স্মৃতিতে ও অনুভবে আল্লামা নূরুল হক রহ.
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:২১ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

|| মুহাম্মাদ বুরহানুদ্দীন বিন সাদ ||

আল্লামা নূরুল হক রহ. (বটগ্রামের হুজুর)-এর স্মরণে কিছু লেখার পূর্বে অন্তরের মধ্যে বারবার ইমাম তাকীউদ্দীন সুবকী রহ.-এর একটি বক্তব্য ভেসে উঠছে, যা তিনি ইমাম গাযালী রহ. এর ব্যাপারে বলেছেন। তিনি বলেন,

لا يعرف قدر الشخص في العلم إلا من ساواه في رتبته وخالطه مع ذلك

“কোনো ব্যক্তির ইলমী মাকাম ও অবস্থান যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে পারেন কেবল তিনিই, যিনি জ্ঞানের স্তরে তাঁর সমপর্যায়ের এবং সেই সঙ্গে তাঁর সান্নিধ্যও লাভ করেছেন।”—(তাবাকাতুশ শাফিইয়্যাতিল কুবরা ৬/২০২)

বাণীটির দিকে তাকালে হুজুরকে নিয়ে কিছু লেখার সাহস যেন হারিয়ে ফেলি। তাঁর ইলম, আমল, তাকওয়া-তাহারাত, দ্বীনের প্রতি অসামান্য দরদ, দাওয়াতী প্রজ্ঞা ও বহুমাত্রিক দ্বীনী খেদমতের কতটুকুই বা আমার পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব? তিনি তো ছিলেন বাকিয়্যাতুস সালাফ, হাজারো আলেমের আশ্রয়স্থল। তবু সালাফে সালেহীনের আরেকটি বাণী আমাকে সাহস জোগায়—

عند ذكر الصالحين تنزل الرحمة.

“নেককারদের আলোচনায় রহমত নাযিল হয়।”—(হিলয়াতুল আউলিয়া ৭/২৮৫; মানাকিবুল ইমাম আহমাদ, পৃ. ৩৬৫; সিয়ারু আলামিন নুবালা ১৪/৬৪)

সে রহমত ও বরকত লাভের প্রত্যাশায় একজন প্রিয় মুরুব্বীর প্রতি হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও স্মৃতির কিছু কথা লিখতে কলম হাতে নিলাম।

আমি আমার জীবনে বাংলাদেশের যে ক’জন মনীষীর নাম ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি এবং বিভিন্ন উপলক্ষ্যে যাঁদের মজলিসে অনেক বেশি বসার সৌভাগ্য হয়েছে, তাঁদের অন্যতম হলেন— আল্লামা নূরুল হক রহ. (বটগ্রামের হযরত)।

আমার নানা আল্লামা মুফতী আবদুল আজিজ রহ. (লাকসামের হুজুর নামে সর্বাধিক পরিচিত), যিনি ফেনী শর্শদি মাদরাসার দীর্ঘ ৪৮ বছর একাধারে শাইখুল হাদীস ও প্রধান মুফতী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তিনি আর বটগ্রামের হুজুর রহ. ছিলেন খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সেই সূত্রে হুজুরের সঙ্গে আমাদের পরিবারের একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

হুজুরও আমাদেরকে দেখলে চিনতেন যে, মুফতী আবদুল আজিজ সাহেবের নাতি। কয়েকবার স্নেহভরে নিজ থেকেই জিজ্ঞেস করেছেন যে, তুই প্রেমনলের আবদুল আজিজ সাহেবের নাতি না? একবার নানাজানের পারিবারিক জীবন নিয়ে ২০১৬ সালে ছোট্ট একটি স্মারক প্রকাশিত হয়। হুজুরকে যখন হাদিয়া দিই, তখন হুজুর নিজ থেকেই নানার বিভিন্ন স্মৃতিচারণ করা শুরু করলেন। হাটহাজারী মাদরাসায় হুজুর নানাজানের কয়েক জামাত নিচে ছিলেন। এ কথা হুজুর নিজেই আমাকে বলেছেন।

