
|
দুঃখের বছর ও তায়েফের অশ্রু
প্রকাশ:
৩১ আগস্ট, ২০২৬, ০৬:১৩ বিকাল
নিউজ ডেস্ক |
আজ আর মাগরিবের পর গল্পের আসর বসলো না। মসজিদে তাবলীগ এসেছে। দাদা মাগরিবের পর তাদের আলোচনা শুনে বাসায় ফিরবেন। নাতি-নাতনীদের বলে গেছেন এশার পরে বসার কথা। তারা সেভাবেই বসে আছে। দাদার জন্য অপেক্ষা করছে। কিছুক্ষণ পর দাদা আসলেন। মুচকি হেসে বললেন, আজ আমি তোমাদের এমন একটি ঘটনা শোনাব, যেখানে আছে অনেক কষ্ট, অনেক চোখের পানি। কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে ধৈর্য, ক্ষমা আর আল্লাহর ওপর অটল ভরসার শিক্ষা। নাতি-নাতনিরা দাদার কাছে সরে এলো। আসরজুড়ে নীরবতা। দাদা ধীরে ধীরে গল্প শুরু করলেন। ইসলামের আলো তখন ধীরে ধীরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক মানুষ সত্যকে চিনতে শুরু করেছে। কিন্তু জানো, আলো যত ছড়ায়, অন্ধকারও তত তাকে নিভিয়ে দিতে চায়। মক্কার কুরাইশ নেতারাও ঠিক তাই করছিল। তারা দিন দিন নবীজি এবং মুসলমানদের ওপর অত্যাচার বাড়িয়ে দিচ্ছিল। এর মধ্যেই নবীজির জীবনে নেমে এল একের পর এক বড় দুঃখ। প্রথমে ইন্তেকাল করলেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় মানুষদের একজন— তাঁর স্ত্রী, উম্মুল মুমিনীন খাদিজা (রা.)। তিনি শুধু স্ত্রীই ছিলেন না, ছিলেন নবীজির সবচেয়ে বড় সাহস। যখন সবাই বিরোধিতা করেছিল, তখন তিনিই বলেছিলেন, 'আল্লাহ কখনো আপনাকে অপমান করবেন না।' ভাবো তো, এমন একজন মানুষকে হারালে কেমন লাগে? নাতনিদের একজন আস্তে করে বলল, খুব কষ্ট লাগে দাদু! দাদা মাথা নাড়লেন। বললেন, 'হ্যাঁ, অনেক কষ্ট। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। কিছুদিন পরই ইন্তেকাল করলেন তাঁর চাচা আবু তালিব। যদিও তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি, তবুও তিনি নিজে প্রাণপণ চেষ্টা করে নবীজিকে শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করতেন। তাঁর মৃত্যুর পর কুরাইশ নেতারা যেন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠল। দাদা একটু থেমে বললেন, এই কারণেই ইতিহাসে সেই বছরটির নাম হয়েছে দুঃখের বছর— আরবিতে বলে আমুল হুযন।' একটু নীরবতার পর দাদা আবার বললেন, বলো তো, আল্লাহর নবীরা কি দুঃখ পেয়ে বসে থাকেন? সবাই একসঙ্গে বলল, না! দাদা বললেন, ঠিক তাই। নবীজি ভাবলেন, যদি মক্কার মানুষ সত্য না শোনে, তাহলে অন্য শহরের মানুষের কাছে যাবেন। তিনি একদিন রওনা হলেন তায়েফ শহরের উদ্দেশে। তোমরা জানো, তখন কোনো গাড়ি ছিল না। তিনি দীর্ঘ পথ হেঁটে তায়েফে পৌঁছালেন। তাঁর মনে আশা ছিল— হয়তো এখানকার মানুষ আল্লাহর কথা শুনবে। কিন্তু কী হলো জানো? নাতি-নাতনিরা কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে রইল। দাদা বললেন, তায়েফের নেতারাও তাঁর কথা শুনতেই চাইল না। বরং তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করল। তারপর শহরের দুষ্টু ছেলেদের ডেকে বলল, "ওকে শহর থেকে বের করে দাও!"' নাতিনাতনিরা বলল, তারপর? দাদা বললেন, তারপর শুরু হলো ভয়ংকর ঘটনা। ছোট ছোট ছেলেরা চারদিক থেকে পাথর ছুড়তে লাগল। একটার পর একটা পাথর এসে নবীজির শরীরে আঘাত করছিল। তাঁর পবিত্র পা রক্তে ভিজে গেল। জুতা রক্তে ভরে গেল। কিন্তু তিনি কাউকে অভিশাপ দিলেন না। দাদার কণ্ঠ ভারী হয়ে এল। অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি বললেন, শেষ পর্যন্ত তিনি শহরের বাইরে একটি নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিলেন। সেখানে বসে তিনি আল্লাহর কাছে এমন এক দোয়া করলেন, যা শুনলে আজও মানুষের চোখে পানি চলে আসে। তিনি বললেন— "হে আল্লাহ! যদি তুমি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট না হও, তবে আমার কোনো কষ্টেরই পরোয়া নেই।" দাদা বললেন, দেখো দাদু ভাইয়েরা, কী অসাধারণ কথা! নিজের কষ্টের কথা বললেন, কিন্তু মানুষের বিরুদ্ধে কোনো বদদোয়া করলেন না। এরপর ঘটল আরেকটি বিস্ময়কর ঘটনা। ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) এসে বললেন, 'আপনি চাইলে পাহাড়ের ফেরেশতা এই শহরের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দিতে প্রস্তুত। নাতিরা অবাক হয়ে বলল, তাহলে কি নবীজি রাজি হয়েছিলেন? দাদা মৃদু হেসে বললেন, না। তিনি তো ছিলেন রহমতের নবী। তিনি বললেন, "না। আমি আশা করি, তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন মানুষ আসবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে।" দাদু ভাইয়েরা ভাবতে পারো? যারা তাঁকে রক্তাক্ত করল, তাদের জন্যও তিনি ধ্বংস নয়, হিদায়াত চাইলেন! দাদা আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, আর জানো, পরে সত্যিই তায়েফের অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিল। নবীজির আশা বৃথা যায়নি। গল্প শেষ করে দাদা নাতি-নাতনিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, আজকের গল্প থেকে আমরা কী শিখলাম?' একজন বলল, কষ্ট এলেও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে। আরেকজন বলল, কেউ কষ্ট দিলেও প্রতিশোধ না নিয়ে ক্ষমা করা উচিত। দাদা হাসলেন। বললেন, একদম ঠিক। জীবনে কখনো কখনো অনেক দুঃখ আসবে। প্রিয় মানুষকে হারাতে হবে, কেউ অপমানও করতে পারে। কিন্তু একজন মুমিন জানে— আল্লাহ সব দেখছেন। তাই ধৈর্য, ক্ষমা আর আল্লাহর ওপর ভরসা কখনো ছেড়ে দেওয়া যাবে না। আর এই দুঃখের পরেই আল্লাহ তাঁর প্রিয়নবীকে এমন এক আশ্চর্য সম্মান দান করেছিলেন, যার কথা শুনে তোমরা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যাবে। ইনশাআল্লাহ, আগামীকালের গল্পে আমরা সেটি শুনব। গল্পে গল্পে প্রিয় নবীজি (পর্ব: ১৪) লেখক: আকিদুল ইসলাম সাদী চলবে....
আইও/ |