ইয়াওমে আরাফা: অবারিত রহমত প্রাপ্তির সুযোগ
প্রকাশ: ২৬ মে, ২০২৬, ০৩:৪৮ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

|| মুহাম্মদ উসামা হাবীব ||

জিলহজ মাসের ৮ তারিখ থেকে হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। পৃথিবীর সকল আবেগ অনুরাগ একত্রিত হয় মিনায়, তাঁবুর রাজ্যে।

হজের প্রতিটি দিনের স্বতন্ত্র নাম রয়েছে। প্রথম দিন অর্থাৎ, ৮ তারিখকে বলা হয় ‘ইয়াওমুত তারবিয়া’। এমন নামকরণের কয়েকটি কারণ হতে পারে:

এক. তারবিয়া (التروية) শব্দের এক অর্থ হলো, পানি সংগ্রহ করা, পানি পানে নিজেকে সিক্ত করা। এ দিনে মানুষ মিনা ও আরাফার দীর্ঘ সফরের জন্য প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করতেন। নিজে পান করে তৃপ্ত হতেন। তাই এ-দিনকে ‘ইয়াওমুত তারবিয়া’ বা পানি সংগ্রহের দিন বলা হয়।

পানি সংগ্রহের এই ব্যাখ্যাটা হজরত ইবরাহিম আলাহিস সালামের নামেও কারো কারো নিকট প্রচলিত আছে। 

দুই. তারবিয়া (التروية) আরেকটি অর্থ হলো, চিন্তা করা। হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম সর্বপ্রথম এ দিন স্বপ্নে পুত্র কুরবানির জন্য নির্দেশিত হয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। তাই এ দিনকে চিন্তার দিনও বলা হয়।

তিন. আবার অনেকে এ দিনের ব্যাখ্যা করেন এভাবে—ইয়াওমুত তারবিয়া হলো, কুরবানির পশুগুলোকে ভালোভাবে পানি পান করিয়ে পরিতৃপ্ত করার দিন।

এরপর দিন ৯ জিলহজ। এ দিনের নাম ‘ইয়াওমে আরাফা।’ এ-দিনটি বিভিন্ন কারণে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ:

★ ১০ম হিজরির এই দিনে আরাফার ময়দানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা এই উম্মতের উপর তার দীন ও অনুগ্রহ কে পরিপূর্ণ করে ছিলেন। সে দিন আরাফার ময়দানে সকলের উপস্থিতিতে অবতীর্ণ হয়েছিল ঐতিহাসিক ঘোষণা। ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করে দিলাম। তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত কে পূর্ণ করলাম। ইসলামকেই তোমাদের জন্য দীন হিসেবে মনোনীত করলাম। (সুরা মায়েদা: ৩)।

সহিহ বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, একবার এক ইহুদী হজরত ওমর ফারুক রা. কে বললো, তোমাদের ধর্মে এমন একটি ঐতিহাসিক আয়াত বর্ণিত হয়েছে, তা যদি আমাদের ধর্মে বর্ণিত হতো, তাহলে এ দিনকে আমরা উৎসবের দিন হিসেবে গ্রহণ করতাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, সেটি কোন আয়াত? সে বলল, সুরা মায়েদার তিন নম্বর আয়াত! (সহিহ বুখারি: ৪৬০৬)

★ হজের অন্যতম  অনুসঙ্গ হলো, ৯ জিলহজ আরাফার ময়দানে অবস্থান করা। এই দিকে সমন্ধ করে এ দিনটির নাম রাখা হয়েছে। হাদিসে আছে, হজ হলো আরাফায় অবস্থানের নাম (তিরমিজি শরিফ: ৮৮৯ )

