ইসলামী ব্যাংকগুলোতে দুই শ্রেণীর লোকের সমন্বয় থাকা জরুরি
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:৫০ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

|| তানবিরুল হক আবিদ || 

একটি ইসলামী ব্যাংক কখনোই এক শ্রেণীর পেশাজীবী (কর্পোরেট ব্যাংকার) দিয়ে সফলভাবে চলতে পারে না। বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতকে যদি সত্যিকার অর্থে জনগণের আস্থার জায়গায় নিতে হয় এবং শতভাগ শরিয়াহ-সম্মত করতে হয়, তবে সেখানে দুটি ভিন্ন দক্ষতার মানুষের সুষম সমন্বয় থাকা অপরিহার্য: আধুনিক ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্সে দক্ষ পেশাজীবী, আর  শরিয়াহ মানদণ্ড ও ফিকহুল মুয়ামালাত (ইসলামী অর্থনীতি ও লেনদেন আইন) সম্পর্কে গভীর জ্ঞানের অধিকারী দক্ষ আলেম বা মুফতি। 

সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের ব্যাংকিং খাতে যে সংস্কারের আলোচনা চলছে, সেখানে ‘করপোরেট গভর্নেন্স’ বা প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ঠিক করার বিষয়টি বারবার সামনে এসেছে। নিঃসন্দেহে করপোরেট গভর্নেন্স শক্তিশালী করা সময়ের দাবি। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, ইসলামী ব্যাংকের আত্মা হলো তার ‘শরিয়াহ গভর্নেন্স’। যদি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় শুধুমাত্র সাধারণ ব্যাংকাররা থাকেন, আর শরিয়াহ বোর্ডে বা অডিট বিভাগে বাস্তব লেনদেন বোঝেন এমন দক্ষ মুফতিদের কার্যকর অংশগ্রহণ না থাকে, তবে কাগজে-কলমে ইসলামী ব্যাংকিং হলেও বাস্তবে তা প্রচলিত ব্যাংকিংয়েরই কার্বন কপিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। 

এক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি বিশাল সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হলো, আমাদের কওমি মাদ্রাসার ইফতা বিভাগের (তাখাসসুস ফিল ফিকহি ওয়াল ইফতা) যোগ্য মুফতি সাহেবগণ। যারা মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে ভেতর থেকে জানেন, তারা অবগত আছেন যে ইফতা বিভাগগুলোতে ফিকহুল মুয়ামালাত, প্রাচীন ও আধুনিক ক্রয়-বিক্রয় পদ্ধতি, মুদারাবা, মুশারাকা, মুরাবাহা এবং সমকালীন ব্যাংকিং ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে অত্যন্ত গভীর ও সূক্ষ্মভাবে পড়াশোনা করানো হয়। একটি লেনদেনের কোথায় সূক্ষ্মভাবে সুদ (রিবা) বা অনিশ্চয়তা (গারার) ঢুকে যাচ্ছে, তা শনাক্ত করার মতো তাত্ত্বিক ও ফিকহি যোগ্যতা তাঁদের যথেষ্ট পরিমাণেই থাকে। 

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, কেবল প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেশনের জটিলতা বা সমমানের (Equivalence) আনুষ্ঠানিকতার কারণে আমাদের এই দক্ষ মুফতি সাহেবদের মূলধারার ইসলামী ব্যাংকিং খাতে প্রায়ই পিছিয়ে থাকতে হয়। ফলে ব্যাংকগুলোর শরিয়াহ অডিট ও পরিপালন বিভাগে যেমন দক্ষ জনবলের সংকট থেকে যাচ্ছে, তেমনি যোগ্য আলেমরাও দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি অবদান রাখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এই সংকট নিরসনে ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রক সংস্থা (বাংলাদেশ ব্যাংক) এবং ইসলামী ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রচলিত সনদের বাধার চেয়ে ফিকহি দক্ষতাকে মূল্যায়ন করে কওমি মাদ্রাসার যোগ্য মুফতিদের জন্য যদি ব্যাংকগুলোর শরিয়াহ বডি, শরিয়াহ সেক্রেটারিয়েট ও অডিট বিভাগে কাজের অবারিত সুযোগ তৈরি করে দেওয়া যায়, তবে তাঁরা এই খাতকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন। প্রয়োজনে ব্যাংকের অপারেশনাল প্রক্রিয়ার ওপর তাঁদের স্বল্পমেয়াদী করপোরেট ওরিয়েন্টেশন বা ফেলোশিপের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। 

মনে রাখতে হবে, দক্ষ ব্যাংকার এবং প্রাজ্ঞ মুফতি—এই দুই শ্রেণীর মানুষের মেধা ও সততার সম্মিলন ছাড়া টেকসই ইসলামী ব্যাংকিং গড়ে তোলা অসম্ভব। কর্তৃপক্ষ বিষয়টি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করলে আমাদের ইসলামী ব্যাংকিং খাতের অনেকগুলো মৌলিক সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।

লেখক : মুফতি , সাংবাদিক, কনসালটেন্ট 

এসএইচ/