উহুদের যুদ্ধ— ভুলের শিক্ষা ও ধৈর্যের পরীক্ষা
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:৫৪ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

নাতি-নাতনিরা অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে আছে। তারা আজ জানবে বদর যুদ্ধের পর কী হয়েছিল। দাদা গল্পের আসরে উপস্থিত হওয়ার সাথে সাথেই একজন নাতি জিজ্ঞেস করল, দাদু, বদরের যুদ্ধে তো মুসলমানরা জয়ী হয়েছিল। তারপর কী হলো?"

দাদা মৃদু হেসে বললেন, হ্যাঁ দাদুভাই, বদরের বিজয় ইসলামের জন্য ছিল এক বিশাল আনন্দের খবর। কিন্তু মনে রেখো, জীবনে শুধু বিজয়ই আসে না। কখনো কখনো আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের পরীক্ষা করেন, যাতে তারা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আজ আমি তোমাদের সেই পরীক্ষার গল্প শোনাব— "উহুদ যুদ্ধের গল্প।"

বদরের যুদ্ধে কুরাইশদের অনেক বড় বড় নেতা নিহত হয়েছিল। সেই পরাজয় তারা কোনোভাবেই ভুলতে পারেনি। মক্কার প্রতিটি ঘরে যেন প্রতিশোধের আগুন জ্বলছিল। এক বছর ধরে তারা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিল। এবার তারা আগের চেয়ে অনেক বড় বাহিনী গড়ে তুলল। প্রায় তিন হাজার সৈন্য, অসংখ্য ঘোড়া, উট আর অস্ত্র নিয়ে তারা মদিনার দিকে রওনা হলো। এসে উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে বিশাল শিবির গাড়ল।

দাদু একটু থেমে বললেন, ভাবো তো, দূর থেকে হাজার হাজার সৈন্য এগিয়ে আসছে। মরুভূমির বুকে ধুলোর ঝড় উঠছে। এমন দৃশ্য দেখলে কার না ভয় লাগবে?

রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। সিদ্ধান্ত হলো, উহুদ পাহাড়ের কাছেই যুদ্ধ হবে। মুসলমান ছিলেন মাত্র সাতশ জন।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পাহাড়ের একটা ছোট গিরিপথে পঞ্চাশজন দক্ষ তীরন্দাজকে দাঁড় করালেন। তাঁদের নেতা ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন জুবাইর (রা.)।  তিনি তাদেরকে এমন একটি নির্দেশ দিলেন, যা পুরো যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

তিনি বললেন, "আমরা জয়ী হই কিংবা পরাজিত হই, কোনো অবস্থাতেই তোমরা এই স্থান ছেড়ে যাবে না।"

দাদু নাতিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, দেখো, একজন ভালো নেতার কথা কখনো অমান্য করা উচিত নয়। এই কথাটাই আজকের গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

যুদ্ধ শুরু হলো। সাহাবিরা এমন সাহসের সঙ্গে লড়াই করলেন যে, অল্প সময়ের মধ্যেই কুরাইশ বাহিনী পিছিয়ে যেতে লাগল। মনে হচ্ছিল, আর একটু পরেই আবার মুসলমানদের বিজয় হবে।

শত্রুরা পালিয়ে যাচ্ছে, যুদ্ধের ময়দানে তাদের অনেক সম্পদ পড়ে রয়েছে। সবকিছু যেন আনন্দের খবর দিচ্ছিল।কিন্তু একটি ভুল, বদলে দিল সবকিছু।

পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা অধিকাংশ তীরন্দাজ ভাবলেন, "যুদ্ধ তো শেষ। এখন নিচে গিয়ে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সংগ্রহ করি।" তাঁদের নেতা আবদুল্লাহ ইবন জুবাইর (রা.) বারবার বললেন, "না! রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের এখানে থাকতে বলেছেন। সুতরাং এ স্থান ত্যাগ করা যাবে না।" তবে অনেকেই মনে করলেন আর কোনো বিপদ নেই। তাঁরা পাহাড় ছেড়ে নিচে নেমে গেলেন।

