মাদরাসার গদি থেকে ওয়াজের ময়দানে
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ০৩:১৬ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

আওয়ার ইসলাম ডেস্ক

বয়ান ও দীনি মাহফিলের প্রতি কৈশোরকাল থেকেই আনছারী রহ.-এর ঝোঁক ছিল। হবিগঞ্জের বাহুবল মাদরাসায় পড়াশোনার সময় তিনি একটি মসজিদে ইমাম হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। মূলত সে সময়ই বয়ান শুরু করেন। তবে প্রাতিষ্ঠানিক ও একাডেমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পরই তিনি নিজেকে পুরোপুরি বয়ান ও তাফসিরের ময়দানে নিয়োজিত করেন। অন্যান্য দীনি খেদমতের পাশাপাশি মানুষের কাছে দীনের সঠিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার নিয়তে তিনি নিয়মিত মাহফিলে বয়ান শুরু করেন।

ছাত্রজীবনেই তিনি বরেণ্য বুজুর্গ আল্লামা গহরপুরী রহ.-এর কাছে আধ্যাত্মিকতার সবক নেন। আনছারী রহ. ছিলেন গহরপুরী রহ.-এর অতি প্রিয় ও স্নেহধন্য শাগরেদ। গহরপুরী রহ.-এর নির্দেশনাতেই তিনি দীনি মাহফিলের ময়দানে তিনি নিজেকে পরিচালিত করতেন। এ ব্যাপারে তাঁর চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘মানুষের কাছে গিয়ে গিয়ে দীনের দাওয়াত পৌঁছানো—এটি তো আমাদেরই মূল দায়িত্ব ছিল। অথচ আজ মানুষ কষ্ট করে আমাদের কাছে আসে, তারাই মাহফিলের আয়োজন করে, আর আমরা সেখানে গিয়ে কেবল একটু দীনের কথা শোনাবো; এতোটুকু করতেও যদি আমরা কার্পণ্য বা অলসতা করি, তবে আল্লাহর দরবারে আমরা কী জবাব দেব!’

আনছারী রহ.-এর কাছে বয়ান ছিল আল্লাহর দীন প্রচারের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তিনি যখন শারীরিকভাবে প্রচণ্ড অসুস্থ এবং কথা বলতেও তাঁর ভীষণ কষ্ট হতো, তখনও হাজারো মানুষ তাঁর বয়ান শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত। সাধারণ মানুষের দীনি পিপাসা মেটানোর জন্য প্রচণ্ড শারীরিক কষ্টের মধ্যেও তিনি বয়ান চালিয়ে যেতেন। কথা বলার ওপর চিকিৎসকের নিষেধাজ্ঞারও তিনি পরোয়া করেননি।

কখনো কখনো এমন ঘটনাও ঘটেছে—দীর্ঘ সময় ধরে একটানা কথা বলার কারণে তাঁর মুখ দিয়ে রক্ত ঝরতো; কিন্তু তিনি অত্যন্ত শান্তভাবে টিস্যু দিয়ে সেই রক্ত মুছে নিতেন। সেই তীব্র শারীরিক কষ্টের মুহূর্তগুলোতেও তাঁর মুখভঙ্গিতে কখনো কোনো বিরক্তি বা যন্ত্রণার সামান্য ছাপও দেখা যেত না।

হাফেজ মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারী রহ.-এর ওয়াজের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল। সেগুলোর কয়েকটি হলো—

১. সহজ ও হৃদয়গ্রাহী উপস্থাপন: শরিয়তের যেকোনো কঠিন, জটিল ও তাত্ত্বিক বিষয়কে অত্যন্ত সহজ, সাবলীল এবং হৃদয়গ্রাহী ভাষায় সাধারণ মানুষের সামনে উপস্থাপন করা।

২. অতিরঞ্জনমুক্ত বক্তব্য: বয়ান বা বক্তব্য প্রদানের ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের ভুল-ভ্রান্তি, অতিরঞ্জন ও ভিত্তিহীন বা বানোয়াট বর্ণনা থেকে সর্বদা কঠোরভাবে সতর্ক থাকা।

৩. অনন্য তেলাওয়াত শৈলী: বয়ানের মাঝে সুমধুর কণ্ঠে কেরাতের ভঙ্গিতে কুরআন তেলাওয়াত।

৪. মুতালাআর প্রতি অনুরাগ: জীবনের সীমাহীন ব্যস্ততার মধ্যেও নিয়মিত কিতাব মুতালাআ বা অধ্যয়ন চালিয়ে যাওয়া। এমনকি দীর্ঘ সফরের সময় গাড়ির মধ্যেও তাঁর অধ্যয়ন অব্যাহত থাকত।

৫. শালীন রসবোধ: হাস্যরসিকতা তাঁর স্বভাবের একটি অংশ ছিল, তবে তা সর্বদা ইসলামি শালীনতা ও পরিমিতিবোধের সীমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত।

৬. হাদিয়া গ্রহণে নির্মোহ মনোভাব: মাহফিলের হাদিয়া বা সম্মানি গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁর মধ্যে কখনো কোনো ধরনের লোভ-লালসা কিংবা দরকষাকষি ছিল না। কর্তৃপক্ষ প্রদত্ত খামটি খুলে দেখা পর্যন্ত তিনি প্রয়োজন মনে করতেন না।

৭. অনুরোধ রক্ষায় ক্লান্তিহীনতা: মাহফিলের দাওয়াত গ্রহণের ক্ষেত্রে তিনি কাউকে কোনো প্রকার হয়রানির মুখে ফেলতেন না। সাধারণ মানুষের অনুরোধ রাখতে গিয়ে তিনি কখনো কখনো একই দিনে ও রাতে পাঁচ থেকে ছয়টি মাহফিলে পর্যন্ত বয়ান করেছেন।

