
|
হেজবুত তাওহীদ কেন ভ্রান্ত, কী তাদের আকিদা
প্রকাশ:
০২ আগস্ট, ২০২৬, ০৫:৪৫ বিকাল
নিউজ ডেস্ক |
বিশেষ প্রতিনিধি সাম্প্রতিক সময়ে হেজবুত তাওহীদ নামে পরিচিত একটি সংগঠনের প্রচারণা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে দৃশ্যমান হচ্ছে। সংগঠনটি ইসলাম, সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে নানা বক্তব্য প্রচার করলেও তাদের আকিদা-বিশ্বাস ও ধর্মীয় মতাদর্শ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি জানিয়ে আসছেন দেশের আলেম-উলামা। গতকাল শনিবার (১ আগস্ট) নোয়াখালীতে হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে ঐতিহাসিক মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে ঈমান বিধ্বংসী এই ভ্রান্ত সংগঠনটি নিষিদ্ধের দাবি উঠেছে। হেজবুত তাওহীদের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী। তার ইসলামি শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং আরবি ভাষাজ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি মূলত কলকাতায় অবস্থানকালে এনায়েতুল্লাহ খান মাশরেকীর প্রতিষ্ঠিত ‘তেহরিক-ই-খাকসার’ আন্দোলনের ভাবধারায় প্রভাবিত হন এবং পরবর্তী সময়ে সেই চিন্তাধারাকেই নতুন রূপ দিয়ে ১৯৯৫ সালে ‘হেজবুত তাওহীদ’ প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনটির আদর্শকে ‘কাশফ’ ও ‘ইলহাম’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও এর মূল উৎস ছিল মাশরেকীর চিন্তাধারা। কেন হেজবুত তাওহীদ ভ্রান্ত ও ঈমান বিধ্বংসী ১. সব ধর্মকেই সমান সত্য মনে করা: হেজবুত তাওহীদ ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও ইহুদিসহ সব ধর্মকে সমানভাবে সত্য মনে করে এবং যেকোনো ধর্ম অনুসরণ করেও মুক্তি লাভ সম্ভব বলে প্রচার করে। এটি কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণার বিরোধী। কারণ কুরআনে বলা হয়েছে— "নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে একমাত্র মনোনীত দ্বীন হলো ইসলাম।"(সূরা আলে ইমরান: ১৯) এছাড়া ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্ম আল্লাহ গ্রহণ করবেন না—এ ঘোষণাও কুরআনে স্পষ্টভাবে এসেছে (সূরা আলে ইমরান: ৮৫)। ২. প্রচলিত ইসলামকে বিকৃত দাবি: হেজবুত তাওহীদের মতে বর্তমানে মুসলমানদের অনুসৃত ইসলাম প্রকৃত ইসলাম নয়; বরং তা বিকৃত হয়ে গেছে। এই বক্তব্য ইসলামের সংরক্ষণ সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসের ঘোষণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ ইসলামের হেফাজতের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তাআলা গ্রহণ করেছেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত একটি দল সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। ৩. অধিকাংশ মুসলমানকে কাফের বা মুশরিক বলা: হেজবুত তাওহীদ নিজেদের অনুসারী ছাড়া পৃথিবীর অন্য মুসলমানদের কাফের, মুশরিক বা অভিশপ্ত বলে আখ্যায়িত করে। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক তাকফিরি চিন্তাধারা। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) অকারণে কোনো মুসলমানকে কাফের বলার ব্যাপারে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। ৪. নামাজ-রোজাসহ মৌলিক ইবাদতের ব্যাখ্যা পরিবর্তন: সংগঠনটি নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতকে ইসলামের মূল ইবাদত হিসেবে গুরুত্ব দেয় না। বরং এগুলোকে গৌণ বা আনুষঙ্গিক বিষয় হিসেবে ব্যাখ্যা করে এবং ইবাদতের নতুন সংজ্ঞা প্রদান করে। ইসলামের মৌলিক ইবাদতের এমন ব্যাখ্যা কুরআন-সুন্নাহর পরিপন্থী। ৫. শরিয়ত ও সুন্নাহকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য: হেজবুত তাওহীদের বিভিন্ন প্রকাশনায় দাড়ি, টুপি, মিসওয়াক, টাখনুর ওপর কাপড় পরা, তাহাজ্জুদ, জিকিরসহ বহু সুন্নাহকে তুচ্ছ বা অপ্রয়োজনীয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহকে বিদ্রুপ করা ঈমানের জন্য মারাত্মক হুমকি। ৬. হারাম বিষয়কে বৈধ বলা: সংগঠনটি গান, নৃত্য, নাটক, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসব এবং নারীদের পর্দার বিষয়ে প্রচলিত ইসলামী অবস্থানের বিপরীত মত পোষণ করে। তারা কিছু ক্ষেত্রে এসব কর্মকাণ্ডকে শুধু বৈধই নয়, বরং ইবাদতের পর্যায়েও গণ্য করেছে। ৭. মু'জিযার দাবি: প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী ২০০৮ সালে নিজের জন্য অলৌকিক মু'জিযার দাবি করেন এবং এটিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিজের আন্দোলনের সত্যতার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেন। ইসলামি আকিদা অনুযায়ী মু'জিযা কেবল নবী-রাসুলদের সঙ্গেই সম্পৃক্ত। সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পর আর কোনো ব্যক্তি মু'জিযার দাবি করতে পারেন না। হেজবুত তাওহীদ সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য কয়েকটি কৌশল অবলম্বন করে থাকে। যেমন— উলামায়ে কেরামের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা। ভালো কথার সঙ্গে ভ্রান্ত আকিদা মিশিয়ে উপস্থাপন। কুরআন-হাদিসের অপব্যাখ্যা। জাল বা ভিত্তিহীন হাদিস উদ্ধৃত করা। ইসলামের ইতিহাস বিকৃতভাবে তুলে ধরা। হেজবুত তাওহীদের ভ্রান্তি কেবল একটি বা দুটি বিষয়ে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাদের আকিদা, ইবাদত, শরিয়ত, সুন্নাহ ও ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসসংক্রান্ত বহু বিষয়ে আপত্তি রয়েছে। বাহ্যিকভাবে সামাজিক বা নৈতিক কিছু ভালো কথা বলা হলেও সংগঠনটির মৌলিক আকিদা মুসলিম উম্মাহর স্বীকৃত কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই মুসলমানদের এ বিষয়ে সচেতন থাকা এবং বিভ্রান্তিকর মতাদর্শ সম্পর্কে সতর্ক থাকার কোনো বিকল্প নেই। আইও/ |