শাহজালালের (রহ.) মাজারে দানব্যবস্থায় স্বচ্ছতার উদ্যোগ, প্রশংসায় ভাসছে প্রশাসন
প্রকাশ: ২০ জুন, ২০২৬, ০৮:৩১ রাত
নিউজ ডেস্ক

ইমরান ওবাইদ—

সিলেটের ঐতিহাসিক হজরত শাহজালাল রহ.-এর মাজারের দানব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন উদ্যোগ নিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দানের অর্থ ব্যবস্থাপনায় প্রচলিত অনিয়ম দূর করে মাজার, মসজিদ ও মাদরাসার উন্নয়নে সুশাসন প্রতিষ্ঠাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছে প্রশাসন। তাদের এই উদ্যোগ প্রশংসিত হচ্ছে নানা মহলে। আলেমদের পক্ষ থেকে এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানানো হয়েছে। যদিও মাজারের ডেগ সিলগালা করার ঘটনায় ভক্তদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষও দেখা দিয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) জেলা প্রশাসন মাজারে দান সংগ্রহের জন্য ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী তিনটি ডেগ সিলগালা করে নতুন দানবাক্স স্থাপন করে। এ বিষয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দানের অর্থ বণ্টন ও ব্যবস্থাপনায় একটি অনিয়মতান্ত্রিক ধারা চলে আসছিল। সেই পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে পুরো ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহির আওতায় আনতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, দানের অর্থ সরকার গ্রহণ করবে না; বরং মাজার, মসজিদ ও মাদ্রাসার উন্নয়নসহ সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হবে। এ লক্ষ্যে একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে আহ্বায়ক করে খাদেম, মসজিদ ও মাদ্রাসার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ১০ সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

এদিকে ডেগ সিলগালার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাজারের কিছু ভক্ত প্রতিবাদ জানান। ঘটনার দিন রাতে মাজার প্রাঙ্গণে ‘শাহজালাল, শাহজালাল’ স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ করতেও দেখা যায় তাদের। বিষয়টি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ধর্মীয় ও সামাজিক অঙ্গনে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মুফতি রেজাউল করিম আবরার তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেছেন, শাহজালাল মাজারকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের আবেগকে ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে ‘ডেগ ব্যবসা’ পরিচালিত হয়ে আসছিল। তিনি বলেন, ‘মাজার জিয়ারতের স্থান। সেখানে শায়িত কোনো অলির অর্থের প্রয়োজন নেই। মানুষ মাজারে অর্থ দান করার পরিবর্তে অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে।’

একই সঙ্গে তিনি মাজারে কুমির, ডেগ, চাদর বা কলসিতে মানত ও আশা পূরণের উদ্দেশ্যে অর্থ প্রদান থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান এবং সুন্নাহসম্মত পদ্ধতিতে জিয়ারতের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বিশিষ্ট ইসলামি আলোচক মাওলানা রুহুল আমিন সাদী (সাইমুম সাদী) জেলা প্রশাসনের এ পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেছেন, দীর্ঘদিন ধরে মাজারে ভক্তদের দেওয়া দান-সদকার অর্থ মুতাওয়াল্লিরা বংশপরম্পরায় ভোগ করে আসছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে গেলে কিছু প্রতিক্রিয়া আসা স্বাভাবিক। তবে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বয়ের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও সিলেট হেফাজতে ইসলামের সভাপতি মাওলানা রেজাউল করিম জালালি বলেন, দানবাক্স স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হয়নি। বরং হিসাব-নিকাশে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সাময়িকভাবে সিলগালা করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, জেলা প্রশাসনের এ উদ্যোগের পেছনে কোনো নেতিবাচক উদ্দেশ্য নেই; বরং মাজার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, মাজার ও মাদরাসা—উভয় প্রতিষ্ঠানই শাহজালাল দরগাহকেন্দ্রিক হওয়ায় সেগুলোর সুবিধা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা সবার জন্য উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ হওয়া উচিত।

মাজারে সুন্নাহভিত্তিক জিয়ারতের পরিবেশ এবং অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের প্রসঙ্গে মাওলানা রেজাউল করিম জালালি বলেন, ১৯৮৬ সাল থেকেই মাজারকেন্দ্রিক বিভিন্ন অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড বন্ধে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন তারা। পরবর্তীতে মাজার কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বেপর্দা অবস্থায় নারীদের প্রবেশ, গাঁজার আসর এবং নারী-পুরুষের অনিয়ন্ত্রিত সমাবেশের মতো কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে মাজারের পরিবেশ আগের তুলনায় অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত ও শৃঙ্খলাপূর্ণ হয়েছে।

শাহজালাল (রহ.) মাজারের দান ব্যবস্থাপনা নিয়ে জেলা প্রশাসনের এই পদক্ষেপ একদিকে যেমন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার দাবিকে সামনে এনেছে, অন্যদিকে ঐতিহ্যগত ব্যবস্থাপনায় অভ্যস্ত একটি অংশের মধ্যে উদ্বেগও তৈরি করেছে। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকেই মনে করছেন, প্রশাসন, মাজার কর্তৃপক্ষ ও ধর্মীয় নেতাদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।

আইও