কলম্বিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহত অন্তত ১৩২, জরুরি অবস্থা জারি
প্রকাশ: ১১ আগস্ট, ২০২৬, ১০:১৮ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

লাতিন আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ায় বিগত কয়েক বছরের মধ্যে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ১৩২ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনার পর দেশটিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও বহু মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক পরিষেবা জানিয়েছে—স্থানীয় সময় সকাল গতকাল সোমবার ৭টা ৩৪ মিনিটে ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল চোকো প্রদেশে এবং ভূপৃষ্ঠ থেকে এর গভীরতা ছিল ১০৩ কিলোমিটার (৬৪ মাইল)। পশ্চিম কলম্বিয়ার কয়েকশ মাইলজুড়ে বিস্তীর্ণ এলাকায় ভূমিকম্পটির কম্পন অনুভূত হয়েছে।

নিহতদের বড় একটি অংশের মৃত্যু হয়েছে কলম্বিয়ার কফি উৎপাদনকারী অঞ্চলের শহর পেরেইরায়। আশপাশের শহরগুলো এবং ভালে দেল কাউকা অঞ্চলও ভূমিকম্পে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভূমিকম্পটির উপকেন্দ্র ছিল চোকো প্রদেশের সান হোসে দেল পালমার গ্রামের কাছে। তবে স্থানীয় মেয়র লেওন ফাবিও মারিন মোনকাদা বলেছেন, গ্রামটির সঙ্গে যোগাযোগের সড়কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সেখানে ‘অলৌকিকভাবে’ কোনো মৃত্যু বা আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি।

কলম্বিয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যাপিটাল সিটিজ সোমবারের এক হালনাগাদ বিবৃতিতে জানিয়েছে, ভূমিকম্পে ৪৮০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। ভূমিকম্পটির উপকেন্দ্র থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার (৩৪ মাইল) দূরে অবস্থিত পেরেইরা শহরে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

কলম্বিয়ায় ৭.৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প—নিহত ২৬, বাড়ছে সংখ্যাকলম্বিয়ায় ৭.৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প—নিহত ২৬, বাড়ছে সংখ্যা

বিবিসি যাচাই করা ভিডিওতে দেখা গেছে, শহরের প্রধান চত্বর প্লাজা বলিভারে অন্তত একটি ভবন ধসে পড়েছে। সেখানে বহু মানুষ জড়ো হয়েছিলেন এবং ধসের পর খোলা চত্বরজুড়ে ধ্বংসাবশেষ ও ধুলোর স্তর ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পেরেইরার মহানগর এলাকায় অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন এবং ৬৫টি ভবন ধসে পড়েছে। এর মধ্যে ১৫টি ভবনের ধ্বংসস্তূপে মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শহরের কিছু এলাকায় স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ভোর ৫টা পর্যন্ত কারফিউ জারি রয়েছে। পেরেইরা থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কালি শহরে ৩২টি ভবন ধসে পড়েছে।

মানিজালেস, কিবদো, মেডেলিন এবং চোকো ও ভালে দেল কাউকা অঞ্চলের বিভিন্ন স্থান থেকেও মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। মানিজালেসে অন্তত দুজন নিহত হয়েছেন। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসকে অ্যাঞ্জেলিকা আভিলা বলেন, ভূমিকম্পের সময় তিনি মানিজালেসের একটি হোটেলে অবস্থান করছিলেন। তিনি জানান, ভূমিকম্প শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালে ফাটল দেখা দিতে থাকে। তাঁর ভাষায়, ‘সবাই চিৎকার করছিল...আমি পাশের ভবনগুলো থেকে ধুলো বের হতে দেখেছি এবং দেয়াল থেকে ইট খসে পড়ছিল।’

মানিজালেসের সাংবাদিক ও আবহাওয়াবিদ লুইস ফেলিপে মোলিনা ভূমিকম্পের সময় বাড়িতে ছিলেন। তার অবস্থান ছিল ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে। তিনি জানান, অতীতে ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতার কারণে শহরটিতে ‘ভূমিকম্প প্রতিরোধী ভবন নির্মাণের অত্যন্ত কঠোর বিধিমালা’ রয়েছে। ফলে তার ভবনটি ভূমিকম্পের অভিঘাত সহ্য করতে পেরেছে।

বিবিসি মুন্দোকে তিনি বলেন, ‘আমার ৪৫০টি বই আছে, কিন্তু তাকের ওপর মাত্র কয়েকটি বই দাঁড়িয়ে ছিল। কাচ ভাঙার শব্দ এবং মানুষের চিৎকার শোনা যাচ্ছিল।’ তিনি বলেন, ‘এটি ছিল ভয়াবহ এবং আতঙ্কজনক অভিজ্ঞতা।’

দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পেরেইরা, মানিজালেস, কিবদো, আর্মেনিয়া, কার্তাগো এবং বুয়েনাভেনতুরাসহ কয়েকটি আঞ্চলিক বিমানবন্দরে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রাজধানী বোগোতায় গাছ ও ট্রাফিক সিগন্যালগুলো প্রবলভাবে কেঁপে ওঠে। ভবনগুলোতে ফাটল দেখা দেওয়ার খবর পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত শহরের অবকাঠামোতে গুরুতর কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেশী ভেনেজুয়েলা, ইকুয়েডর ও পানামা পর্যন্ত ভূমিকম্পের কম্পন অনুভূত হয়েছে। কলম্বিয়ার এই ভূমিকম্পের মাত্র দুই মাসেরও কম সময় আগে ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলে পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল। ওই ঘটনায় ৬ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষ নিহত হন। ভূমিকম্পের মানচিত্রে দেখা গেছে, এর উপকেন্দ্র ছিল কালি শহরের উত্তরে এবং মানিজালেসের পশ্চিমে। মানচিত্রে পেরেইরা ও কিবদোর অবস্থানও চিহ্নিত করা হয়েছে।

কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা দেশটিতে ‘জাতীয় দুর্যোগ পরিস্থিতি’ ঘোষণা করেছেন। এর ফলে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ ক্ষমতা কার্যকর হয়েছে, যার মধ্যে বাজেট পুনর্বণ্টনের ক্ষমতাও রয়েছে। শুক্রবারই প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করা নতুন রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই এটি এমন এক সংকটে পরিণত হয়েছে, যা তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আরএইচ/