স্কুল ও আলিয়ায় কমলেও শিক্ষার্থী বাড়ছে কওমি মাদরাসায়
প্রকাশ: ৩১ জুলাই, ২০২৬, ০৩:০৫ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থী সংকোচনের প্রবণতা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সাধারণ স্কুল এবং আলিয়া মাদরাসার বিভিন্ন স্তরে শিক্ষার্থী কমলেও উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে কওমি মাদরাসায়। গত পাঁচ বছরে কওমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থী ও মাদরাসার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। দৈনিক কালবেলার একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য।

শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষা ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহ এবং আবাসিক সুবিধাসহ বিভিন্ন কারণে অভিভাবকদের একটি অংশ কওমি মাদরাসামুখী হচ্ছেন।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ১ কোটি ১৯ লাখ ৯৫ হাজার ২২২ জন। ২০২৬ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯৯ লাখ ২৩ হাজার ৮২২ জনে। অর্থাৎ, পাঁচ বছরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমেছে ২০ লাখ ৭১ হাজার ৪০০ জন।

একই সময়ে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর এসএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে। পাঁচ বছরে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষার্থী কমেছে ১ লাখ ৮১ হাজার ৩১৩ জন। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডেও কমেছে ১৯ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী। অন্যদিকে আলিম পরীক্ষায়ও পাঁচ বছরের ব্যবধানে পরীক্ষার্থী ১ হাজার ৮৫৮ জন কমেছে।

অপরদিকে কওমি শিক্ষাব্যবস্থায় দেখা যাচ্ছে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি। দেশের সবচেয়ে বড় কওমি শিক্ষা বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, এই বোর্ডের অধীনে ফযিলত (স্নাতক), সানাবিয়া’উলয়া (উচ্চ মাধ্যমিক), মুতাওয়াসসিতাহ (নিম্ন মাধ্যমিক), ইবতিদাইয়্যাহ (প্রাইমারি) ও হিফযুল কোরআনের কেন্দ্রীয় পরীক্ষা নেওয়া হয়। ২০২২ সালে এ বোর্ডের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় ১৭ হাজার ৭১৪টি মাদ্রাসার ২ লাখ ৬১ হাজার ৫৯৩ পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এরপর ২০২৩ সালে ৩ লাখ ২৪ হাজার ৭৮০ জন, ২০২৪ সালে ৩ লাখ ৬৮হাজার ৩৭৪ জন, ২০২৫ সালে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৯৫২ জন এবং ২০২৬ সালে ৪ লাখ ২৫ হাজার ৪১৭ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। শিক্ষার্থী বাড়ার পাশাপাশি ২০২৬ সালে মাদরাসার সংখ্যাও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৪৮০টিতে। অর্থাৎ, পাঁচ বছরের ব্যবধানে বেফাকের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশ নেওয়া মাদরাসা বেড়েছে ১৪ হাজার ৭৬৬টি, আর শিক্ষার্থী বেড়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৮২৪ জন। এসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা আনুমানিক ৭০ লাখ।

একইভাবে সিলেট বিভাগের আযাদ দ্বীনী এদারায়ে তা’লীম বাংলাদেশের অধীনে পাঁচ বছরে মাদরাসা বেড়েছে ২৭২টি, আর কেন্দ্রীয় পরীক্ষার্থী বেড়েছে প্রায় ১০ হাজার। এই বোর্ডের অধীনে হিফয, ফযিলত, সানা. উলয়া/ সানা. (বানাত), সানা. আম্মাহ, মুতা., ইবতেদায়ি এবং নুরানি স্তরের কেন্দ্রীয় পরীক্ষা হয়। তথ্যমতে, ২০২৬ সালে কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশ নেন ১ হাজার ১৫০টি মাদরাসার ২৬ হাজার ৯৮৪ শিক্ষার্থী। ২০২৫ সালে অংশ নেন ২৪ হাজার ৪৬৫ জন, ২০২৩ সালে ৮৫৫টি মাদরাসার ২০ হাজার ৩৭৩ জন এবং ২০২২ সালে ৮৭৮টি মাদরাসার ১৬ হাজার ৯৫৭ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়।

বেফাকের মহাপরিচালক মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভীর মতে, সাধারণ শিক্ষায় ব্যয় বৃদ্ধি, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহ, বিনামূল্যে আবাসন ও খাবারের সুবিধা এবং কোচিংনির্ভর অতিরিক্ত খরচ না থাকায় অনেক অভিভাবক সন্তানদের কওমি মাদরাসায় পাঠাচ্ছেন।

শিক্ষা বিশ্লেষকরাও বলছেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এবং ব্যয় বৃদ্ধি শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের মতে, সাধারণ শিক্ষা, আলিয়া ও কওমিসহ পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে মূল্যায়ন করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

আইও/