এ ছাড়া হুজুরের সাথে সম্পর্কের আরেকটি দিক হলো— আমার জেঠা হযরত মুফতী মুহিব্বুদ্দীন রহ. ছিলেন তাঁর অত্যন্ত স্নেহের ভক্ত। জেঠা বটগ্রামের হুজুরকে আমাদের অঞ্চলের বিভিন্ন মাহফিলগুলোতে দাওয়াত দিতেন। বিশেষতঃ আমাদের বাড়ির মাহফিলে বটগ্রাম হুজুর রহ. প্রায় বছর আসতেন। এ ছাড়া বিভিন্ন ইসলাহী প্রোগ্রামে আসতেন। তখন হুজুর আমাদের বাড়িতে আসতেন। আমাদের ঘরে হুজুর কতবার যে তাশরীফ এনে আমাদেরকে ধন্য করেছেন, তার হিসেব আজ মনে নেই। আজ হুজুর আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর সঙ্গে কাটানো সেই মুহূর্তগুলোই এখন বুকের গভীরে এক অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে।

দুই.

ইমাম মালেক রহ. বলেছেন—

ليس في العلم شيء خفيف.

অর্থাৎ ইলমের কোনো অংশই ছোট নয়।—(তারতীবুল মাদারিক ওয়া তাকরীবুল মাসালিক ১/১৮৪)

চিন্তা করলে বোঝা যায় সালাফের এ কথাটি শুধু ইলমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়; বরং দ্বীনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য। অর্থাৎ দ্বীনের প্রতিটি জিনিসই এবং দ্বীনের প্রতিটি খেদমতই মহান ও আজীম। আমরা আমাদের বটবৃক্ষ হযরত বটগ্রামের হুজুরের জীবনে এ কথাটির বাস্তব প্রতিফলন দেখেছি। তিনি দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে যেখানে ডাকত ছুটে যেতেন। সারাটি জীবন দ্বীনের ফিকির নিয়ে দৌড়িয়েছেন। এ প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত। ওই মাদরাসার সমস্যা— তার সমাধানে হুজুর আজ সেখানে দৌড়ে গেছেন। গত কয়েক বছর পূর্বে রমজানের আগ দিয়ে আমার ভগ্নিপতি মাওলানা যুবাইর সাহেব কুমিল্লা শহরে বেদআতী অধ্যুষিত এক এলাকায় মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। মাদরাসার উদ্বোধন উপলক্ষ্যে উস্তাদে মুহতারাম ফকীহ আবদুল মালেক হাফি. ও আল্লামা নূরুল হক রহ.-কে দাওয়াত দেন। বটগ্রামের হযরতের অন্য জায়গায় প্রোগ্রাম থাকায় হযরত বলেছেন, আমাকে দাওয়াত দিলে আমি জুমার পর বয়ান করব। আমার অন্য জায়গায় প্রোগ্রাম আছে। আমি তাদেরকে কথা দিয়েছি। তাই মাগরিবের পর বা এরপর আমার পক্ষে উপস্থিত থাকা সম্ভব নয়। পরে হুজুরের বয়ান জুমার পর রাখা হয়। ওই দিন হুজুর অত্যন্ত সুন্দর আলোচনা করেন। অথচ মাহফিলস্থলে স্টেজে আমরা কয়েকজন ছাড়া আর কোনো শ্রোতা ছিল না। আমি মঞ্চে হুজুরের নাম ঘোষণা করি। বয়ান শেষে আমরা লজ্জায় হুজুরের সামনে যখন ওজরখাহী করি, হুজুর বলেন— “একজন মানুষও যদি একটি কথা শুনে আমল করে তাহলে আমার আলোচনা সার্থক।” সেদিন আমি লক্ষ করেছি, হুজুর হাজার হাজার শ্রোতার উপস্থিতিতে যেভাবে গুরুত্বের সঙ্গে বয়ান করেন, ঠিক সেদিনও অল্প কয়েকজন শ্রোতার সামনেও ঠিক একই গুরুত্বের সাথে বয়ান করেন। এটা হুজুরের ইখলাস ও লিল্লাহিয়্যাতের বহিঃপ্রকাশ। হুজুর কোনো দ্বীনী কাজকে ছোট মনে করতেন না। যেখানে সুযোগ পেতেন চলে যেতেন। মানুষকে দ্বীনের পথে ডাকতেন। দ্বীনের কথা শোনাতেন। ছোট-বড় যেকোনো ধরনের মাহফিলে দাওয়াত পেলেই লাব্বাইক বলে হাজির হয়ে যেতেন।

