দ্বারা চাঁদা কালেকশন করাবেন না। তাদেরকে চাঁদা আদায়ের কাজে নিযুক্ত করবেন না। এতে তাদের গুরুত্ব ও মর্যাদা কমে যায়। (আল-ইলমু ওয়াল-উলামা। অনুবাদ : আব্দুল গাফ্ফার শাহপুরী। পৃষ্ঠা : ৩১০-৩১১)

আমিরে শরিয়ত হজরত মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ. বলেন- ‘মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও ছাত্ররা জাকাত-ফেতরার টাকা, খাস করে কোরবানির চামড়া সংগ্রহ করার জন্য শহরের অলিতে-গলিতে ঘোরাফেরা করে। এটা দ্বীনের জন্য বড়ই বেইজ্জতির কথা। এতে মাদরাসার ছাত্র ও শিক্ষকদের প্রতি মানুষের হেয় দৃষ্টি তৈরি হয়, যা ধর্মের জন্য ক্ষতিকর।’

তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘মাদরাসা কর্তৃপক্ষের প্রতি বিশেষ অসিয়ত থাকল, তারা যেন ছাত্রদের এভাবে চামড়া সংগ্রহ করতে না পাঠায়। বরং মাদরাসা প্রাঙ্গণে ও শহরের বিভিন্ন জায়গায় ক্যাম্প থাকবে। সেখানে মাদ্রাসাদরদী জনগণ নিজেদের দায়িত্বে চামড়া পৌঁছাবেন। আল্লাহ পাকের ওপর ভরসা করে মাদরাসা চালান। হেয়তাপূর্ণ কাজ বন্ধ করুন।’ (আমিরে শরিয়ত মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ./লেখক: নাসীম আরাফাত, পৃষ্ঠা : ১৯)

আল্লামা সুলতান যওক নদভী রহ. তাঁর আত্মজীবনী ‘আমার জীবনকথা’য় লিখেছেন- ‘হজরত মাওলানা হারুন বাবুনগরী (মৃত্যু ১২ জিলহজ্ব ১৪০৫ হি.) ছিলেন একজন উঁচুমাপের মুতাওয়াক্কিল। সৃষ্টি থেকে বিমুখতা ও আল্লাহ নির্ভরশীলতা তাঁর প্রতিটি কথাবার্তা ও চালচলনে প্রকাশ পেত। মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে হুজুর বলেন, শুরুর পনের ষোল বছর আমি কারো কাছ থেকে চাঁদা চাইনি। আজও আমি শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে বলি যে, ছাত্র ও শিক্ষকরা যেন কোন চাঁদার জন্য কারো কাছে না যায়। আল্লাহ পাক বর্তমান অবস্থার চাইতে ভালো চালাবেন। কিন্তু আমার এ কথার ওপর তারা আস্থা রাখতে পারছে না। মাদরাসার অর্থনৈতিক মন্দা অবস্থায়ও হুজুর শহরে বন্ধু-বান্ধবদের কাছে চাঁদার জন্য অথবা মাদরাসার কোন প্রয়োজনীয়তার কথা প্রকাশ করতে যান নি। বিদেশেও কাউকে পাঠানোর চিন্তা করেননি।

একবার হজ সফরে কেউ হুজুরকে বলল, হুজুর! মাদ্রাসার প্রয়োজনীয়তার কথা বললে অনেক সহযোগিতা পাওয়া যেত। তখন হুজুর বললেন, আমি এখানে মানুষের কাছে আসিনি। এসেছি আল্লাহর দরবারে হাজিরা দেবার জন্য। তাঁর কাছে যদি মাদরাসা কবুল হয়ে যায় তা-ই যথেষ্ট নয় কি? (আমার জীবনকথা, পৃষ্ঠা: ১১২)

হাটহাজারী মাদরাসার সাবেক মহাপরিচালক মুফতি আব্দুস সালাম চাটগামী রহ. তাঁর আত্মজীবনীর এক জায়গায় লিখেন- ‘কুরবানির মৌসুমেও পশুর চামড়া গ্রহণের যে পদ্ধতি এখানে চালু রয়েছে, সেটিও অত্যন্ত অপমানজনক বলে মনে করি। পাকিস্তান ও হিন্দুস্থানে এই চামড়া গ্রহণ কীভাবে হয়ে থাকে তা আমি পূর্বে কোনো এক সময় বলেছিলাম। আমি জানি না দেওবন্দি ধারার প্রতিষ্ঠান হয়েও আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকরা কীভাবে এরকম অপমানজনক পদ্ধতি প্রবর্তন করলেন।’ (সূত্র: আত্মজীবনী, মুফতী আব্দুস সালাম চাটগামী)

আইও/