রাশিয়ায় ধরপাকড়ের মুখে আলেমরা, বাড়ছে ইসলাম বিদ্বেষ
প্রকাশ: ১৪ জুন, ২০২৬, ১০:৩০ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

রাশিয়ায় সম্প্রতি একাধিক মুসলিম আলেম ও কমিউনিটি নেতার গ্রেফতার দেশটির মুসলিম সমাজে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। চলতি বছরের মে মাসে রাশিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী অন্তত আটজন মুসলিম ধর্মীয় নেতা ও প্রতিনিধিকে আটক করে। সরকারি গণমাধ্যমে ঘটনাগুলো সীমিতভাবে প্রচার হলেও স্বাধীন ও নির্বাসিত গণমাধ্যমগুলো এটিকে রাশিয়ায় ক্রমবর্ধমান ইসলামবিদ্বেষ এবং মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ বৃদ্ধির সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে তুলে ধরছে।

আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন কারেলিয়ার সাবেক মুফতি উইসাম বার্দভিল, যাকে শেরেমেতিয়েভো বিমানবন্দরে পুলিশের নির্দেশ অমান্যের অভিযোগে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তার সহযোগী ধর্মীয় নেতা আখমাদ তাঙ্গিয়েভকেও এফএসবি আটক করে। এছাড়া মর্দোভিয়া প্রজাতন্ত্রের মুফতি রয়াল আসেনভকে ঘুষ দাবির সন্দেহে গ্রেফতার করা হয়।

রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে পরিচালিত এই অভিযানে সেন্ট পিটার্সবার্গ, সারাতভ, তাতারস্তান, মারমানস্ক ও পেট্রোজাভোদস্কের মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকজন ব্যক্তিকে আটক করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ, প্রশাসনিক অবাধ্যতা এবং কিছু ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ ঘোষিত মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ আনা হয়। তবে স্বাধীন পর্যবেক্ষকরা অভিযোগগুলোর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছেন।

গ্রেফতারের পর রাশিয়ার উগ্র জাতীয়তাবাদী ও ডানপন্থি গোষ্ঠীগুলো প্রকাশ্যে সন্তোষ প্রকাশ করে। তারা দীর্ঘদিন ধরে ক্রেমলিন-সমর্থিত স্পিরিচুয়াল বোর্ড অব মুসলিমস (ডিইউএম)-এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিল। কিছু উগ্র ব্লগার ও প্রচারক ডিইউএমের নেতাদের “বিদেশি প্রভাব” এবং “রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের” সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ করেন এবং মুসলিম নেতাদের “পঞ্চম স্তম্ভ” হিসেবে আখ্যা দেন।

এই উত্তেজনার মধ্যেই ডিইউএমের প্রথম উপপ্রধান দামির মুখেতদিনভকে কেন্দ্র করে আরেকটি বিতর্ক সৃষ্টি হয়। তার কার্যালয়ে প্রদর্শিত ‘মঙ্গোল-তাতার যুগ’ বিষয়ক একটি চিত্রকর্মকে কেন্দ্র করে রুশ জাতীয়তাবাদী মহলে সমালোচনা শুরু হয়। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, চিত্রকর্মটি রাশিয়ার ঐতিহাসিক বর্ণনার বিরোধী। পরে মুখেতদিনভ ছবিটি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং তার পরিবর্তে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা তুলে ধরা একটি চিত্রকর্ম স্থাপনের ঘোষণা দেন।

রাশিয়ার মুসলিমদের অন্যতম প্রধান সংগঠন ডিইউএম শুরুতে এসব গ্রেফতার নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো কঠোর অবস্থান নেয়নি। সংগঠনের একটি সূত্র জানায়, তারা এটিকে “গণগ্রেফতার” বা “মুসলিমবিরোধী প্রচারণা” হিসেবে দেখছে না। তবে পরে ডিইউএমের প্রধান মুফতি রাভিল গাইনুতদিন বলেন, সংগঠনটিকে চরমপন্থা, বিদেশি প্রভাব ও জাতিগত উত্তেজনার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তিনি অভিযোগ করেন, এ ধরনের প্রচারণা সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করছে এবং রাশিয়ার বাইরের প্রতিপক্ষের স্বার্থকে শক্তিশালী করছে।

তবে গাইনুতদিনের বক্তব্যে আটক আলেমদের বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য ছিল না। তিনি কেবল জানান, ডিইউএম সবসময় ফেডারেল ও আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতার নীতিতে বিশ্বাস করে। দীর্ঘদিন ধরেই তার সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সুসম্পর্ক রয়েছে।

এদিকে মুসলিমদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে আবাসিক ভবনে জামাতবদ্ধ নামাজ ও ধর্মীয় সমাবেশ সীমিত করার জন্য প্রস্তাবিত নতুন আইন। ডিইউএম প্রধান রাভিল গাইনুতদিন এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট পুতিনের কাছে চিঠি লিখে সতর্ক করেন যে, আইনটি ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী হতে পারে। তার মতে, রাশিয়ায় পর্যাপ্ত মসজিদ ও উন্মুক্ত উপাসনালয়ের অভাব থাকায় এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা মুসলিমদের জন্য বিশেষভাবে সমস্যার সৃষ্টি করবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রাশিয়ায় অভিবাসীবিরোধী এবং ইসলামবিদ্বেষী মনোভাব আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ-সমর্থক উগ্র জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো ‘অর্থোডক্স রাশিয়া’ ধারণাকে জোরালোভাবে প্রচার করছে, যা বহু জাতিগোষ্ঠী ও বহু ধর্মের রাশিয়ান পরিচয়ের সঙ্গে সংঘাত তৈরি করতে পারে।

রাশিয়ায় দুই কোটিরও বেশি মুসলিম বাস করে, যা ইউরোপের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যাগুলোর একটি। উত্তর ককেশাস ও ভলগা অঞ্চলে তাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। অতীতে ক্রেমলিন মুসলিম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে বৃহৎ মসজিদ নির্মাণ, অনুগত মুসলিম নেতৃত্বের পৃষ্ঠপোষকতা এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তা তুলে ধরেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও ডিইউএমসহ অনেক মুসলিম প্রতিষ্ঠান রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় নীতিকে সমর্থন করেছে।

তবে সাম্প্রতিক গ্রেফতার, নতুন আইন এবং মুসলিম নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা প্রচারণা একটি নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে—রাশিয়ার মুসলিম সমাজের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আনুগত্য কি এখনো তাদের নিরাপত্তা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে যথেষ্ট হবে? সূত্র: বিবিসি বাংলা

জেডএম/