তিন.

আমরা ছোটবেলা থেকেই বটগ্রাম হুজুর রহ.-এর বয়ানের সাথে পরিচিত ছিলাম। হুজুর সাধারণত আত্মার ব্যাধি, ইত্তিবায়ে সুন্নাহ, বিদআত থেকে বিরত থাকা, পর্দার গুরুত্ব, তাযকিয়ায়ে নাফস, ইসলামের সৌন্দর্য, পারিবারিক জীবনে ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ প্রভৃতি বিষয়ে অত্যন্ত সহজ-সরল উপস্থাপনায় কিছুটা কুমিল্লার আঞ্চলিক ভাষায় বয়ান করতেন। সমাজের সর্বশ্রেণির মানুষ হুজুরের বয়ান বুঝতে পারত। সহজ উপমার মাধ্যমে কুরআন-সুন্নাহর আলোচনাগুলো ফুটিয়ে তুলতেন। তাঁর বয়ানে ছিল না কোনো সুরের মূর্ছনা; ছিল না কোনো লৌকিকতা। তথাপি আমাদের অঞ্চলের সর্বশ্রেণির মানুষ তাঁর বয়ানের জন্য পাগল ছিল। একেবারে পাপিষ্ঠ ও জালিম এমন মানুষদেরকেও খুবই মনোযোগের সঙ্গে মন্ত্রমুগ্ধের মতো হুজুরের বয়ান শুনতে দেখেছি। হুজুরের সাদামাটা কথাগুলো কঠিন হৃদয়কেও ছুঁয়ে যেত। যিয়াদ ইবনে আবী সুফিয়ান রহ. খুবই চমৎকার বলেছেন—

«إذا خرج الكلام من القلب وقع في القلب، وإذا خرج من اللسان لم يجاوز الآذان»

“কথা যখন হৃদয়ের গভীর থেকে বের হয়, তা অবশ্যই অন্যের হৃদয়ের গভীরে প্রভাব ফেলবে। আর যখন শুধু জিহ্বা থেকে বের হয়, তখন তা কানও অতিক্রম করে না।”—(জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাযলিহি)

হুজুরের বয়ানে এ বাণীটির যথার্থতা খুঁজে পেতাম। সাদামাটা জিন্দেগীর এ মানুষটির সামনে বহু প্রভাবশালী ও প্রতাপশালী লোককে নুয়ে এসে শ্রদ্ধা জানাতে দেখেছি। আসলে ইলমের আলো, ঈমানের আলো ও সর্বপরি দ্বীনী গায়রতের কারণে হুজুরকে সর্বশ্রেণির মানুষ দিল থেকেই গভীর শ্রদ্ধা ও সমীহ করত।

গত কয়েক বছর আগে আমাদের বাড়ির মাদরাসার মাহফিলে হুজুর নিম্নোক্ত হাদীসটি নিয়ে আলোচনা করেন—

ما نقصت صدقة من مال.

“সদকার কারণে কখনো ধন-সম্পদ কমে না”—(সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৮৮)

হাদীসটির মর্ম বোঝাতে গিয়ে হুজুর সুন্দর একটি উপমা দেন। হুজুর শ্রোতাদের প্রশ্ন করে বলেন— মহিলাদের চুল বড়? নাকি পুরুষের চুল বড়?