৮. দাওয়াতের ময়দান হিসেবে মাহফিল নির্বাচন: মাহফিল ছোট কি বড়Ñসেটি তিনি কখনো বিবেচনা করতেন না; বরং প্রতিটি মাহফিলকেই তিনি আল্লাহর দীন প্রচারের একটি সুবর্ণ ময়দান হিসেবে দেখতেন।

তাঁর বয়ানে যেসব বিষয় সর্বাধিক গুরুত্ব পেত সেগুলো হলো—কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক ও অকৃত্রিম অনুসরণ। ব্যক্তিজীবনে ঈমান, তাকওয়া ও নেক আমলের অপরিহার্যতা। সুদৃঢ় পারিবারিক বন্ধন এবং সামাজিক ও সামষ্টিক দায়িত্ববোধ। ইসলামি খেলাফত ও ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপরেখা। তরুণ ও যুবসমাজকে নৈতিক অবক্ষয় এবং আধুনিক ধোঁকা থেকে রক্ষা করা। সমাজে প্রচলিত সকল কুসংস্কার, অপচয় ও অনাচারের বিরুদ্ধে জোরালো জনসচেতনতা তৈরি করা।

সুললিত কণ্ঠে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত, সুবিন্যস্ত ও আকর্ষণীয় উপস্থাপনশৈলী এবং গভীর দরদমাখা কণ্ঠস্বরের জাদুতে তিনি খুব অল্প সময়েই দেশের অন্যতম শীর্ষ জনপ্রিয় ওয়ায়েজে পরিণত হন। তাঁর এই অসাধারণ জনপ্রিয়তা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাংলাভাষী মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেয়। তিনি অভিষিক্ত হন বিশ্বনন্দিত মুফাসসিরে কুরআনের মর্যাদায়। এমনকি ভাষার ভিন্নতা সত্ত্বেও ভিনভাষী মানুষেরাও তাঁর হৃদয়গ্রাহী বয়ান মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত; তাঁর অনন্য বাচনভঙ্গি ও সুরের মূর্ছনা ভাষার সমস্ত সীমাবদ্ধতাকে অনায়াসে জয় করে নিত।

ইসলামি সম্মেলন সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে

বসুন্ধরা ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা, ফকিহুল মিল্লাত মুফতি আব্দুর রহমান রহ. ও তৎকালীন সচেতন উলামায়ে কেরাম একটি অরাজনৈতিক দীনি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন, যার নাম ছিল- ‘ইসলামি সম্মেলন সংস্থা বাংলাদেশ’। এই সংগঠনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল- ‘ইসলামের সঠিক বাণী ও আদর্শের সর্বাত্মক প্রচার-প্রসার’।

এই সংস্থার উদ্যোগে ‘আন্তর্জাতিক ইসলামি মহাসম্মেলন’-এর ব্যানারে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশাল পরিসরে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হতো। এসব মহাসম্মেলনে বিশ্ববরেণ্য আলেম ও মনীষীরা অতিথি হিসেবে তাশরিফ আনতেন; যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন পাকিস্তানের বিখ্যাত ওয়ায়েজ সাইয়েদ আব্দুল মাজীদ নাদিম, মুফতি রফি উসমানী রহ., মুফতি তাকি উসমানী, মুফতি জুবায়ের উসমানী, দেওবন্দের মুরব্বিয়ানে কেরামসহ আরও বহু আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন উলামায়ে কেরাম।

প্রতিটি সম্মেলনেই বিপুলসংখ্যক তৌহিদি জনতার অভূতপূর্ব সমাগম ঘটত। আলেম-উলামা ও শিক্ষার্থীদের মিলনমেলায় মুখরিত হয়ে উঠত সম্মেলন প্রাঙ্গণ। আর এই বিশাল আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে উপস্থিত থাকতেন মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারী রহ.।

তাঁর সহজ-সরল ও প্রাঞ্জল আলোচনা শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে সব স্তরের মানুষ অনায়াসে বুঝতে পারত। বিশেষ করে তাঁর মায়াবি ও সুরেল কণ্ঠে সাহাবায়ে কেরামের ঈমানদীপ্ত জীবনগাথা শুনে শ্রোতারা অঝোরে কাঁদতেন এবং নিজেদের জীবনে দীনি আমল ও পরিবর্তনের দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করতেন।

দীনি দাওয়াত একটি সার্বজনীন ও বৈশ্বিক মহৎ দায়িত্ব। আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নতি এবং বিশ্বের আনাচে-কানাচে প্রবাসী মুসলিম সমাজের বিস্তারের ফলে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমরা আন্তর্জাতিক পরিম-লে দীনি দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনার বিশাল সুযোগ লাভ করেন। হাফেজ মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারী রহ. ছিলেন সেই বৈশ্বিক দাওয়াতি ধারার অন্যতম অগ্রপথিক ও প্রখ্যাত দাঈ। তাঁর বিভিন্ন বিদেশ সফরের মূল লক্ষ্যই ছিলÑপ্রবাসী মুসলিম ভাই-বোনদের হৃদয়ে ঈমানি চেতনা পুনরায় জাগ্রত করা, তাদের মাঝে ইসলামি মূল্যবোধ সুদৃঢ় করা এবং প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মকে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকিত জীবনব্যবস্থার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা।

হাফেজ মাওলানা যুবায়ের আহমদ আনছারী রহ.: বর্ণাঢ্য জীবন, কর্ম ও সাধনা (পর্ব: ৩)

লেখক: আব্দুল্লাহ আফফান

চলবে....

 

আইও/