সূর্যগ্রহণ কি উদযাপন করার বিষয়, ইসলাম কী বলে?
প্রকাশ: ১২ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:৫৯ বিকাল
নিউজ ডেস্ক

|| মুফতি আহমদ যাকারিয়া ||

সূর্যগ্রহণ দেখার বা উদযাপন করার কোনো বিষয় নয়। সূর্যগ্রহণের সুন্নাত আমল হচ্ছে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা, দোয়া করা, নামাজ পড়া এবং সাদাকাহ করা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসব আমলগুলোর মাধ্যমে সূর্যগ্রহণ অতিবাহিত করেছেন।

আল্লাহ তাআলা বান্দাকে সতর্ক করার জন্য আকাশ-মহাকাশে বিভিন্ন নিদর্শন দিয়েছেন। সুরা বনি ইসরাঈলে আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَمَا نُرْسِلُ بِالاٌّيَاتِ إِلاَّ تَخْوِيفًا

অর্থ: ‘আর আমি ভীতি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যেই নিদর্শনাবলি প্রেরণ করি।’ (সুরা বনি ইসরাঈল: ৫৯)

সূর্যগ্রহণের সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা করতেন। এ ব্যাপারে অনেক হাদিস বর্ণিত—

আবূ মূসা আশআরী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: ‘একবার সূর্যগ্রহণ হলো। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন; তিনি কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা করছিলেন। এরপর তিনি মসজিদে আসেন। এর আগে আমি তাঁকে যেমন করতে দেখেছি, তার চেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কিয়াম, রুকু ও সিজদাসহকারে নামাজ আদায় করলেন। আর তিনি বললেন, এগুলো হলো আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত নিদর্শন; এগুলো কারো মৃত্যু বা জন্মের কারণে ঘটে না। বরং আল্লাহ তাআলা এর দ্বারা তাঁর বান্দাদের মাঝে ভীতির সঞ্চার করেন। কাজেই যখন তোমরা এর কিছু দেখতে পাবে, তখন ভীতবিহ্বল অবস্থায় আল্লাহর জিকির, দোয়া ও ইস্তিগফারে মগ্ন হবে।’
(সহিহ বুখারী: ১০৫৯, সহিহ মুসলিম: ৯১২)

অন্য হাদিসে আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

إِنّ الشّمْسَ وَالقَمَرَ لاَ يَخْسِفَانِ لِمَوْتِ أَحَدٍ وَلاَ لِحَيَاتِهِ، وَلَكِنّهُمَا آيَتَانِ مِنْ آيَاتِ اللهِ، فَإِذَا رَأَيْتُمُوهَا فَصَلّوا.

‘সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণ কারো মৃত্যু বা জন্মের কারণে হয় না; এগুলো আল্লাহর নিদর্শনাবলির দুটি নিদর্শনমাত্র। যখন তোমরা তা দেখবে তখন নামাজে মশগুল হবে।’ (সহিহ বুখারী: ১০৪২, সহিহ মুসলিম: ৯১৪ (মিরকাতুল মাফাতীহ, সংশ্লিষ্ট হাদিসের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

إِنّ الشّمْسَ وَالقَمَرَ آيَتَانِ مِنْ آيَاتِ اللهِ، لاَ يَخْسِفَانِ لِمَوْتِ أَحَدٍ وَلاَ لِحَيَاتِهِ، فَإِذَا رَأَيْتُمْ ذَلِكَ، فَادْعُوا اللهَ، وَكَبِّرُوا وَصَلّوا وَتَصَدّقُوا.

‘সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর নিদর্শনাবলির মধ্য হতে দুটি নিদর্শনমাত্র। কারো মৃত্যু বা জন্মের কারণে সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণ হয় না। যখন তোমরা তা দেখবে তখন বেশি বেশি আল্লাহকে ডাকবে (দুয়ায় মশগুল হবে), বেশি বেশি তাকবীর বলবে, নামাজে মশগুল হবে এবং সাদাকাহ করবে।’ (সহীহ বুখারী: ১০৪৪)

আরেক বর্ণনায় রয়েছে—

فَإِذَا رَأَيْتُمْ كُسُوفًا، فَاذْكُرُوا اللهَ حَتّى يَنْجَلِيَا.

“যখন সূর্যগ্রহণ দেখবে তখন তা দূরীভূত হওয়া পর্যন্ত বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করবে।” (সহিহ মুসলিম: ৯০১)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ‏ "‏ إِنَّ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ لاَ يَنْكَسِفَانِ لِمَوْتِ أَحَدٍ مِنَ النَّاسِ، وَلَكِنَّهُمَا آيَتَانِ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ، فَإِذَا رَأَيْتُمُوهُمَا فَقُومُوا فَصَلُّوا ‏"‏‏.‏

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোনো লোকের মৃত্যুর কারণে কখনো সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ হয় না। তবে তা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের মধ্যে দুটি নিদর্শন। তাই তোমরা যখন সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ হতে দেখবে, তখন দাঁড়িয়ে যাবে এবং নামাজ আদায় করবে।
(সহিহ বুখারি, ১০৪১)

হাদিসে আছে,

عَنْ أَبِي بَكْرَةَ، قَالَ كُنَّا عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَانْكَسَفَتِ الشَّمْسُ، فَقَامَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَجُرُّ رِدَاءَهُ حَتَّى دَخَلَ الْمَسْجِدَ، فَدَخَلْنَا فَصَلَّى بِنَا رَكْعَتَيْنِ، حَتَّى انْجَلَتِ الشَّمْسُ فَقَالَ صلى الله عليه وسلم ‏ "‏ إِنَّ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ لاَ يَنْكَسِفَانِ لِمَوْتِ أَحَدٍ، فَإِذَا رَأَيْتُمُوهُمَا فَصَلُّوا، وَادْعُوا، حَتَّى يُكْشَفَ مَا بِكُمْ ‏"‏‏.  