শ্রোতারা বলল, মহিলাদের চুল বড়। হুজুর বললেন— না, পুরুষের চুল বড়। কারণ পুরুষ মানুষ প্রতি মাসে যদি এক ইঞ্চি করে চুল কাটে, তাহলে সে বছরে এক ফুট চুল কাটলো। দশ বছরে দশ ফুট চুল কাটলো। পক্ষান্তরে মহিলা মানুষ চুল কাটে না, তাই দশ বছরেও তার চুল আপন অবস্থায় এক/দুই ফুট থাকে। এ হলো হাদীসের মর্ম। পুরুষ খরচ করেছে তথা চুল কেটেছে, তাই তার চুল বড় হয়েছে। পক্ষান্তরে মহিলা খরচ করেনি তথা চুল কাটেনি, তাই তার চুল বড় হয়নি। আপন অবস্থায় রয়ে গেছে। এখান থেকে বুঝতে পারলাম যে, খরচ করলে মাল বাড়ে।

হুজুর এ ধরনের আরও সুন্দর সুন্দর উপমার মাধ্যমে কুরআন-সুন্নাহর আলোচনাগুলো ফুটিয়ে তুলতেন।

চার.

বটগ্রামের হুজুর রহ. ছিলেন খানকার পীর, ময়দানের বীর। হুজুর কুমিল্লা জেলা হেফাজতে ইসলামের সভাপতি ছিলেন। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর ছিলেন। ফিলিস্তিন ইস্যুতে কুমিল্লা সুয়াগাজী বাজারে যুবসমাজের উদ্যোগে ফিলিস্তিনের পক্ষে ও ইসরাঈলী পণ্য বয়কটের দাবিতে এক সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। বটগ্রামের হুজুরকে দেখেছি সেদিন অত্যন্ত জযবার সাথে যুবকদের মসজিদে আকসার আজাদী ও ইসরাঈলের বিরুদ্ধে জিহাদের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য আহ্বান করেছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন ইস্যুতে হযরত রহ. বীরদর্পে রাজপথে নেমে আসতেন। রাজপথেও হুজুরের ভাষণগুলো হতো অত্যন্ত দিকনির্দেশনামূলক। হক কথা অকপটে বলতেন। ইসলামের মজলুম বিধান জিহাদের বিষয়ে যখন অন্য অনেকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে কথা বলত, ঠিক সে সময়ে বটগ্রাম হুজুর রহ.-এর যবানে এ বিধানের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট আলোচনা শুনেছি। হুজুর মাঠে-ময়দানেও শুধু শ্রোতাদের উত্তেজিত করা, কাজের কথা না বলে শুধু গরম ভাষণ দেওয়া—এ ধরনের কাজ করতেন না। গত ১৫ নভেম্বর ২০২৫, শনিবার হযরত মাওলানা আবদুল হামীদ হাফি. (পীর সাহেব মধুপুরী)-এর নেতৃত্বে সোহরাওয়ার্দী ময়দানে আন্তর্জাতিক খতমে নবুওয়াত কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কুমিল্লার ওলামায়ে কেরামের প্রতিনিধি হিসেবে হুজুর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলেন। সেখানে হুজুর কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে পাড়ায় পাড়ায় ও মহল্লায় মহল্লায় গণসচেতনতা তৈরি করে তৃণমূল পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত এ আন্দোলন গড়ে তোলার পরামর্শ দেন।

পাঁচ.

