
|
পাত্রী দেখার সময় কী কী প্রশ্ন করা যেতে পারে?
প্রকাশ:
২১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:৪৭ বিকাল
নিউজ ডেস্ক |
আওয়ার ইসলাম ডেস্ক বিয়ে মানবজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত। তাই বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর পরস্পরকে জানার সুযোগ থাকা প্রয়োজন। তবে এ পরিচয় ও কথোপকথন হতে হবে শরিয়তের নির্দেশনা এবং শালীনতার সীমারেখা মেনে। পাত্রী দেখার সময় কী ধরনের প্রশ্ন করা যাবে, কতটুকু কথা বলা যাবে এবং এ ক্ষেত্রে কী কী বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি—এসব বিষয়ে ইসলামের দিকনির্দেশনা রয়েছে। বিয়ের আগে পাত্রী দেখা সুন্নত ইসলাম বিয়ের আগে প্রস্তাবিত পাত্রীকে দেখার অনুমতি দিয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ ﷺ، فَقَالَ: إِنِّي تَزَوَّجْتُ امْرَأَةً مِنَ الْأَنْصَارِ، فَقَالَ: «فَانْظُرْ إِلَيْهَا، فَإِنَّ فِي أَعْيُنِ الْأَنْصَارِ شَيْئًا». ‘আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, এক ব্যক্তি নবিজী (সা.)-এর কাছে এসে বলল, আমি আনসারদের একজন নারীকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তখন তিনি বললেন, ‘তাকে দেখে নাও। কারণ আনসার নারীদের চোখে বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪২৪; সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৩২৪৬) অন্য একটি হাদিসে জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, إِذَا خَطَبَ أَحَدُكُمُ الْمَرْأَةَ، فَإِنِ اسْتَطَاعَ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى مَا يَدْعُوهُ إِلَى نِكَاحِهَا فَلْيَفْعَلْ. ‘তোমাদের কেউ যখন কোনো নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, তখন সম্ভব হলে তার এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দেখে নেওয়া উচিত, যা তাকে ওই নারীকে বিয়ে করতে আগ্রহী করে তোলে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২০৮২) এসব হাদিস থেকে বোঝা যায়, বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পাত্র-পাত্রীর পরস্পরকে দেখার সুযোগ রয়েছে। তবে এ সুযোগকে অবাধ মেলামেশা কিংবা সীমাহীন কথোপকথনের অনুমতি মনে করা যাবে না। পাত্রী দেখার সময় কী কী প্রশ্ন করা যেতে পারে? পাত্রী দেখার সময় অপ্রয়োজনীয় কিংবা বিব্রতকর প্রশ্নের পরিবর্তে দাম্পত্য জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে সংক্ষিপ্ত ও শালীন আলোচনা করা যেতে পারে। যেমন— ১. দ্বীনদারি ও ধর্মীয় অনুশীলন: ধর্মীয় জীবনযাপন, নামাজের প্রতি যত্ন, ইসলামী মূল্যবোধ এবং সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষার বিষয়ে তাঁর চিন্তাভাবনা জানা যেতে পারে। ২. দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে প্রত্যাশা: স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক দায়িত্ব, সংসার পরিচালনা, একে অপরের প্রতি সম্মান এবং পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি জানা যেতে পারে। ৩. শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: পড়াশোনা, পেশাগত জীবন কিংবা বিয়ের পর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলে তা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। পেশাজীবী হলে বিয়ের পর চাকরি চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তাঁর প্রত্যাশাও জানা যেতে পারে। ৪. পারিবারিক পরিবেশ ও সম্পর্ক: পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্ক, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা এবং দুই পরিবারের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখার বিষয়ে তাঁর চিন্তাভাবনা জানা যেতে পারে। ৫. জীবনযাপন ও ব্যক্তিগত পছন্দ: দৈনন্দিন জীবনযাপন, অবসর কাটানোর ধরন, জীবনযাপনের প্রত্যাশা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা যেতে