সৃষ্টির প্রথম মানব-মানবী আদম ও হাওয়া আলাইহিমুস সালামের দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর, দুনিয়াতে তাদের প্রথম মিলন হয়েছিল এই আরাফার ময়দানে। সেই স্মৃতিকে জাগরুক রাখতে হজে উকুফে আরাফার বিধান এসেছে। এদিন সূর্য পশ্চিম দিকে ঝুঁকে পড়ার পর হাজিগণ আরাফার ময়দানে অবস্থান করেন। এবং খুবই বিনয়-নম্রতার সাথে দয়াময় মালিকের মাগফেরাত কামনা করেন। এর মাধ্যমে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে হাজি হিসেবে গণ্য হন।

​★ এদিন আল্লাহ তায়ালা আনন্দ প্রকাশ করেন। হাজী সাহেবানদেরসহ অগণিত মানুষকে তাঁর অসীম রহমত ও মাগফিরাত দ্বারা ইহসান করেন। হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আরাফার দিনের মতো এমন কোনো দিন নেই, যেদিন আল্লাহ তায়ালা এত বেশি মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেন। সেদিন তিনি নিকটবর্তী হন; অতঃপর ফেরেশতাদের সামনে গর্ব করে বলেন, তারা কী উদ্দেশ্যে সমবেত হয়েছে?’ (মুসলিম: ৩১৭৯)।

আরেক বর্ণনায় আছে, আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি নিজেকে এবং সমস্ত সৃষ্টিকুলকে সাক্ষী রাখছি যে, আমি তাদেরকে ক্ষমা করে দিলাম; যদিও তাদের কৃত গুনাহের পরিমাণ অনন্তকালের সকল দিবসের সমপরিমাণ হয় বা অগণিত বালুর পরিমাণ হয়।’ (আল মাতজার: ৮৬৭)।

​★ মুমিনদের আত্মসমর্পণ দেখে দুনিয়াতে এই দিন শয়তান সবচেয়ে বেশি অপদস্থ ও অপমানিত হয়। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘অভিশপ্ত শয়তানকে আরাফার দিন থেকে অধিক অপদস্থ, ক্রোধাক্রান্ত আর কোনো দিন দেখা যায় না; যেহেতু সে ওই দিন আল্লাহ তায়ালার অধিক রহমত বর্ষণ ও বিপুল পরিমাণে গুনাহ মাফের বিষয়টি প্রত্যক্ষ করে।’ (মুআত্তা মালেক: ১/৪২২)।

​অতএব, মুমিনদের উচিত, এই সময়গুলো আমলের মাধ্যমে অতিবাহিত করা।

​★ এই দিন নফল রোজা রাখলে অপ্রত্যাশিত সওয়াব পাওয়া যায়। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আরাফার দিনপর রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী যে, এর বিনিময়ে তিনি সামনের এক বছর এবং বিগত এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।’ (তিরমিজি শরিফ: ৭৪৯)।

​★ বেশি বেশি তাকবির পড়া। এমনিতেও এদিন থেকে আইয়্যামে তাশরিক হিসেবে ফরজ নামাজের পর তাকবিরে তাশরিক ওয়াজিব; যেমনটি আয়াতে বর্ণিত আছে—‘এবং যেন তারা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে।’ (সুরা হজ: ২৮)

মুসনাদে আহমদের এক বর্ণনায় এসেছে, ‘অতএব, এদিনগুলোতে তোমরা অধিক পরিমাণে তাকবির, তাহমিদ, তাসবিহ ও তাহলিল পাঠ করো।’

​★ বেশি পরিমাণে তওবা করা। আল মাতজারের বর্ণনায় এসেছে, এদিন আল্লাহ তায়ালা বান্দার গুনাহ মাফ করে দেন, যদিও তা অগণিত বালুকারাশির পরিমাণ হয়।’ (আল মাতজার: ৮৬৭)।

​★ বেশি বেশি দোয়া করা। বর্ণিত আছে, ‘সর্বোত্তম দোয়া হলো আরাফা দিবসের দোয়া।’ (তিরমিজি শরিফ: ৩৫৮৫)

লেখক: প্রবন্ধকার, শিক্ষক, ইমাম ও খতিব

আইও/