ছোটদের সাথে হুজুরের সম্পর্ক ছিল অন্যরকম। চোখে পড়ার মতো। ছোটদের কাজকে হুজুর মূল্যায়ন করতেন। সময়োপযোগী পরামর্শ দিয়ে ও হিম্মত আফযায়ী করে এগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। হুজুরকে আমি দিল থেকে মহব্বত ও শ্রদ্ধা করতাম। কিন্তু হুজুরের স্নেহের কারণে কখনো সুযোগ হলে দ্বীনী কোনো বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে ভয় পেতাম না। গত কয়েক বছর আগে যখন হুজুর আমাদের বাড়ির মাদরাসার মাহফিলে তাশরীফ আনেন, তখন বয়ানের আগ দিয়ে কিছুক্ষণ হুজুর আমাদের ঘরে বিশ্রাম করেন। তখন আমি আর স্নেহের ছোট জেঠাতো ভাই মাওলানা তাকী উদ্দীন (হুজুরের নাতিন জামাই) হুজুরের হাতে, পায়ে ও মাথায় তেল মালিশ করে দিই এবং পা টিপে দিই। তখন হুজুরের সঙ্গে বিভিন্ন দ্বীনী বিষয়ে কথা বলার সুযোগ হয়। বিশেষতঃ আমাদের এলাকায় কীভাবে দ্বীনী ও দাওয়াতী কাজ করা যায়? এ বিষয়ে হুজুর সুন্দর কিছু পরামর্শ ও কাজের আইডিয়া দেন। হুজুর বিদআতীদের ব্যাপারে ওই সময় বলেন— তাদের সাথে বিতর্কে না জড়িয়ে ইতিবাচক আন্দাযে কাজ করতে হবে। ওই সময় হুজুরের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারি যে, হুজুর ছোটদের কতটা গুরুত্ব দেন।

২০২০ সনে সারাদেশে যখন লকডাউন চলছিল এবং সমস্ত কওমী মাদরাসা তখন বন্ধ, ওই সময় আমরা এলাকার তরুণ আলেমরা একত্রিত হই এবং এলাকার মুরুব্বী ও বয়োজ্যেষ্ঠ আলেমদের সাথে পরামর্শ করে একটি সংগঠন করার ফিকির করি। অবশেষে মুরুব্বীদের পরামর্শে “পেরিয়া ইউনিয়ন উলামা পরিষদ”— এ নামে একটি সংগঠন করি। পরে সংগঠনের সকলের সিদ্ধান্তক্রমে আমরা হুজুরের সাথে সাক্ষাৎ করতে তাঁর গ্রামের বাড়ি দাতামা যাই। হুজুর খুব মনোযোগের সঙ্গে আমাদের কথা শোনেন এবং বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেন। পরে সকলের অনুরোধে আনুষ্ঠানিকভাবে হুজুর আমাদের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন। ওই সময়ও আমরা অনুভব করতে পেরেছি যে, হুজুর ছোটদের কাজকে কীভাবে গুরুত্বের সাথে দেখেন। “কাহতুর রিজাল” তথা মানব-দুর্ভিক্ষের এই দুঃসময়ে বটগ্রাম হুজুর রহিমাহুল্লাহ ছিলেন আমাদের জন্য এক বটবৃক্ষ। কেবল কুমিল্লার জন্য নয়, হুজুর ছিলেন সারাদেশের অন্যতম মুরুব্বী। আজ হুজুরকে হারিয়ে কেমন জানি পুরো কুমিল্লা জেলার সকল কওমী মাদরাসা ও সকল দ্বীনী কাজকে এতীম, অসহায় ও অভিভাবকহীন মনে হচ্ছে।

ছয়.

