মসজিদে মোবাইল ফোন ব্যবহারের শরয়ি বিধান
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:০১ বিকাল
নিউজ ডেস্ক

আওয়ার ইসলাম ডেস্ক 

মসজিদ আল্লাহ তাআলার ঘর। এটি ইবাদত, জিকির, তিলাওয়াত ও দ্বীনি আমলের জন্য নির্ধারিত পবিত্র স্থান। তাই মসজিদে অবস্থানকালে এর আদব ও মর্যাদা রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোন দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠলেও মসজিদে এর ব্যবহার হতে হবে প্রয়োজনের সীমায়, শালীনতার সঙ্গে এবং অন্য মুসল্লিদের ইবাদতের প্রতি পূর্ণ খেয়াল রেখে।

প্রয়োজনীয় কাজে মোবাইল ব্যবহার

মসজিদে একান্ত প্রয়োজনীয় ও বৈধ কাজে মোবাইল ফোন ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে অপ্রয়োজনীয়ভাবে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকা, খেলাধুলা করা, দুনিয়াবি আলাপচারিতায় মগ্ন থাকা কিংবা এমন কোনো কাজে সময় কাটানো, যা মসজিদের আদবের পরিপন্থী, তা থেকে বিরত থাকা উচিত। বিশেষত এসব কাজের কারণে অন্য মুসল্লির ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটলে তা আরও গুরুতর বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

‎فِي بُيُوتٍ أَذِنَ اللَّهُ أَنْ تُرْفَعَ وَيُذْكَرَ فِيهَا اسْمُهُ

‘সেসব ঘরে, যেগুলোকে সমুন্নত রাখতে এবং সেগুলোতে তাঁর নাম স্মরণ করতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন।’ (সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩৬)

মোবাইলের রিংটোন ও নোটিফিকেশন

মসজিদে প্রবেশের আগে মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেওয়া কিংবা অন্তত সাইলেন্ট মোডে রাখা উচিত, যাতে নামাজ, তিলাওয়াত ও জিকিরে বিঘ্ন না ঘটে। বিশেষ করে জামাত চলাকালে মোবাইল বেজে উঠলে মুসল্লিদের মনোযোগ নষ্ট হতে পারে। তাই এ বিষয়ে আগে থেকেই সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

মোবাইলের রিংটোনে গান-বাজনা বা শরিয়তবিরোধী কোনো বিষয় রাখা থেকেও বিরত থাকতে হবে। অসতর্কতার কারণে মসজিদে রিংটোন বেজে উঠলে দ্রুত তা বন্ধ করতে হবে এবং ভবিষ্যতে যেন এমন পরিস্থিতি না ঘটে, সে ব্যবস্থা নিতে হবে।

মসজিদে ফোন এলে করণীয়

মসজিদে অবস্থানকালে জরুরি ফোন এলে সম্ভব হলে মসজিদের বাইরে গিয়ে কথা বলা উচিত। বাইরে যাওয়া সম্ভব না হলে এমন স্থানে গিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে ও নিচু স্বরে কথা বলা যেতে পারে, যাতে অন্য মুসল্লিদের ইবাদতে বিঘ্ন না ঘটে। তবে মুসল্লিদের মাঝে বসে দীর্ঘ সময় ফোনে কথা বলা কিংবা উচ্চস্বরে আলাপ করা মসজিদের আদবের পরিপন্থী।

বিশেষত নামাজের জামাত চলাকালে কিংবা কেউ ইবাদতে মগ্ন থাকলে এ বিষয়ে আরও বেশি সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ নিজের প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি অন্যের ইবাদতের পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখাও একজন মুসলমানের দায়িত্ব।

মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার

মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমে একান্ত প্রয়োজনীয় বার্তা আদান-প্রদানের সুযোগ থাকলেও মসজিদে অপ্রয়োজনীয় মেসেজিংয়ে ব্যস্ত থাকা উচিত নয়। এসব মাধ্যমে অনৈতিক, অশালীন বা শরিয়তবিরোধী বিষয় দেখা ও আদান-প্রদান করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

মসজিদে অবস্থানকালে মোবাইলের পর্দায় বারবার চোখ রাখা কিংবা বার্তার উত্তর দিতে গিয়ে ইবাদত থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া একজন মুসল্লির জন্য অনুচিত। তাই প্রয়োজন ছাড়া এসব অ্যাপ ব্যবহার না করাই উত্তম।

ফেসবুক, ইউটিউব ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম

মসজিদে বসে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপ্রয়োজনীয়ভাবে সময় কাটানো মসজিদের আদবের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এসব প্ল্যাটফর্মে অশালীন দৃশ্য, অনৈতিক কনটেন্ট কিংবা শরিয়তবিরোধী বিষয় দেখলে তা স্বতন্ত্র গুনাহের কারণ হতে পারে। তবে কোনো মাধ্যমের নামের কারণে সব ধরনের ব্যবহারকে একই হুকুমে ফেলা ঠিক নয়; বরং কী দেখা হচ্ছে, কী উদ্দেশ্যে দেখা হচ্ছে এবং তাতে অন্যের ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটছে কি না, তা বিবেচ্য।

মোবাইলের ওয়ালপেপার ও পর্দায় প্রদর্শিত ছবির ক্ষেত্রেও শরিয়তের বিধান বিবেচনা করা প্রয়োজন। জীবন্ত প্রাণীর ছবি সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের বিষয়ে ফিকহি বিধান রয়েছে। তাই এ ধরনের ছবি ব্যবহার থেকে বিরত থাকা এবং মোবাইলের পর্দায় অনাকাঙ্ক্ষিত ছবি প্রকাশ পেতে পারে—এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা উচিত।

মসজিদে দুনিয়াবি কথাবার্তা

মসজিদ মূলত ইবাদত ও আল্লাহর স্মরণের স্থান। তাই সেখানে অপ্রয়োজনীয় দুনিয়াবি কথাবার্তা ও অনর্থক কাজে ব্যস্ত থাকা থেকে বিরত থাকা উচিত। তবে প্রয়োজনীয় ও বৈধ কথাবার্তাকে সব অবস্থায় হারাম বলা সঠিক নয়; কথার বিষয়বস্তু, প্রয়োজন এবং তা থেকে কোনো মুসল্লির কষ্ট বা ইবাদতে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে কি না, তা বিবেচনা করতে হবে।

আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যাহ গ্রন্থে মসজিদে দুনিয়াবি কথাবার্তা বলার বিষয়ে একাধিক ফিকহি বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে এ ধরনের কথাবার্তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। (আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যাহ, ৫/৩২১)

মসজিদে মোবাইল ব্যবহারের মূলনীতি

মসজিদে মোবাইল ফোন সঙ্গে রাখা বা একান্ত প্রয়োজনীয় বৈধ কাজে ব্যবহার করাই নিজে নিজে গুনাহ নয়। তবে মোবাইল ব্যবহারের কারণে মসজিদের আদব নষ্ট করা, অন্য মুসল্লিদের কষ্ট দেওয়া, নামাজে বিঘ্ন সৃষ্টি করা কিংবা অনৈতিক কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।

একজন সচেতন মুসলমানের উচিত মসজিদে প্রবেশের আগেই মোবাইল সাইলেন্ট করা, প্রয়োজন ছাড়া তা ব্যবহার না করা এবং অবসর সময়টুকু নামাজ, তিলাওয়াত, জিকির ও দোয়ায় ব্যয় করা। এতে মসজিদের পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি নিজের ইবাদতের পরিবেশও সুন্দর থাকবে।

এসএইচ/