তিনবারের শ্রেষ্ঠ যুব সংগঠক আমিনুল হক সাদীর সাফল্যের গল্প
প্রকাশ: ২৭ জুলাই, ২০২৬, ০৩:২৯ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি

বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, সামাজিক উন্নয়ন এবং স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে দীর্ঘদিনের অবদানের মাধ্যমে কিশোরগঞ্জে একজন সফল আত্মকর্মী থেকে তিনবারের শ্রেষ্ঠ যুব সংগঠক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন আমিনুল হক সাদী।

২০০৪ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় কর্মসংস্থানের সন্ধানে কিশোরগঞ্জ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, সরকার বেকার যুবকদের বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দিয়ে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিচ্ছে। পরে তিনি কিশোরগঞ্জ যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে গবাদিপশু পালন, হাঁস-মুরগি, ডেইরি ফার্ম, কৃষি ও প্রাথমিক চিকিৎসার ওপর তিন মাসের আবাসিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

প্রশিক্ষণ শেষে তিনি নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি বেকার যুবকদের নিয়েও কাজ শুরু করেন। ২০১০ সালে যুব জাগরণে সক্রিয় ভূমিকা রেখে প্রতিষ্ঠা করেন ‘যুব উন্নয়ন পরিষদ’। পরবর্তীতে ২০২০ সালে সংগঠনটি কিশোরগঞ্জ জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিবন্ধন লাভ করে। বর্তমানে তিনি সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

শিক্ষাজীবনে কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী গুরুদয়াল সরকারি কলেজ থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে ২০১৯ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। সরকারি চাকরির পেছনে না ছুটে সদর উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিস থেকে ৬০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে গড়ে তোলেন ‘সাদী সমন্বিত কৃষি খামার’। সেই উদ্যোগই পরবর্তীতে তার আত্মকর্মসংস্থানের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের পাঁচ শতাধিক সদস্য সমাজসেবা ও যুব নেতৃত্ব বিকাশে কাজ করছেন। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন যুব কল্যাণ তহবিল থেকে ২০২৩ সালে সংগঠনটি ৪০ হাজার টাকা অনুদান পায়। এ অর্থ দিয়ে কৃষি খামার সম্প্রসারণ, পুকুরে মাছ চাষ এবং পাঁচ হাজার গাছের চারা বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়।

আমিনুল হক সাদীর নেতৃত্বে এ পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার বেকার যুবক-যুবতীকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে তিন শতাধিক ব্যক্তি আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছেন। এছাড়া তার উদ্যোগে ১০ জনের সরকারি-বেসরকারি চাকরি এবং আরও ১০ জনের বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তার প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত দুইজন এবং প্রকল্পভিত্তিক পাঁচজনের কর্মসংস্থান হয়েছে।

সামাজিক কর্মকাণ্ডেও রয়েছে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ। করোনা মহামারির সময় এক হাজার মানুষের টিকা নিবন্ধন, ১০ হাজার মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণ এবং ত্রাণ সহায়তা প্রদান করেন। সম্প্রতি পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীর টাইফয়েড টিকা নিবন্ধন, বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প, দরিদ্রদের সহায়তা, প্রতিবন্ধীদের হুইলচেয়ার, নারীদের সেলাই মেশিন, শীতার্তদের মাঝে ১০ হাজার শীতবস্ত্র বিতরণসহ নানা মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।

শিক্ষা বিস্তারেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। পাঁচ শতাধিক শিশুকে বিনামূল্যে পাঠদান, যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিচালনা, বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম এবং ব্যক্তি উদ্যোগে পাঁচ হাজার বইসমৃদ্ধ একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেছেন। পাশাপাশি কৃষকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে গড়ে তুলেছেন ‘কৃষক পার্টনার ফিল্ড স্কুল’।

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনেও তিনি স্থানীয় ছাত্র-যুবকদের পাশে ছিলেন। পুলিশের গুলিতে পা হারানো শিক্ষার্থী জুনায়েদ, গুলিবিদ্ধ সমাজকর্মী ও যুবদল নেতা মাসুম বিল্লাহ এবং আহত আন্দোলনকারী শফিকুল ইসলাম নাঈমসহ ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতা করেছেন। এছাড়া সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন সামাজিক ক্ষেত্রে অবদান রাখা প্রায় ১০০ গুণী ব্যক্তিকে সম্মাননা প্রদান করেছে তার সংগঠন।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন সেমিনার, প্রশিক্ষণ ও কর্মশালায় অংশ নিয়ে শতাধিক সনদ অর্জন করেছেন আমিনুল হক সাদী। তিনি আন্তর্জাতিক যুব সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ইয়ুথ সামিট-এর বাংলাদেশ কান্ট্রি চ্যাপ্টারের সদস্য হিসেবেও কাজ করছেন। খেলাধুলা, বিতর্ক, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও রয়েছে তার উল্লেখযোগ্য সাফল্য। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় শতাধিক পুরস্কার ও সনদ অর্জনের পাশাপাশি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের আয়োজিত প্রতিযোগিতায় জেলা পর্যায়ে প্রথম স্থান লাভ করেন। এছাড়া যুব উন্নয়নে বিশেষ অবদানের জন্য তিনবার জেলার শ্রেষ্ঠ যুব সংগঠক হিসেবে সম্মাননা পেয়েছেন।

কিশোরগঞ্জ জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম শামীম বলেন, ‘আমিনুল হক সাদীর নেতৃত্বে পরিচালিত ‘যুব উন্নয়ন পরিষদ’ যুব সমাজের জন্য একটি রোল মডেল। তার কর্মপরিকল্পনা, পাঠাগার নির্মাণ এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বেকারদের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। আমি তার সার্বিক সফলতা ও কল্যাণ কামনা করি।’

আইও/