গত ১৪-১০-২০২৬ ইং তারিখে সকালে যখন হযরত বটগ্রাম হুজুরের ইন্তিকালের সংবাদ পাই, তখন মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে এমন অনুভব হয়েছে। যেহেতু দরসও বন্ধ, মাদরাসায় খেয়ার চলছে, তাই সাথে সাথে হুজুরের জানাজায় অংশগ্রহণ করার পূর্ণ সংকল্প করি। অতঃপর আমাদের মাদরাসার মুহতামিম সাহেব মুফতী মাহবুবুর রহমান সাহেবের সাথে হুজুরের জানাজায় শরীক হই। চাঁদপুর থেকে সুয়াগাজী যাওয়ার পথে পথে শুধু হুজুরের জানাজায় শরীক হতে আসা উলামায়ে কেরাম, তালেবে ইলম ও সাধারণ মুসল্লীদের বিভিন্ন কাফেলার সাথে সাক্ষাৎ হয়। ঠিক আগ মুহূর্তে জানাজাস্থলে গিয়ে পৌঁছাই। যেদিকে তাকাই সেদিকে শুধু মুসল্লী আর মুসল্লী। হুজুরের জানাজা ছিল কুমিল্লা জেলার বৃহৎ একটি জানাজা। জানাজার বহু আগেই সুয়াগাজী কলেজ মাঠ ভরে যায়। এরপর আশপাশের রাস্তাগুলোও বন্ধ হয়ে যায়। সেখানে কাতারের সংযোগ করে মুসল্লীগণ জানাজায় শরীক হোন। যেদিকেই তাকাই শুধু টুপি আর পাঞ্জাবী নজরে আসে। মুকুটহীন সম্রাট আল্লামা নূরুল হক রহিমাহুল্লাহকে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে ফজরের আগ থেকেই ভক্তবৃন্দ আসা শুরু করেন। হুজুরের জানাজা পড়তে গিয়ে ইমামু আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামাআ ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহর চমৎকার একটি নস বারবার মনে পড়ছিল। সাথীদেরকে ওই নসটি পড়ে শোনাই। তাঁরাও খুব মুগ্ধ হোন। ইমাম আহমদ রহিমাহুল্লাহ বলেন—

قولوا لأهل البدع: بيننا وبينكم يوم الجنائز

“বিদআতীদেরকে বলো, তোমাদের মাঝে আর আমাদের মাঝে পার্থক্যকারী হলো জানাজার দিবস।”—(সিয়ারু আলামিন নুবালা ১১/৩৪০; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ১০/৩৪২)

ইমাম ইবনে কাসীর রহ. ইমাম আহমাদ রহ.-এর এ বক্তব্য উল্লেখ করার পর বিভিন্ন বিদআতী নেতার জানাজার কথা উল্লেখ করে দেখিয়েছেন, যেখানে তাদের জানাজায় সামান্য ক’জন মানুষ হয়েছিল। আমাদের বটবৃক্ষ হযরত বটগ্রামের হুজুর রহ.-এর জানাজার দৃশ্য দেখে সেদিন হৃদয়ে বারবার ইমাম আহমাদ রহ. ও ইমাম ইবনে কাসীর রহ.-এর বক্তব্যগুলো ভেসে ওঠল।

আমাদের দেশে ইতিপূর্বেও বুযুর্গ আলেমদের জানাজার নামাজে মানুষের উপচে পড়া ভিড় ও ভক্তবৃন্দের ঢল দেখে জেনারেল শিক্ষিতদের মাঝে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। গত কয়েক বছর পূর্বে সম্ভবত হযরত মুফতী আবদুস সালাম চাটগামী রহিমাহুল্লাহর জানাজার দৃশ্য দেখে এক অধ্যাপক খুবই মুগ্ধতার সঙ্গে এ বিষয় নিয়ে জাতীয় দৈনিকে একটি কলাম লিখেছেন।

