
|
আমরা কেন ভারতীয় আলেমমুখী?
প্রকাশ:
০৩ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৫৫ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
মুফতি লুৎফর রহমান ফরায়েজী আমরা কেন ভারতীয় আলেমমুখী?—প্রশ্নটি যতটা চটকদার, ততটা কি সত্যনিষ্ঠ? আজকাল কিছু নবীন বুদ্ধিজীবী খুব আত্মতৃপ্তির সঙ্গে প্রশ্ন তোলেন, ‘বাংলাদেশে এত আলেম থাকতে ভারতীয় আলেমদের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে কেন? আমাদের দেশে কি যোগ্য আলেম নেই?’ প্রশ্নটি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন এর মধ্যেই উত্তর লুকিয়ে আছে। শ্রোতারাও বাহবা দেন—‘দারুণ প্রশ্ন!’ অথচ প্রশ্নটি যতটা আকর্ষণীয়, তার ভিত্তি ততটাই দুর্বল। প্রথমেই একটি ঐতিহাসিক সত্য স্মরণ করা দরকার। এ অঞ্চলে ইসলামের বিস্তার হয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশের মাধ্যমেই। কওমি শিক্ষার মূলধারাও এসেছে দারুল উলুম দেওবন্দের সূত্রে। যে ইলমি ধারার মাধ্যমে আমরা উপকৃত হয়েছি, সেই ধারার প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সম্পর্ক বজায় রাখা কি অপরাধ? নাকি ইতিহাস ভুলে যাওয়াই এখন বুদ্ধিবৃত্তিকতার নতুন সংজ্ঞা? আরেকটি কথা স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন—বাংলাদেশ ইসলামি জ্ঞানের ক্ষেত্রে কোনো ভিখারির রাষ্ট্র নয়। তাফসির, হাদিস, ফিকহ, আকিদা, উসুল, ইসলামি অর্থনীতি কিংবা সমসাময়িক নানা বিষয়ে আমাদের দেশে অসংখ্য যোগ্য আলেম রয়েছেন। তাদের ইলম, গবেষণা ও ফতোয়ার ওপর দেশের মানুষ আস্থা রাখেন। সুতরাং বিদেশি আলেমকে আমন্ত্রণ জানানো মানে দেশীয় আলেমের অযোগ্যতা—এ ধারণা বাস্তবতাবিবর্জিত। তাহলে বিদেশি আলেমদের কেন আনা হয়? খুবই সহজ উত্তর—ইলমি আদান-প্রদান, পারস্পরিক সম্পর্ক, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং ঐতিহ্যগত নিসবত রক্ষার জন্য। পৃথিবীর সব জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেই এটি স্বাভাবিক রীতি। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, এই স্বাভাবিক বিষয়টিকেই কেবল আলেমদের ক্ষেত্রে বিদ্রূপের উপকরণ বানানো হয়। এখন আমাদেরও কয়েকটি প্রশ্ন আছে। বাংলাদেশে এত লেখক থাকতে কলকাতার কোনো লেখক এলে কেন সাহিত্যাঙ্গনে উচ্ছ্বাসের ঢেউ ওঠে? তাহলে কি বাংলাদেশের লেখকেরা অযোগ্য? দেশে অসংখ্য শিল্পী থাকা সত্ত্বেও ভারত বা পাকিস্তানের শিল্পীদের আনতে এত আগ্রহ কেন? তাহলে কি দেশীয় শিল্পীদের ওপর আস্থা নেই? প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ চিকিৎসার জন্য ভারতমুখী হন কেন? তাহলে কি বাংলাদেশের সব চিকিৎসক অযোগ্য? এসব প্রশ্নের উত্তর যদি হয়—জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, যোগাযোগ ও পারস্পরিক বিনিময়ের প্রয়োজন আছে—তাহলে আলেমদের ক্ষেত্রেই সেই একই যুক্তি অগ্রহণযোগ্য হবে কেন? আসলে সমস্যা ভারতীয় আলেম নন; সমস্যা হলো, কিছু মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। একই কাজ অন্য অঙ্গনে হলে সেটি হয় আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, আর আলেমদের ক্ষেত্রে হলেই হয়ে যায় মানসিক দাসত্ব! এই দ্বিমুখী মানদণ্ডই প্রকৃত প্রশ্নের জন্ম দেয়। তাই বলব, প্রশ্ন করুন—অবশ্যই করুন। তবে প্রশ্ন যেন তথ্যের ওপর দাঁড়ায়, স্লোগানের ওপর নয়; ইতিহাসের ওপর দাঁড়ায়, পূর্বধারণার ওপর নয়। কারণ, চটকদার প্রশ্ন করা সহজ; কিন্তু ন্যায়সঙ্গত প্রশ্ন করা অনেক কঠিন। লেখক: পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনস্টিটিউট অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা আরএইচ/ |