
|
কবি বশীর বদর: হৃদয়ের ভাষাকে যিনি সাহিত্যের মর্যাদা দিয়েছিলেন
প্রকাশ:
৩১ মে, ২০২৬, ০৪:৩৮ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
|| জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান || সাহিত্যের ইতিহাসে কিছু মানুষ কেবল কবি নন, তাঁরা একটি যুগের অনুভূতি, একটি ভাষার প্রাণ এবং একটি সভ্যতার সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে পরিণত হন। তাঁদের মৃত্যু হয়, কিন্তু তাঁদের শব্দের মৃত্যু হয় না। সময়ের সীমানা পেরিয়ে তাঁরা বেঁচে থাকেন মানুষের মুখে মুখে, স্মৃতির গভীরে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের আবেগে। আধুনিক উর্দু সাহিত্যের এমনই এক উজ্জ্বল নাম বশীর বদর। ২০২৬ সালের ২৮ মে ভারতের ভোপালে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। দীর্ঘদিন ধরে আলঝেইমার রোগে ভুগছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ সমগ্র উর্দুভাষী বিশ্বে যে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, তা প্রমাণ করে বশীর বদর ছিলেন কোটি মানুষের হৃদয়ের ভাষা। কবি ও গীতিকার জাভেদ আখতার বশীর বদরের মৃত্যুর সংবাদ শুনে লিখেছিলেন, 'আজ উর্দু আরও দরিদ্র হয়ে গেল।' এই একটি বাক্যের মধ্যেই যেন ধরা পড়ে বশীর বদরের সাহিত্যিক মর্যাদা। কারণ তিনি শুধু কবিতা লেখেননি, তিনি উর্দু ভাষাকে নতুন প্রাণ দিয়েছেন, নতুন পাঠক দিয়েছেন এবং সবচেয়ে বড় কথা তিনি উর্দুকে সাধারণ মানুষের জীবনের অংশে পরিণত করেছিলেন। জন্ম, ইতিহাসের শহরে এক কবির আগমন ১৯৩৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি উত্তর প্রদেশের ঐতিহাসিক নগরী অযোধ্যায় জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দ মুহাম্মদ বশীর। পরবর্তীকালে সাহিত্যজগতে তিনি ‘বদর’ ছদ্মনাম গ্রহণ করেন। আরবি ভাষায় ‘বদর’ অর্থ পূর্ণিমার চাঁদ। সম্ভবত নামটি তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে গিয়েছিল। কারণ তিনি সত্যিই উর্দু সাহিত্যের আকাশে পূর্ণিমার চাঁদের মতোই আলো ছড়িয়েছেন। তাঁর পরিবার ছিল ধর্মীয় ও শিক্ষানুরাগী। পিতা ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। পরিবারে সাহিত্যচর্চার বড় কোনো ঐতিহ্য না থাকলেও শিক্ষার প্রতি গভীর গুরুত্ব ছিল। শৈশব থেকেই শব্দের প্রতি তাঁর ছিল অদ্ভুত আকর্ষণ। বিভিন্ন জীবনীগ্রন্থে উল্লেখ পাওয়া যায়, মাত্র সাত বছর বয়সেই তিনি প্রথম শে’র রচনা করেন। তখনও কেউ জানত না, এই শিশুটিই একদিন উপমহাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় উর্দু কবিদের একজন হয়ে উঠবেন। আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়, কবির বুদ্ধিবৃত্তিক নির্মাণ আলিগড়ে অবস্থানকালে তিনি শুধু সাহিত্য নয়, দর্শন, ইতিহাস, মনোবিজ্ঞান, আরবি, ফারসি ও সমাজবিজ্ঞান নিয়েও বিস্তৃত অধ্যয়ন করেন। এই সময় তিনি মীর, গালিব, ইকবাল, জোশ মালিহাবাদী, ফয়েজ এবং ফিরাক গোরখপুরীর সাহিত্য গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন। তবে তিনি দ্রুত উপলব্ধি করেন যে নতুন যুগের মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে ভাষাকে আরও সহজ ও হৃদয়গ্রাহী করতে হবে। উর্দু গজলের নতুন ভাষা প্রেম, স্মৃতি, অপেক্ষা, বিচ্ছেদ, ভুল বোঝাবুঝি, সম্পর্কের ভঙ্গুরতা, জীবনের ক্লান্তি এবং মানবিক আকাঙ্ক্ষা এসব বিষয়কে তিনি এমন ভাষায় প্রকাশ করেন, যা একই সঙ্গে সাহিত্যিক এবং সাধারণ পাঠকের বোধগম্য। তাঁর কবিতা পড়লে মনে হয় না তিনি কবিতা লিখছেন, বরং মনে হয়, তিনি মানুষের হৃদয়ের গোপন কথাগুলো উচ্চারণ করছেন। শত্রুতার মধ্যেও বন্ধুত্বের জন্য জায়গা دشمنی جم کر کرو لیکن یہ گنجائش رہے অর্থ: এই শের শুধু প্রেম বা বন্ধুত্বের নয়, এটি এক সভ্যতার শিক্ষা। ১৯৭২ সালের শিমলা বৈঠকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সামনে এই শের উদ্ধৃত করেছিলেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। পরে ভারতের সংসদেও এই শের উদ্ধৃত হয়েছে।এমনকি রাজনৈতিক মতবিরোধের মুহূর্তেও এই শের মানবিকতার আহ্বান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। মীরাট দাঙ্গা, এক কবির ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি বছরের পর বছর ধরে লেখা তাঁর সাহিত্যকর্ম মুহূর্তের মধ্যে ছাই হয়ে যায়। এই বেদনা থেকেই জন্ম নেয় তাঁর অমর পংক্তি, لوگ ٹوٹ جاتے ہیں ایک گھر بنانے میں অর্থ: উর্দু সাহিত্যের ইতিহাসে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এর চেয়ে শক্তিশালী মানবিক প্রতিবাদ খুব কমই দেখা যায়। স্মৃতি, প্রেম ও জীবনের কবি বশীর বদরের কবিতা মূলত মানুষের হৃদয়ের কবিতা। তাঁর বিখ্যাত শের, اجالے اپنی یادوں کے ہمارے ساتھ رہنے دو অর্থ: এই কয়েকটি শব্দের মধ্যেই জীবনের অনিশ্চয়তা, সময়ের ক্ষণস্থায়িত্ব এবং স্মৃতির স্থায়িত্বকে তিনি এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ প্রেমের কবিতাগুলোর সঙ্গে তুলনীয়। আরেকটি বিখ্যাত শের তাঁর, کچھ تو مجبوریاں رہی ہوں گی অর্থ: মানবসম্পর্কের গভীর মনস্তত্ত্বকে এত সংক্ষিপ্ত অথচ গভীরভাবে প্রকাশ করার ক্ষমতাই ছিল বশীর বদরের সবচেয়ে বড় শক্তি। জগজিৎ সিং ও গুলাম আলীর কণ্ঠে বিশ্বজয় বিশেষ করে জগজিৎ সিংয়ের কণ্ঠে তাঁর গজলগুলো মধ্যবিত্ত পরিবারের আবেগের অংশ হয়ে ওঠে। আলঝেইমার, এক নির্মম পরিহাস একসময় যে কবির শব্দ কোটি মানুষের স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছিল, সেই কবিই নিজের স্মৃতির সঙ্গে লড়াই করতে বাধ্য হন। কেন বশীর বদর অমর তাই বশীর বদর কেবল একজন কবি নন। তিনি এক অনুভূতির নাম। এক মানবিক দর্শনের নাম।উর্দু ভাষার ইতিহাসে তিনি সেই পূর্ণিমার চাঁদ, যার আলো তাঁর মৃত্যুর পরও বহু প্রজন্ম ধরে পথ দেখাবে। তথ্যসূত্র, লেখক: কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো,মিশর এমএম/ |