নবীজি (সা.) প্রতি মাসে কয়টি নফল রোজা রাখতেন?
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ০১:১৯ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

আওয়ার ইসলাম ডেস্ক

পবিত্র মাহে রমজানের রোজা রাখার পাশাপাশি বছরের বিভিন্ন দিনে নফল রোজা রাখতে আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। প্রিয় নবী তাঁর এই আমলের মাধ্যমে উম্মতকে রোজা রাখার গুরুত্ব ও ফজিলত শিক্ষা দিয়েছেন। নবীজি (সা.)-এর রোজার সংখ্যা মাসের তারতম্যে ভিন্ন হলেও নির্দিষ্ট কিছু দিনের রোজা ছিল তার নির্ধারিত আমল। নিচে নবীজি (সা.)-এর রোজার সংক্ষিপ্ত তালিকা দেওয়া হলো—

আইয়ামে বিজ:

রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রায়শই প্রতি মাসের তিনদিন রোজা রাখতেন। এই তিনটি দিন ছিল আইয়ামে বিজ (চাঁদের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ)। এটি ছিল তাঁর নিয়মিত আমল।

হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবীজি (সা.) যখন সফরে যেতেন, তখন বলতেন, ‘প্রতি মাসে তিনদিন রোজা রাখা যেন সারাবছর রোজা রাখার মতো।’ (আবু দাউদ: ২৪৪৯)

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘প্রতি মাসে তিনদিন রোজা রাখা সারাজীবন রোজা রাখার সমান।’ (বুখারি: ১৯৭৯)

সোমবার ও বৃহস্পতিবারের রোজা:

নবীজি (স.) সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখতে পছন্দ করতেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সোমবার ও বৃহস্পতিবার আল্লাহর কাছে আমলসমূহ পেশ করা হয়। তাই আমি চাই আমার আমলগুলো রোজা রাখা অবস্থায় পেশ করা হোক।’ (তিরমিজি: ৭৪৭)

সাধারণত, প্রতি মাসে ৪টি সোমবার ও ৪টি বৃহস্পতিবার থাকে। যদি তিনি এই ৮টি রোজা ছাড়াও আইয়ামে বিজ-এর ৩টি রোজা রাখতেন, তাহলে তাঁর মাসিক রোজার সংখ্যা প্রায় ১১-১২টি হতে পারে।

শাবান মাসের অধিক রোজা:

রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজান ছাড়া অন্য যে মাসে সবচেয়ে বেশি রোজা রাখতেন তা ছিল শাবান মাস। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবীজি (স.) শাবান মাসের মতো এত বেশি রোজা অন্য কোনো মাসে রাখতেন না। তিনি প্রায় পুরো শাবান মাস রোজা রাখতেন।’ (বুখারি: ১৯৭০; মুসলিম: ১১৫৬)

তবে হাদিসের ব্যাখ্যায় বোঝা যায়, তিনি পুরো মাস রোজা রাখতেন না, বরং অধিকাংশ দিন রোজা রাখতেন, যাতে রমজানের রোজা পালনের প্রস্তুতি হয়।

আশুরার রোজা:

মহররম মাসে রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরার রোজা রাখতেন এবং এর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তিনি বিশেষভাবে ১০ মহররমের রোজা রাখার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। এই রোজা ছিল ইহুদিদেরও আমল, কিন্তু এর গুরুত্ব ইসলামে আরও বাড়ایا (বাড়িয়ে) দেওয়া হয়। (লেখার সুবিধার্থে 'বাড়িয়ে' বানানটি ঠিক করা হয়েছে)

ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় এসে দেখলেন ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা রাখে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটি কোন দিন যে তোমরা রোজা রাখো?’ তারা বলল, ‘এটি এক মহান দিন, যেদিন আল্লাহ মুসা (আ.) ও তাঁর কওমকে ফেরাউনের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন এবং ফেরাউনকে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। তাই মুসা (আ.) শুকরিয়াস্বরূপ (শুকরিয়াস্বরূপ) এই দিনে রোজা রেখেছিলেন।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘মুসার (আ.) ক্ষেত্রে তোমাদের চেয়ে আমাদের অধিকার বেশি।’ অতঃপর তিনি নিজেও রোজা রাখলেন এবং রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন।’ (বুখারি: ৩৩৯৭)

৯ই বা ১১ই মহররমের রোজা: পরবর্তীতে নবীজি (স.) আশুরার রোজার সাথে আরও একদিন রোজা রাখার কথা বলেন, যাতে ইহুদিদের সাথে পার্থক্য হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি আমি আগামী বছর জীবিত থাকি, তবে অবশ্যই ৯ই মহররম রোজা রাখব।’ (মুসলিম: ১৯৪৬)
এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ১০ই মহররমের সাথে ৯ তারিখ অথবা ১১ তারিখেও রোজা রাখা।

সারা বছর রোজা না রাখার কারণ

রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রায় সারাবছর রোজা রাখলেও, তিনি কখনো লাগাতার রোজা রাখতেন না। কারণ, তিনি উম্মতের জন্য সহজীকরণ চেয়েছিলেন এবং চাইতেন না যে রোজা রাখা তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়, যা ফরজ ইবাদতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

সংক্ষেপে বলা যায়, নবীজি (সা.) প্রতি মাসে সুনির্দিষ্টভাবে কতটি রোজা রাখতেন তার কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই, যা প্রতি মাসের জন্য কঠোরভাবে নির্ধারিত ছিল। তবে তাঁর নিয়মিত আমল ছিল প্রতি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ (আইয়ামে বিজ) এবং সোমবার ও বৃহস্পতিবারের রোজা। এছাড়া, শাবান মাসে তিনি অধিক পরিমাণে রোজা রাখতেন এবং মহররম মাসের আশুরার দিনেও রোজা রাখতেন। তাঁর রোজা রাখার উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর নৈকট্য অর্জন এবং উম্মতের জন্য আদর্শ স্থাপন করা, যাতে তারা নফল রোজার ফজিলত সম্পর্কে জানতে পারে। তাঁর সাহাবিরাও এই পথে চলে দ্বীনের প্রতি নিজেদের আনুগত্য প্রকাশ করেছেন।

আইও/