
|
একাধিক বিয়ের আগে কিছু বিষয় ভাবা জরুরি
প্রকাশ:
২১ জুলাই, ২০২৬, ০৭:৫১ বিকাল
নিউজ ডেস্ক |
আওয়ার ইসলাম ডেস্ক ইসলামে একজন মুসলিম পুরুষকে একই সময়ে সর্বোচ্চ ৪ জন পর্যন্ত স্ত্রী রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা নারীদের মধ্যে যাকে ভাল লাগে বিয়ে করো—দুই, তিন অথবা চারজনকে। তবে যদি আশঙ্কা কর, সুবিচার করতে পারবে না, তবে একজনকে। (সুরা নিসা: ৩) একাধিক বিয়ের অনুমতি ইসলাম দিলেও উৎসাহ দেয়নি কখনো। বরং পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়–সমতা করতে না পারার আশঙ্কা থাকলে ইসলাম এক বিয়েতেই ক্ষন্ত থাকার কথা বলে। এক হাদিসে এই বিষয়টাকে খুব কড়াভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে—রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তি দুইজন স্ত্রী থাকা অবস্থায় একজনের প্রতি ঝুঁকে পড়ে, কেয়ামতের দিন সে পঙ্গু অবস্থায় উপস্থিত হবে।’ (সুনানে আবু দাউদ: ২১৩৩) তাই কারো একধিক বিয়ের প্রয়োজন হলে নিজের শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি ভাবতে হবে আরও কিছু বিষয় নিয়ে— এক. আর্থিক ও দাম্পত্য সক্ষমতা: একাধিক বিয়ের আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আর্থিক ও শারীরিক সক্ষমতা। প্রত্যেক স্ত্রীর ভরণপোষণ, বাসস্থান, চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় ব্যয়ভার বহন করা স্বামীর দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পুরুষরা নারীদের অভিভাবক, কারণ আল্লাহ তাদের একদলকে অন্যদলের ওপর মর্যাদা দিয়েছেন এবং তারা নিজেদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে।’ (সুরা নিসা: ৩৪) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি: ৮৯৩, সহিহ মুসলিম: ১৮২৯) দুই. স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায়বিচার: ন্যায়বিচার—একাধিক বিয়ের ক্ষেত্রে সবচে’ বড় শর্ত। সময় বণ্টন, ভরণপোষণ, বাসস্থান এবং বাহ্যিক আচরণে কোনো স্ত্রীর প্রতি অবিচার বৈধ নয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যার দুইজন স্ত্রী রয়েছে, কিন্তু সে একজনের প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়ে, কিয়ামতের দিন সে শরীরের এক পাশ হেলে পড়া অবস্থায় উপস্থিত হবে।’ (আবু দাউদ: ২১৩৩, তিরমিজি: ১১৪১) তিন. স্ত্রীদের স্বতন্ত্র বাসস্থান নিশ্চিত করা: ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী, স্ত্রীরা যদি স্বেচ্ছায় একসঙ্গে থাকতে রাজি না হন, তাহলে প্রত্যেকের জন্য আলাদা ও নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করা স্বামীর দায়িত্ব। এতে তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সম্মান ও পারিবারিক অধিকার নিশ্চিত হয়। চার. প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে সততা ও উত্তম আচরণ: দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি শরিয়তের শর্ত নয়। তবে প্রতারণা, গোপনীয়তা বা অযথা কষ্ট দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ইসলামের নৈতিকতার পরিপন্থী। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম।’ (তিরমিজি: ৩৮৯৫, ইবন মাজাহ: ১৯৭৭) পাঁচ. দায়িত্ববোধ ও আল্লাহভীতির সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া: ইসলামে একাধিক বিয়ের অনুমতি ব্যক্তিগত ভোগবিলাসের জন্য নয়; বরং সামাজিক ও মানবিক প্রয়োজন, ন্যায়বিচার এবং দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্ত আবেগ বা প্রবৃত্তির তাড়নায় বশে নয়, বরং আল্লাহর ভয়, ন্যায়বোধ এবং আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নেওয়া উচিত। ছয়. রাষ্ট্রীয় আইন মেনে চলাও দায়িত্ব: ইসলামী শরিয়তের পাশাপাশি একজন নাগরিক হিসেবে দেশের আইন মানাও দায়িত্বের অংশ। বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুযায়ী দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে সালিশি কাউন্সিলের অনুমতি গ্রহণসহ নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। শরিয়তের বিধান পালনের পাশাপাশি প্রচলিত আইন মেনে চলাও একজন দায়িত্বশীল মুসলিমের কর্তব্য। ইসলাম একাধিক বিয়ের অনুমতি দিয়েছে, কিন্তু তা কখনোই শর্তহীন নয়। আর্থিক সামর্থ্য, ন্যায়বিচার, দায়িত্ববোধ, পারিবারিক অধিকার রক্ষা এবং আল্লাহভীতি— এসব শর্ত পূরণ না হলে দ্বিতীয় বিয়ে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য কল্যাণের পরিবর্তে সংকটের কারণ হতে পারে। তাই একজন মুমিনের উচিত একাধিক বিয়েকে শুধু নিজের অধিকার হিসেবে না দেখে, বরং একটি বড় আমানত ও জবাবদিহির বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা। কুরআনের নির্দেশনাও এটাই—যদি ন্যায়বিচার করতে না পারার আশঙ্কা থাকে, তবে একটি বিয়েতেই সীমাবদ্ধ থাকাই দুনিয়া ও আখিরাত— উভয় দিক থেকেই অধিক নিরাপদ ও তাকওয়ার কাছাকাছি পথ। আইও/ |