পারে। ৬. সন্তান প্রতিপালন ও শিক্ষা: ভবিষ্যতে সন্তানদের দ্বীনি ও নৈতিক শিক্ষা, তাদের প্রতিপালন এবং পারিবারিক পরিবেশ কেমন হওয়া উচিত—এসব বিষয়ে উভয়ের চিন্তাভাবনা জানা উপকারী। ৭. গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব বিষয়: বিয়ের পর কোথায় বসবাস করবেন, যৌথ পরিবারে থাকা নিয়ে প্রত্যাশা কী, আর্থিক দায়িত্ব ও পারিবারিক সহযোগিতা কীভাবে সমন্বয় করা হবে—এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও উপযুক্ত সময়ে আলোচনা করা যেতে পারে। তবে এসব প্রশ্ন কোনো সাক্ষাৎকার বা জেরার মতো করে করা উচিত নয়। পাত্রীর সম্মান, স্বাচ্ছন্দ্য ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে প্রয়োজনীয় কথাগুলো জানতে হবে। সব প্রশ্ন প্রথম সাক্ষাতেই করতে হবে, এমনও নয়। কোনো বিষয় বিস্তারিতভাবে জানার প্রয়োজন হলে পরিবারের বিশ্বস্ত সদস্যদের মাধ্যমে খোঁজ নেওয়া যেতে পারে। পাত্রী দেখার সময় শরয়ি সীমারেখা পাত্রী দেখার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রথমত, নির্জনে একত্র হওয়া যাবে না। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ. ‘কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সঙ্গে মাহরাম ছাড়া নির্জনে অবস্থান না করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২৩৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৪১) অতএব, বিয়ের উদ্দেশ্যে পাত্র-পাত্রীর কথোপকথন হলেও নির্জনে একত্র হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে কিংবা শরিয়তসম্মত নিরাপদ পরিবেশে প্রয়োজনীয় আলোচনা করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, দৃষ্টি ও পোশাকের বিধান মানতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ ‘মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয়ই তারা যা করে, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবহিত।’ (সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩০) সাধারণ অবস্থায় দৃষ্টি সংযত রাখা মুমিন পুরুষের দায়িত্ব। বিয়ের উদ্দেশ্যে পাত্রী দেখার অনুমতি নির্দিষ্ট শরয়ি বিধানের অধীন; এটিকে অবাধ দৃষ্টিপাতের অনুমতি মনে করা যাবে না। হানাফি ফিকহের আলোচনায় ইবনে আবেদীন (রহ.)-এর নামে একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়, يُبَاحُ النَّظَرُ إِلَى الْوَجْهِ وَالْكَفَّيْنِ وَالْقَدَمَيْنِ، لَا يَتَجَاوَزُ ذَلِكَ. ‘মুখমণ্ডল, দুই হাত ও দুই পায়ের দিকে তাকানোর অনুমতি রয়েছে; এর বেশি নয়।’ (রদ্দুল মুহতার, ৫/৩২৫) তবে এই আরবি উদ্ধৃতি ও পৃষ্ঠা নম্বর মূল গ্রন্থের নির্ভরযোগ্য সংস্করণের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। বিয়ের উদ্দেশ্যে পাত্রী দেখার বিধান এবং সাধারণ অবস্থায় নারীর দিকে দৃষ্টিপাতের বিধান এক নয়। তাই এ উদ্ধৃতিকে বিয়ের উদ্দেশ্যে পাত্রী দেখার বিষয়ে একমাত্র বা চূড়ান্ত দলিল হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। তৃতীয়ত, কথাবার্তায় শালীনতা বজায় রাখতে হবে। প্রয়োজনীয় ও বৈধ বিষয় নিয়ে কথা বলা যাবে। অশালীন, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কিংবা অনুচিত ঘনিষ্ঠতা তৈরির মতো কথাবার্তা থেকে বিরত থাকতে হবে। কথোপকথনে আকর্ষণ বা আবেগ তৈরি হলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হারাম হয়ে যায়—এমন নয়; তবে কামপ্রবৃত্তি উসকে দেওয়া, অনুচিত ঘনিষ্ঠতা কিংবা শরিয়তবিরোধী আচরণ থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। চতুর্থত, পাত্রের পাশাপাশি পরিবারের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। পাত্রীর দ্বীনদারি, চরিত্র, পারিবারিক পরিবেশ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়ে খোঁজখবর নিতে পরিবারের বিশ্বস্ত সদস্যদের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। তবে গোপনীয়তা লঙ্ঘন, অপবাদ কিংবা অযথা খুঁটিনাটি অনুসন্ধান