বাচ্চাদের দুষ্টুমি কমাতে কোরআন-হাদিসের আমল ও করণীয়
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:৫০ বিকাল
নিউজ ডেস্ক

আওয়ার ইসলাম ডেস্ক 

শিশুরা স্বভাবতই চঞ্চল। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করতে শেখে। কিন্তু অনেক সময় অতিরিক্ত জেদ, রাগ, অন্যকে আঘাত করা কিংবা জিনিসপত্র ভাঙচুর করার মতো আচরণ মা-বাবার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ অবস্থায় সন্তানের সুন্দর চরিত্র ও শান্ত স্বভাবের জন্য দোয়া করার পাশাপাশি তার আচরণের কারণ বোঝা এবং ধৈর্যসহকারে সঠিক শিক্ষা দেওয়া জরুরি।

ইসলামে সন্তানকে আল্লাহর নেয়ামত ও আমানত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তাই সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ গঠনে দোয়া, স্নেহ, উত্তম শিক্ষা এবং দায়িত্বশীল অভিভাবকত্বের সমন্বয় প্রয়োজন।

সন্তানের জন্য যেসব দোয়া ও আমল করা যায়

১. শিশুর সুরক্ষায় নবীজি (সা.)-এর শেখানো দোয়া

রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর নাতি হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর জন্য আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি তাঁদের জন্য এই দোয়া পড়তেন, 

أُعِيذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ، مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ

উচ্চারণ: উঈযুকুমা বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাহ, মিন কুল্লি শাইতানিন ওয়া হাম্মাহ, ওয়া মিন কুল্লি আইনিন লাম্মাহ।

অর্থ: আমি তোমাদের দুজনকে আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীসমূহের আশ্রয়ে দিচ্ছি, প্রত্যেক শয়তান, ক্ষতিকর প্রাণী এবং প্রত্যেক অনিষ্টকারী দৃষ্টি থেকে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩৭১) 

একটি সন্তানের জন্য দোয়াটি পড়তে চাইলে ‘উঈযুকুমা’ শব্দের পরিবর্তে ‘উঈযুকা’ (ছেলে শিশুর ক্ষেত্রে) অথবা ‘উঈযুকি’ (মেয়ে শিশুর ক্ষেত্রে) বলা যায়। আরবি উচ্চারণ ও প্রয়োগে ভুল এড়াতে নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছ থেকে শিখে নেওয়া ভালো।

২. কোরআনের সুরা ও আয়াত পড়ে দোয়া করা

শিশুর কল্যাণ ও সুরক্ষার জন্য সুরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি এবং সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস তিলাওয়াত করে আল্লাহর কাছে দোয়া করা যায়। রুকইয়ার অংশ হিসেবে কোরআন তিলাওয়াত করে ফুঁ দেওয়াও শরিয়তসম্মত, যদি তাতে শিরক বা শরিয়তবিরোধী কোনো বিষয় না থাকে।

তবে কোনো নির্দিষ্ট সুরা বা আয়াত নির্দিষ্ট সংখ্যায় পড়লে শিশুর জেদ ও রাগ অবশ্যই কমবে—এমন বিশেষ দাবি করতে হলে তার নির্ভরযোগ্য শরয়ি দলিল থাকা প্রয়োজন।

৩. নেক সন্তান লাভের কোরআনি দোয়া

সন্তানের সুন্দর চরিত্র, চোখের শীতলতা ও পারিবারিক প্রশান্তির জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করা উচিত। পবিত্র কোরআনে মুমিনদের একটি দোয়া এভাবে বর্ণিত হয়েছে, 

رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا

উচ্চারণ: রব্বানা হাব লানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ‘ইউনিওঁ ওয়াজ‘আলনা লিলমুত্তাকিনা ইমামা।

অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের পক্ষ থেকে আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ বানান। (সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৭৪) 

সন্তানের হেদায়াত, উত্তম চরিত্র ও কল্যাণের জন্য নিয়মিত এই দোয়া পড়া যেতে পারে।

৪. সন্তানকে নামাজি করার জন্য দোয়া

ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়ায় এসেছে, 

رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ

উচ্চারণ: রব্বিজ‘আলনি মুকিমাস সালাতি ওয়া মিন যুররিয়্যাতি, রব্বানা ওয়া তাকাব্বাল দু‘আ।

অর্থ: হে আমার প্রতিপালক! আমাকে নামাজ প্রতিষ্ঠাকারী বানান এবং আমার সন্তানদের মধ্য থেকেও। হে আমাদের প্রতিপালক! আমার দোয়া কবুল করুন। (সূরা ইবরাহিম, আয়াত: ৪০) 

সন্তানের দ্বিনি ও নৈতিক উন্নতির জন্য এ দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া যায়।
শিশুর রাগ ও দুষ্টুমি কমাতে মা-বাবার করণীয়

