
|
মোদির ভিডিও ব্লক করে বিপাকে মেটা
প্রকাশ:
২৯ জুলাই, ২০২৬, ১০:৪৬ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি ফেসবুক পোস্ট কিছু সময়ের জন্য সীমাবদ্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় মেটার এক শীর্ষ কর্মকর্তাকে তলব করেছে ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় (মেইটি)। সরকারের দাবি, মেটা ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইলেও তারা যে ব্যাখ্যা দিয়েছে, তা যথেষ্ট নয়। ঘটনার সূত্রপাত ২৩ জুলাই। সেদিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে একটি সেলফি ভিডিও প্রকাশ করেন। পরে সেটি ফেসবুকেও শেয়ার করা হয়। ভারতের তরুণদের উদ্দেশে এটি ছিল তার প্রথম সরাসরি সেলফি ভিডিও। ভিডিওতে তিনি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে কঠোর আইন আনার প্রতিশ্রুতি দেন এবং বলেন, এ বিষয়ে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু ভিডিওটি ফেসবুকে প্রকাশের কিছু সময় পর সেটি সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে অনেক ব্যবহারকারী পোস্টটি দেখতে পারেননি। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এরপর মেটা জানায়, এটি ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়নি। তাদের দাবি, স্বয়ংক্রিয় কনটেন্ট ফিল্টারের একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে ভুলবশত পোস্টটি সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। পরে সেটি আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে এ ঘটনার জন্য প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে সরকারের অবস্থান ভিন্ন। তথ্যপ্রযুক্তি সচিব এস কৃষ্ণান বলেন, মেটা ভুল স্বীকার করেছে, এটি ইতিবাচক। কিন্তু শুধু ক্ষমা চাইলেই বিষয়টি শেষ হয়ে যায় না। সরকার জানতে চায়, কীভাবে এমন একটি ভুল হলো এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে, সে জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার ভাষায়, 'তারা ক্ষমা চেয়েছে এবং বলেছে যে ভুল হয়েছে। কিন্তু তাদের দেওয়া ব্যাখ্যায় আমরা সন্তুষ্ট নই। আমাদের আরও বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন।' সরকারি সূত্রের দাবি, এ ঘটনায় মেটার বৈশ্বিক জননীতি বিভাগের প্রধানকে মেইটিতে ডেকে পাঠানো হয়েছে। সেখানে পুরো ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। সূত্রগুলো জানায়, মেটা সরকারকে জানিয়েছে যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় কনটেন্ট ফিল্টার প্রধানমন্ত্রী মোদির মূল পোস্টের পাশাপাশি সেটি শেয়ার করে তৈরি হওয়া অন্যান্য পোস্টও যাচাই করছিল। সেই সময় প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে ভুল করে মূল পোস্টটিও সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে মেটা ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে রাষ্ট্রপ্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টের জন্য আলাদা নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দিয়েছে বলেও জানা গেছে। তবে সরকারের একাধিক সূত্র বলছে, শুধু প্রযুক্তিগত ত্রুটির কথা বলে দায় এড়ানো যাবে না। তাদের মতে, যদি সত্যিই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কারণে এমন ভুল হয়ে থাকে, তাহলে মেটার উচিত দ্রুত তাদের প্রযুক্তি আরো উন্নত করা। কারণ কোটি কোটি মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে থাকা একটি প্ল্যাটফর্মের কাছ থেকে এমন ভুল গ্রহণযোগ্য নয়। সরকার আরো জানিয়েছে, এটি শুধু প্রধানমন্ত্রী মোদির একটি পোস্টের বিষয় নয়। মূল প্রশ্ন হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভারতের আইন মেনে চলছে কি না। সরকার নিশ্চিত হতে চায়, মেটার বৈশ্বিক নীতিনির্ধারকরা ভারতের উদ্বেগ সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত আছেন এবং স্থানীয় টিম সেসব বিষয় যথাযথভাবে জানাচ্ছে। এদিকে বিজেপি নেত্রী প্রীতি গান্ধী প্রথম এই বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন। তিনি ফেসবুকে পোস্ট সীমাবদ্ধ করার ঘটনার সমালোচনা করে প্রশ্ন তোলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রীর একটি ভিডিও কেন সীমাবদ্ধ করা হলো। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ভারতের মানুষ কী দেখবে আর কী দেখবে না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার মেটাকে কে দিয়েছে। তার অভিযোগ, এই ঘটনা মেটার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। প্রধানমন্ত্রী মোদির ওই ভিডিও প্রকাশের সময় দেশজুড়ে পরীক্ষা-সংক্রান্ত অনিয়ম এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছিল। ভিডিওতে তিনি জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে নতুন একটি বিল সংসদে আনা হবে। পরদিন মন্ত্রিসভার বৈঠকে সেই বিলের মূল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথাও তিনি জানান। পরে ২৫ জুলাই আন্দোলনকারী সংগঠন তাদের ৩৬ দিনের আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেয়। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করার পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের আরও কয়েকটি দাবি সরকার মেনে নেওয়ার পর তারা এ সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর ভোক্তা বিষয়কমন্ত্রী প্রহ্লাদ জোশীকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর মধ্যেই মেটাকে ঘিরে সরকারের নজরদারি আরো বেড়েছে। সম্প্রতি হোয়াটসঅ্যাপের প্রস্তাবিত নতুন ব্যবহারকারী নাম (ইউজারনেম) সুবিধা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে নোটিশ দিয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। সরকারের আশঙ্কা, এই সুবিধা চালু হলে অনলাইন প্রতারণা, ফিশিং, ভুয়া পরিচয় ব্যবহার এবং ডিজিটাল জালিয়াতির ঘটনা বাড়তে পারে। এ ছাড়া ইনস্টাগ্রামে অর্থের বিনিময়ে শিশু যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত কনটেন্টের বিজ্ঞাপন প্রকাশের অভিযোগেও মেটাকে কঠোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, জনমত গঠন ও তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখছে। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এসব প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, ব্যবহারকারীর অধিকার এবং আইন মেনে চলা নিশ্চিত করতে সরকার আরো কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাইবার বিশেষজ্ঞ পবন দুগ্গল বলেন, প্রযুক্তিগত ত্রুটির অজুহাত দেখিয়ে কোনো প্ল্যাটফর্ম ভারতীয় আইন এড়িয়ে যেতে পারে না। তার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবার ব্যবহার যত বাড়বে, ততই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিও বাড়াতে হবে। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করতে সংসদীয় একটি কমিটি আগামী ৩ আগস্ট ইনস্টাগ্রামসহ বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের তলব করেছে। একই বৈঠকে ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদেরও উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। আওয়ার ইসলাম/জেডএম |