বটগ্রাম হুজুরের জানাজার নামাজে ছিল আমাদের জন্য অনেক শিক্ষণীয় বিষয়। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হুজুরের জানাজার সব কিছু ছিল ইত্তিবায়ে সুন্নতের অনন্য এক দৃষ্টান্ত। জানাজার নামাজ বিলম্বিত করা হয়নি। এ ছাড়া জানাজাকেন্দ্রিক দেশে যেসব প্রচলন রয়েছে, তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল। বিশেষতঃ জানাজার আগে লম্বা বক্তব্য ও জীবনী আলোচনা। হযরতের জানাজার আগ দিয়ে হযরতের সুযোগ্য সন্তান হযরত মাওলানা মুফতী নেয়ামতুল্লাহ সাহেব হাফি. দিকনির্দেশনামূলক দু’চারটি কথা বলেন। এর পরপরই জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। অথচ জানাজায় দেশের শীর্ষ অনেক মুরুব্বী আলেম উপস্থিত ছিলেন। কাউকে কথা বলার জন্য বলা হয়নি। আল্লাহ তাআলা হুজুরের সাহেবজাদাদের উত্তম বিনিময় দান করুন। তাঁরা হযরতের ব্যক্তিত্বের সাথে যায় না এমন সব কাজ থেকে বিরত ছিলেন। সর্বক্ষেত্রে আবেগকে প্রাধান্য না দিয়ে শরীয়তকে প্রাধান্য দিয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ আরও একটি বিষয় আমার কাছে ভালো লেগেছে, তা হলো হুজুরের দাফন কাজে যারা শরীক হতে চান, তাদেরকে লক্ষ্য করে বারবার মাইক থেকে ঘোষণা করা হয়েছিল, “আমরা যারা হযরতের দাফনকার্যে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক, আমরা যেন জোহরের নামাজ জামাতের সাথে পড়ি। এর কারণে যেন আমাদের জোহরের জামাত না ছুটে।”

হযরতের জানাজার নামাজ পড়তে গিয়ে বারবার উস্তাদে মুহতারাম হযরত মাওলানা আবদুল মালেক হাফি.-এর একটি লেখা মনে পড়ছিল। এবং হুজুরের জানাজায় এর পূর্ণ অনুসরণ দেখেছি। উস্তাদে মুহতারাম লেখেন—
“স্মরণ রাখা দরকার যে, এ বিলম্বকরণ (জানাযা ও দাফন সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সীমাহীন বিলম্ব করা) মাইয়্যেতের প্রতি এক ধরনের জুলুম, যা থেকে জীবিত উত্তরাধিকারীদের বিরত থাকা আবশ্যক। এ ছাড়া বড়দের জানাজা সামনে নিয়ে যে ধরনের বয়ানের রীতি আজকাল শুরু হয়েছে – এটি একটি রেওয়াজমাত্র, রুসমপ্রবণতা ছাড়া এর কোনো শরঈ ভিত্তি নেই। তাই এ থেকেও বিরত থাকা জরুরি।

বিশেষতঃ এমনসব বড় ব্যক্তিত্বগণের ক্ষেত্রে, যারা তাদের জীবদ্দশায় মানুষকে দ্বীন-ঈমান শিখিয়ে গেছেন এবং সুন্নতের পথ দেখিয়ে গেছেন তাঁদের ইন্তিকালের পর সুন্নতপরিপন্থী কোনো কাজ অধিক পীড়াদায়ক।”—(মাসিক আলকাউসার, যিলকদ-যিলহজ্ব ১৪২৮ হি., ডিসেম্বর ২০০৭)

আল্লামা নূরুল হক রহিমাহুল্লাহর ইন্তিকালে কেবল একজন আলেমের বিদায় ঘটেনি; বরং একটি স্নেহময় অভিভাবকত্ব, একটি নির্ভরতার জায়গা এবং ইসলাহী ও দাওয়াতী অঙ্গনের এক দীর্ঘ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। তাঁর স্মৃতি, কর্ম ও আদর্শ ফিতনার এই জমানায় আমাদের জন্য আলোর মশাল হয়ে থাকবে ইনশাআল্লাহ।

পরিশেষে দুআ করি, আল্লাহ তাআলা তাঁর সকল খেদমত কবুল করুন, তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের আ’লা মাকাম নসীব করুন এবং আমাদেরকে তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শের অনুসরণ করার তাওফীক দান করুন।

লেখক: উস্তাযুল হাদীস, জামিয়া ইসলামিয়া দারুল ঈমান চাঁদপুর

আইও/