
|
মাদরাসায় কি এলিটরা আসবে?
প্রকাশ:
৩১ আগস্ট, ২০২৬, ১২:০৪ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
ইমরান হোসাইন নাঈম কয়েক বছর আগের কথা। ২০১৮/১৯ সালে নানুপুর মাদরাসায় গিয়েছিলাম। আমার এক ওস্তাদের সফরসঙ্গী হয়ে। এক রাত ছিলাম। একজন দায়িত্বশীল শিক্ষক পুরো মাদরাসাটা ঘুরিয়ে দেখালেন। পরিবেশ ও পড়াশোনা নিয়ে বিস্তারিত জানালেন। সবই ঠিক ছিল। তবে হিফজখানার (বা ছোট ছাত্রদের) একটা বিষয় আমার তখন খারাপ লেগেছিল। সেখানে কয়েকটা স্তর দেখলাম। দরিদ্র পরিবারের বাচ্চাদের জন্য খুবই সাধারণ ব্যবস্থা। আরেকটু সামর্থ্যবানদের জন্য আরেক ব্যবস্থা। আর এলিট পরিবারের বাচ্চাদের জন্য আলাদা ও উন্নত ব্যবস্থা। তাদের থাকার জন্য খাটসহ বেশ কিছু বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ছিল। বিষয়টি তখন আমার কাছে বৈষম্য মনে হয়েছিল। কিন্তু পরে বিষয়টা অন্যভাবে ভাবলাম। আমরা যদি সত্যিই এলিট শ্রেণির সন্তানদের মাদরাসায় আনতে চাই, তাহলে তাদের জন্য এমন পরিবেশ তৈরি করতেই হবে, যেখানে তারা মানিয়ে নিতে পারে। যে ছেলে ছোটবেলা থেকে এসিতে থেকেছে। ভালো পরিবেশে বড় হয়েছে। ভালো খেয়েছে। তাকে হঠাৎ মাদরাসায় এনে ডাল আর আলুভর্ত দিলে সে অসুস্থ হয়ে যাবে। একেবারে ভিন্ন জীবনযাপনে এলে মানিয়ে নিতে পারবে না। এবং পরে সে আর থাকবেও না। আরেকটা বাস্তবতা হলো— এলিট পরিবারের অভিভাবকেরা সাধারণত তাদের সন্তানকে যেকোনো পরিবেশে মিশতে দেন না। তারা এমন স্কুল খোঁজেন যেখানে তাদের মতো পরিবারের সন্তানরা পড়ে। কারণ শিশুর রুচি, চিন্তা, ভাষা ও মানসিকতার ওপর তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশের বড় প্রভাব আছে। এলিট শ্রেণির বাচ্চাদের চিন্তাচেতনা যেমন উন্নত হবে, সাধারণ পরিবারের বাচ্চাদের চিন্তাভাবনা ও মানসিকতা তেমনটা হবে না। এই কথা শুনেই কেউ এটিকে শ্রেণি-বৈষম্য ও শ্রেণি-ঘৃণায় টেনে নিতে পারে। তবে শ্রেণিগত পার্থক্যই দুনিয়ার বাস্তবতা। এই পার্থক্য না থাকলে, দুনিয়া চলবে না। আমলা ও কামলা, দুটিই লাগবে। যাইহোক, আমরা যদি এলিট শ্রেণির সন্তানদের আলেম বানাতে চাই, তবে তাদের জন্য সেই ব্যবস্থাপনাও করতে হবে। অন্যথায় তারা মাদরাসায় সন্তানকে দেবে না। আপনি যদি চান আলেমরা শুধু মসজিদ-মাদরাসায় সীমাবদ্ধ না থেকে রাষ্ট্র, প্রশাসন, অর্থনীতি, ব্যবসা ও সমাজের উচ্চপর্যায়েও নেতৃত্ব দিক, তাহলে উচ্চবিত্ত ও প্রভাবশালী পরিবারগুলোর সন্তানদেরও আলেম বানাতে হবে। একজন সাধারণ পরিবারের ছেলে একজন এমপির সঙ্গে হাত মেলালেই অভিভূত হয়ে যাবে। অন্যদিকে একজন এলিট পরিবারের সন্তান ছোটবেলা থেকেই এমপি-মন্ত্রী, বড় ব্যবসায়ী কিংবা বড় আলেমদের সঙ্গে ওঠাবসা দেখে বড় হয়েছে। ফলে তার কাছে এগুলো স্বাভাবিক। এই সামাজিক আত্মবিশ্বাস ও অভিজ্ঞতাও ভবিষ্যতের নেতৃত্বে কাজে লাগে। বড় পরিবারের সন্তানরা ছোটোবেলা থেকেই বিশাল এক্সেস পেয়ে যায়। যা অন্যদের পেতে হলে জীবনে ‘বড় কিছু’ আগে করে দেখাতে হয়। আর বড় কিছু করে দেখানো সবার জন্য সম্ভবও নয়। মোটকথা, সমাজের সব স্তর থেকেই আলেম তৈরি করতে হবে। আমরা যদি চাই যে, আলেমরা রাষ্ট্রের বিভিন্ন শাখায় নেতৃত্ব দিক, তাহলে এলিট শ্রেণির সন্তানদের মাদরাসায় আনার বিষয়টাও আমাদের গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। লেখক: আলেম লেখক, চিন্তক ও বিশ্লেষক আরএইচ/ |