১. শিশুর প্রতি স্নেহশীল হোন

রাসূলুল্লাহ (সা.) শিশুদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 

مَنْ لَا يَرْحَمْ لَا يُرْحَمْ

‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৩) 

তাই শিশুর ভুল আচরণের কারণে তার প্রতি স্নেহ কমিয়ে দেওয়া উচিত নয়। তাকে সময় দিন, মনোযোগ দিয়ে কথা শুনুন, আদর করুন এবং ভালো আচরণ করলে প্রশংসা করুন।

২. রাগের সময় মারধর বা চিৎকার করবেন না

চার বছর বয়সী শিশু আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও নিজের চাওয়া প্রকাশ করার দক্ষতা শিখছে। এ বয়সে রাগের সময় সে চিৎকার করতে পারে, অন্যকে মারতে পারে কিংবা জিনিসপত্র ভাঙতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে মা-বাবা পাল্টা চিৎকার বা মারধর করলে সমস্যা আরও বাড়তে পারে।

শিশু অন্যকে আঘাত করতে এলে শান্তভাবে তার হাত আটকে দিন এবং দৃঢ় কণ্ঠে বলুন, ‘মারা যাবে না, এতে ব্যথা লাগে।’ ভাঙচুরের আশঙ্কা থাকলে বিপজ্জনক জিনিস সরিয়ে শিশুকে নিরাপদ স্থানে রাখুন। তাকে জোর করে চেপে ধরে রাখার পরিবর্তে প্রয়োজনমতো নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে শান্ত হতে সাহায্য করুন।

৩. শিশুকে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে শেখান

শিশু রেগে গেলে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন, ‘তুমি রাগ করেছ’, ‘তুমি খেলনাটা চাও’, কিংবা ‘কষ্ট পেলে আমাকে বলবে।’ এভাবে ধীরে ধীরে সে মারধর না করে কথা দিয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে শিখবে।

৪. মোবাইল ও টেলিভিশন ব্যবহারে সীমা নির্ধারণ করুন

অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুর ঘুম, খেলাধুলা ও পরিবারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সময় কমিয়ে দিতে পারে। তাই শিশুর বয়স অনুযায়ী স্ক্রিন ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করুন এবং মারামারি বা সহিংসতাপূর্ণ ভিডিও এড়িয়ে চলুন। গল্প বলা, ছবি আঁকা, খেলাধুলা ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ বাড়ান।

৫. ভালো আচরণের প্রশংসা করুন

শিশু রাগের সময় নিজেকে সামলাতে পারলে, অন্যের সঙ্গে খেলনা ভাগ করে নিলে কিংবা কাউকে না মেরে কথা দিয়ে নিজের চাওয়া প্রকাশ করলে তার প্রশংসা করুন। প্রয়োজনে ছোটখাটো পুরস্কার দেওয়া যেতে পারে। তবে পুরস্কারের পাশাপাশি ভালো আচরণের কারণটিও তাকে বুঝিয়ে বলুন।

৬. পরিবারের পরিবেশ শান্ত রাখুন

শিশুরা বড়দের আচরণ অনুকরণ করে। পরিবারের সদস্যরা যদি প্রায়ই চিৎকার করেন, রাগ দেখান বা একে অপরকে আঘাত করেন, তাহলে শিশু সেই আচরণ শিখতে পারে। তাই শিশুর সামনে ঝগড়া-বিবাদ ও আক্রমণাত্মক আচরণ এড়িয়ে চলা জরুরি।

কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন?

শিশু যদি নিয়মিত অন্যকে আঘাত করে, প্রচণ্ড রাগের সময় জিনিসপত্র ভাঙে, নিজের বা অন্যের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করে কিংবা তার আচরণ সামলানো পরিবারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ভাষা, ঘুম, সামাজিক যোগাযোগ বা বিকাশের অন্য কোনো দিক নিয়েও উদ্বেগ থাকলে তা চিকিৎসককে জানাতে হবে।

সারকথা: সন্তানের উত্তম চরিত্র ও শান্ত স্বভাবের জন্য কোরআন-হাদিসের দোয়া পড়ুন, আল্লাহর কাছে সাহায্য চান এবং শিশুর সঙ্গে ধৈর্য, স্নেহ ও ধারাবাহিকতার সঙ্গে আচরণ করুন। পাশাপাশি তার ঘুম, দৈনন্দিন রুটিন, স্ক্রিন ব্যবহার ও পারিবারিক পরিবেশের দিকে খেয়াল রাখুন। প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিন। দোয়া ও যথাযথ পরিচর্যা একসঙ্গে চললে শিশুর সুস্থ বিকাশে সহায়ক হতে পারে।

এসএইচ/