দাদু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, দাদুভাই, কখনো কখনো ছোট্ট একটি ভুলের মূল্য অনেক বড় হয়। খালি গিরিপথ দিয়ে এলো আক্রমণ।

সেই সময় কুরাইশদের অশ্বারোহী বাহিনীর নেতা ছিলেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ। তখনও তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি। দূর থেকেই তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে, পাহাড়ের গিরিপথ প্রায় ফাঁকা হয়ে গেছে। এই সুযোগ তিনি হাতছাড়া করলেন না। দ্রুত ঘোড়সওয়ার বাহিনী নিয়ে তিনি পিছনের সেই পথ দিয়ে মুসলমানদের ওপর আকস্মিক আক্রমণ চালালেন।

মুহূর্তের মধ্যেই যুদ্ধের দৃশ্য পাল্টে গেল। যেখানে একটু আগেও মুসলমানরা জয়ী হচ্ছিলেন, সেখানে এখন চারদিক থেকে আক্রমণের মুখে পড়লেন। রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আহত হলেন। তাঁর মুখমণ্ডল রক্তাক্ত হয়ে গেল। একটি দাঁত ভেঙে গেল। তিনি একটি গর্তে পড়ে গেলেন। শত্রুরা তখন গুজব ছড়িয়ে দিল, "মুহাম্মদ মারা গেছেন!"

এই খবর শুনে অনেক সাহাবি গভীর শোকে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁরা জানতে পারলেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবিত আছেন। তখন সাহাবিরা আবার তাঁকে ঘিরে ঢাল হয়ে দাঁড়ালেন এবং প্রাণপণ যুদ্ধ করতে লাগলেন।

এই যুদ্ধে শহীদ হলেন ইসলামের এক মহান বীর— রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রিয় চাচা হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রা.)। তাঁর শাহাদাতে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অত্যন্ত কষ্ট পেয়েছিলেন। এই যুদ্ধে মোট সত্তরজন সাহাবি শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেন।

দাদু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীর কণ্ঠে বললেন, আল্লাহর পথে যারা জীবন দেন, তারা কখনো হারিয়ে যান না। তাঁদের নাম ইতিহাসের পাতায় চিরদিন উজ্জ্বল হয়ে থাকে।

উহুদের যুদ্ধ শুধুমাত্র একটি যুদ্ধ নয়। এটি ছিল আনুগত্য, শৃঙ্খলা ও ধৈর্যের শিক্ষা। আল্লাহ দেখিয়ে দিলেন, বিজয়ের কাছাকাছি পৌঁছেও যদি মানুষ অসতর্ক হয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নির্দেশ অমান্য করে, তাহলে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়।

আল্লাহ তাআলা পরবর্তীতে কুরআনের আয়াত নাজিল করে মুমিনদের ধৈর্য ধরতে, ভুল থেকে শিক্ষা নিতে এবং আবার দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করেন।

দাদু গল্প শেষ করে বললেন, দাদুভাইয়েরা, মানুষ ভুল করতেই পারে। কিন্তু প্রকৃত মুমিন সেই, যে নিজের ভুল বুঝে আল্লাহর কাছে ফিরে আসে এবং পরেরবার সেই ভুল আর না করার চেষ্টা করে। উহুদের যুদ্ধ আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়।

এখানে শিক্ষণীয় বিষয় হলো- আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নির্দেশ সব অবস্থায় মেনে চলতে হবে। ছোট একটি ভুলও বড় বিপদের কারণ হতে পারে। বিজয়ের সময়ও অহংকার বা অসতর্কতা করা যাবে না। তাছাড়া কঠিন পরীক্ষার মধ্যেও ধৈর্য ও ঈমান অটুট রাখতে হবে।

এবং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার সত্যের পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাওয়াই একজন মুমিনের পরিচয়।

দাদা গল্প শেষ করলেন। নাতি-নাতনিরা আরেকটি গল্পের জন্য আবদার করলো। দাদা বললেন, আজ আর না। আগামীকাল আবার গল্প হবে, ইনশাআল্লাহ।

 

গল্পে গল্পে প্রিয় নবীজি (পর্ব: ২০)

লেখক: আকিদুল ইসলাম সাদী

চলবে....

 

আইও/