করা উচিত নয়। পাত্রীকে প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে দ্বীনদারি ও চরিত্রকে গুরুত্ব দিন বিয়ের ক্ষেত্রে বাহ্যিক সৌন্দর্য বা আর্থিক অবস্থাই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়। দ্বীনদারি, চরিত্র, দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং জীবন সম্পর্কে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রত্যাশাও গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَأَنْكِحُوهُ، إِلَّا تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادٌ عَرِيضٌ. ‘তোমাদের কাছে এমন ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলে, যার দ্বীনদারি ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট, তাহলে তার সঙ্গে বিয়ে দাও। যদি তা না করো, তবে পৃথিবীতে ফিতনা ও ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ১০৮৪) হাদিসটিতে বিয়ের ক্ষেত্রে দ্বীনদারি ও চরিত্রের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। তাই পাত্রী দেখার সময় শুধু বাহ্যিক বিষয় নয়; বরং ধর্মীয় অনুশীলন, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ এবং দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে প্রত্যাশাও বিবেচনা করা উচিত। কোন প্রশ্নগুলো এড়িয়ে চলা উচিত? পাত্রীকে এমন প্রশ্ন করা উচিত নয়, যা অপ্রয়োজনীয়ভাবে তাঁকে বিব্রত করে, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে কিংবা তাঁর মর্যাদায় আঘাত হানে। প্রথম সাক্ষাতে অতীতের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে অযথা জেরা করা, অন্যের সঙ্গে তুলনা করা, শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে অপমানজনক মন্তব্য করা কিংবা উত্তর দিতে অনিচ্ছুক বিষয়ে চাপ সৃষ্টি করা অনুচিত। বিয়ের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে—এমন গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য অবশ্যই যথাযথভাবে জানা দরকার। তবে তা জানার পদ্ধতি হতে হবে শালীন, ন্যায়সংগত ও সম্মানজনক। পাত্রের যেমন পাত্রীকে জানার সুযোগ রয়েছে, তেমনি পাত্রীরও পাত্র সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য জানার সুযোগ থাকা উচিত। বিয়ের প্রস্তুতিতে যেসব বই পড়া যেতে পারে বিয়ের আগে শুধু অনুষ্ঠান ও আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি নয়; বরং দাম্পত্য জীবনের দায়িত্ব, পারস্পরিক অধিকার, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সন্তান প্রতিপালন সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করাও জরুরি। এ জন্য নির্ভরযোগ্য আলেমদের লেখা ইসলামী পারিবারিক জীবন, বিবাহের মাসআলা-মাসায়েল, স্বামী-স্ত্রীর অধিকার ও দায়িত্ব এবং সন্তান প্রতিপালনবিষয়ক বই পড়া যেতে পারে। বই নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য প্রকাশনী ও যোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া ভালো। বিশেষত বিবাহ, মোহর, ভরণপোষণ, তালাক, পারিবারিক অধিকার ও দায়িত্বের মতো বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহ এবং স্বীকৃত ফিকহি ব্যাখ্যাভিত্তিক গ্রন্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। বিয়ের সিদ্ধান্তে পরামর্শ ও ইস্তিখারা পাত্র-পাত্রীর উচিত প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো জেনে, অভিভাবকদের সঙ্গে পরামর্শ করে এবং ইস্তিখারা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। পাত্রী দেখার সময় প্রশ্নের সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো শালীনভাবে জানা, উভয়ের সম্মান রক্ষা করা এবং শরিয়তের সীমারেখা মেনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। বিয়ে কেবল দুজন মানুষের সম্পর্ক নয়; এটি দায়িত্ব, আমানত ও পারস্পরিক অধিকারের বন্ধন। তাই এ বিষয়ে জ্ঞান, পরামর্শ ও বিচক্ষণতার সঙ্গে এগিয়ে যাওয়াই কাম্য। এসএইচ/ |