
|
খতিব মাওলানা উবায়দুল হক রহ.কে হারানোর ১৯ বছর
প্রকাশ:
০৬ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:১৬ বিকাল
নিউজ ডেস্ক |
নিজস্ব প্রতিবেদক বাংলাদেশের ইসলামি অঙ্গনের বিশিষ্ট আলেম, শিক্ষাবিদ, লেখক ও জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দীর্ঘদিনের সাবেক খতিব মাওলানা উবায়দুল হক জালালাবাদীর ১৯তম ওফাতবার্ষিকী আজ। ২০০৭ সালের ৬ অক্টোবর, ২৩ রমজান ১৪২৮ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন তিনি। ইলম, শিক্ষকতা, খতিবের দায়িত্ব, ইসলামি গবেষণা, লেখালেখি ও ধর্মীয় নেতৃত্ব—বহুমাত্রিক কর্মজীবনে তিনি দেশের ইসলামি অঙ্গনে বিশেষ প্রভাব রেখে গেছেন। সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার বারোঠাকুরিতে ১৯২৮ সালের ২ মে জন্মগ্রহণ করেন মাওলানা উবায়দুল হক। তাঁর পিতা জহুরুল হক উরফে উরকিজ আলী ছিলেন দারুল উলুম দেওবন্দের শিক্ষার্থী ও আল্লামা আশরাফ আলী থানভী রহ.-এর খলিফা। শৈশবে নিজ গ্রাম ও স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দে যান। সেখানে তিনি হুসাইন আহমদ মাদানী, ইব্রাহিম বালিয়াভী, ইজাজ আলী আমরুহী, কারী মুহাম্মদ তৈয়বসহ উপমহাদেশের খ্যাতিমান আলেমদের কাছে শিক্ষা লাভ করেন। দারুল উলুম দেওবন্দে দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষায় তিনি অসাধারণ ফলাফল অর্জন করেন। শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৪৯ সালে ঢাকার বড় কাটরা জামিয়া হোসাইনিয়া আশরাফুল উলুমে শিক্ষকতার মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে শাহজাহানপুরের একটি মাদরাসা ও দারুল উলুম করাচিতে শিক্ষকতা করেন। এ সময় তিনি কিছুদিন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। পরে তিনি সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া, ঢাকায় যোগ দেন। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তিনি প্রতিষ্ঠানটির হেড মাওলানার দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে ১৯৮৪ সালে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আমৃত্যু তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন। ঢাকা আলিয়া থেকে অবসর নেওয়ার পরও তাঁর শিক্ষকতা থেমে থাকেনি। তিনি মাদরাসায়ে ইসলামিয়া ইসলামপুরের মুহতামিম এবং মাদরাসায়ে ফয়জুল উলুম আজিমপুরের শায়খুল হাদিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে আল জামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়া এবং জামিয়া কাসিমুল উলুম দরগাহে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এ শায়খুল হাদিসের দায়িত্বও পালন করেন। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে উপমহাদেশের খ্যাতিমান আলেমদের অনেকে ছিলেন। মাওলানা উবায়দুল হক শুধু শিক্ষকতা ও খতিবের দায়িত্বেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। বাংলাদেশে ইসলামি গবেষণা ও ধর্মীয় ঐক্যের ক্ষেত্রেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তাঁর চিন্তাধারায় গড়ে ওঠা ইসলামি গবেষণা পরিষদের কর্মকাণ্ড পরবর্তীকালে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের বিকাশে প্রভাব রাখে। দেশে ইসলামি ব্যাংকিং ও বীমাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ইসলামী ব্যাংকের শরিয়া কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এবং বিভিন্ন ইসলামি ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত সম্মিলিত শরিয়া কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। পাশাপাশি জাতীয় শরিয়া কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়ত বাংলাদেশের সভাপতি হিসেবেও তিনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। ইসলাম ও শরিয়তবিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তিনি প্রকাশ্যে অবস্থান নিতেন। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় তাঁর বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড তৎকালীন সময়ে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। মাওলানা উবায়দুল হক জালালাবাদী ছিলেন একজন লেখক ও অনুবাদকও। তাঁর জন্মভূমি সিলেটের প্রাচীন নাম জালালাবাদ থেকে তিনি নিজের নামের সঙ্গে ‘জালালাবাদী’ যুক্ত করেন। বাংলা, উর্দু ও আরবি ভাষায় তাঁর বিভিন্ন রচনা রয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘তারিখে ইসলাম’, ‘সীরাতে মোস্তফা’, ‘আস সেকায়া শরহু শারহিল বেকায়া’, ‘নাশরুল ফাওয়াইদ খোলাসায়ে শারহিল আকাইদ’, ‘আজহারুল আজহার’, ‘তাহসিলুল কাফিয়া’ এবং ‘শিয়া সুন্নি ইখতেলাফ’। এ ছাড়া রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্র থেকে প্রচারিত ‘কুরআনে হাকিম আওর হামারি জিন্দেগি’ শীর্ষক ধারাবাহিক কথিকার সংকলনও তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ। ‘তারিখে ইসলাম’ গ্রন্থটি দুই খণ্ডে রচিত। ইসলামপূর্ব আরবের ইতিহাস থেকে শুরু করে ইসলামের আবির্ভাব ও পরবর্তী মুসলিম শাসনের দীর্ঘ ইতিহাস এতে স্থান পেয়েছে। তাঁর ‘সীরাতে মোস্তফা’ গ্রন্থেও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনচরিতের পাশাপাশি সিরাত পাঠের উদ্দেশ্য ও ইসলামের মৌলিক বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। ইলমি ও ধর্মীয় খেদমতের স্বীকৃতি হিসেবে জীবদ্দশায় বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পান মাওলানা উবায়দুল হক। আরবি বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় তিনি একাধিকবার প্রথম স্থান অর্জন করেন। সৌদি আরবের মজলিশে শুরা থেকে স্বর্ণপদক লাভ করেন। ২০০৪ সালে জাতীয় সিরাত কমিটি বাংলাদেশ তাঁকে বছরের সেরা ইসলামি ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বর্ণপদক প্রদান করে। ২০০৫ সালে কুরআন ও হাদিসের শিক্ষকতায় বিশেষ অবদানের জন্য কুরআন শিক্ষা সোসাইটি তাঁকে সম্মাননা দেয়। ২০০৭ সালের ৬ অক্টোবর রমজান মাসে ইন্তেকাল করেন মাওলানা উবায়দুল হক জালালাবাদী। জাতীয় ঈদগাহে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ, আলেম-উলামা, রাজনৈতিক নেতা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। পরে তাঁকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। এসএইচ/ |