আবু বাকরাহ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট ছিলাম, এ সময় সূর্যগ্রহণ শুরু হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন উঠে দাঁড়ালেন এবং নিজের চাদর টানতে টানতে মসজিদে প্রবেশ করলেন এবং আমরাও প্রবেশ করলাম। তিনি আমাদেরকে নিয়ে সূর্য প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত দু’রাকআত সালাত আদায় করলেন। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন; কারো মৃত্যুর কারণে কখনো সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ হয় না। তোমরা যখন সূর্যগ্রহণ দেখবে তখন এ অবস্থা দূর না হওয়া পর্যন্ত সালাত আদায় করবে এবং দুআ করতে থাকবে। (সহিহ বুখারি: ১০৪০)

এ হাদিসের আলোকে বোঝা যায় যে, সালাতুল কুসুফ বা সূর্যগ্রহণের নামাজ দুই রাকাআত। আর তা সূর্যগ্রহণ শুরু থেকে নিয়ে শেষ সময়ে পড়তে হয়। দীর্ঘ তিলওয়াত, রুকু ও সেজদার মাধ্যমে সালাতুল কুসুফ পড়তে হয়। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কুসুফের নামাজ ছিল দীর্ঘ। তাই সূর্যগ্রহণের সময় অন্তরে ভয় জাগ্রত রাখাই মুমিনদের একান্ত কর্তব্য। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সূর্যগ্রহণের সময় নামাজ পড়তেন।

দশম হিজরিতে যখন মদিনায় সূর্যগ্রহণ হয়, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা দিয়ে লোকদেরকে নামাজের জন্য সমবেত করেছিলেন। সে সময় তিনি জীবনের সর্বাধিক দীর্ঘ নামাজের জামাআতের ইমামতি করেছিলেন। সূর্যগ্রহণের সে নামাজের কিয়াম, রুকু, সেজদাহ—মোটকথা, প্রত্যেকটি রুকন সাধারণ সময়ের (অভ্যাসের) চেয়ে অনেক দীর্ঘ (লম্বা) ছিল।

সূর্যগ্রহণের নামাজ পড়ার নিয়ম:

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সূর্যগ্রহণের সময় নামাজ পড়তেন। এ নামাজকে 'সালাতুল কুসুফ' বলা হয়। তাই সূর্যগ্রহণের সময় জামাআতের সঙ্গে নামাজ আদায় করা সুন্নাত। আরবিতে সূর্যগ্রহণকে ‘কুসুফ’ বলা হয়। আর সূর্যগ্রহণের নামাজকে ‘সালাতুল কুসুফ’ বলা হয়।

নামাজ পড়ার পদ্ধতির মাঝে কোনো বিশেষ পার্থক্য নেই। অন্যান্য নফল নামাজ যেভাবে আদায় করা হয়, প্রতি রাকাতে সুরা ফাতিহার পর সুরা মেলানো এবং এক রুকু ও দুই সেজদার মাধ্যমে, তারপর শেষ বৈঠক করা। চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণের নামাজও সেভাবেই আদায় করবে।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সময় একবার সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। তিনি এক ব্যক্তিকে এ ঘোষণা দেওয়ার উদ্দেশে পাঠিয়ে দিলেন—'জামাআতে নামাজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।' (ঘোষণা শুনে) সবাই একত্রিত হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সামনে অগ্রসর হয়ে তাকবির উচ্চারণ করলেন এবং দুই রাকআত নামাজ আদায় করলেন। দুই রাকআতে চারটি রুকু ও চারটি সাজদাহ করলেন। (সহীহ মুসলিম)

সূর্যগ্রহণের নামাজে আজান ও ইকামত নেই। মাকরুহ ওয়াক্ত ব্যতীত মসজিদে এই নামাজ জামাআতের সঙ্গে আদায় করা সুন্নাত। দিনের বেলায় সূর্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। আর দিনের নামাজ হওয়ার কারণে কেরাত আস্তে পড়াই নিয়ম।

হাদিসে এসেছে—

জাবির ইবনে সামুরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিয়ে দুই রাকাআত সূর্যগ্রহণের নামাজ পড়লেন কিন্তু উভয় রাকাআতে আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে (কেরাতের) কোনো আওয়াজ শুনিনি।’ (সুনানে আবু দাউদ, নাসাঈ, তিরমিজি, সুনানে ইবনে মাজাহ)

সূর্যগ্রহণ শেষ হওয়া পর্যন্ত এ নামাজ পড়া সুন্নাত। তবে সূর্যগ্রহণ শেষ হওয়ার আগে নামাজ শেষ করলেও কোনো সমস্যা নেই। তবে সূর্যগ্রহণ চলাকালীন বাকি সময়টুকুতে জিকির, দোয়া, তাওবা-ইসতেগফার, দান-সাদাকার মাধ্যমে কাটানো উত্তম।

আর চন্দ্রগ্রহণের সময় পৃথক পৃথকভাবে দুই রাকাত নামাজ পড়া উচিত। জামাতের সহিত আদায় করবে না। তারপর আল্লাহর কাছে দোয়া করবে।

আইও/