
|
ফিরে দেখা ১ ডিসেম্বর ২০১৮, কী ঘটেছিল সেদিন
প্রকাশ:
০১ ডিসেম্বর, ২০২৫, ০২:৫০ দুপুর
নিউজ ডেস্ক |
মাসউদুয যামান শহীদ ১ ডিসেম্বর ২০১৮। মনে পড়ে যায় টঙ্গীর ইজতিমা ময়দানের সেই লোমহর্ষক কাহিনী, সেই দুঃসহ দুপুর। নিরীহ নিরস্ত্র উলামা-তালাবা ও দ্বীনদার মানুষের উপর একটি বিপথগামী দলের প্রচ- আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ার সেই রক্তাক্ত উপাখ্যান; যা রক্ত ঝরিয়েছে, অশ্রু ঝরিয়েছে। আহত করেছে শরীর, আর ক্ষতবিক্ষত করেছে হৃদয়। যেমন ক্ষতিগ্রস্ত করেছে দাওয়াত ও তাবলীগের এই মুবারক মেহনতকে! যে দর্শন মানুষকে এমন হিং¯্র পশু করে তোলে তা কী করে দ্বীন ও দাওয়াত হয়?!... হঠাৎ বেঁধে যাওয়া কোনো সংঘর্ষ নয়, ছিল পূর্ব পরিকল্পিত আক্রমণ! আহতদের তালিকায় উলামা-তলাবারাই শীর্ষে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, মাদরাসা ছাত্র দেখামাত্র তারা ঝাঁপিয়ে পড়ত। তাই সেখানে উপস্থিত উলামা-তলাবাদের মধ্যে এমন কমই আছেন, যারা সেদিন গুরুতর জখমের শিকার হননি। মাদরাসাগুলো সেদিন পরিণত হয়েছিল হাসপাতালে কারণ আহতদের ভিড় ছিল এতই বেশি যে, হাসপাতালের বেডগুলোতে তাদের সংকুলান হয়নি। আর আঘাতও যে করা হয়েছে কত রকমে, কত পর্যায়ে এবং কী সাংঘাতিক ও ভয়ানকভাবে- ভাবলেই গা কাঁটা দিয়ে ওঠে এবং ভিতরে একটা আতঙ্কবোধ জেগে ওঠে, এরা তাহলে কারা? একটি দ্বীনী জামাতের ভিতরে লুকিয়ে থাকা এরা কি বেশধারী অন্য কেউ নিজেদের স্বগোত্রীয় ও সহযাত্রীদের এমনভাবে মেরে জখম করতে পারে?... তাদের ঐ আঘাতে উপস্থিত মাদরাসা ছাত্রদের কারো মাথা ফেটেছে, কারো হাত ভেঙ্গেছে, কব্জি ভেঙ্গেছে, মূল থেকে বাহু বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে... কারো ভেঙ্গেছে পা, কারো বা গুড়িয়ে গেছে হাঁটুর বাটি, ছিঁড়েছে ঠোঁট, পায়ের রগ, থেতলে গেছে হাত ও পায়ের আঙ্গুল... কারো বা মারাত্মক জখম হয়েছে গাল, মাথার অংশ, কারো বা চোখ... আর রক্তে ভিজে গেছে গায়ের সমস্ত জামা-কাপড়, যেমন রক্তাক্ত হয়েছে ইজতিমার বিশাল মাঠ! এসব আক্রান্ত সাথীদের জখম ও যন্ত্রণা-কাতরতার কিছু বিবরণ রয়েছে কাছাকাছি সময়ে প্রকাশিত বিভিন্ন বইয়ে ও প্রবন্ধ নিবন্ধে এবং প্রচারিত লিফলেটে। অনেক মাদরাসা তাদের আহত ছাত্রদের নাম ও জখমের বিবরণ নথিভুক্ত করেছে। কিছু তথ্য আমাদের কাছেও সংরক্ষিত আছে। সেটার সূত্র এই যে, ঘটনার মাসখানেকের মধ্যে আমাদের তালিবে ইলম ভাইদের একটি জামাত বেশ কয়েকটি মাদরাসার আহত ছাত্র-শিক্ষকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন, তাদের মুখ থেকেই তাদের চোখে দেখা ঘটনার বিবরণ শুনতে। এছাড়াও তারা ফোনে আলাপ করেছেন আক্রান্ত অনেকের সাথে। অনেকে নিজের বৃত্তান্তও লিখে পাঠিয়েছেন তাদের কাছে। এসব সাক্ষাৎকার ও ফোনালাপ আহতদের আর্তচিৎকার ও তাজা রক্তের ঘ্রাণসহ সেদিনের পুরো দৃশ্য চোখের সামনে মূর্ত করে তোলে। কী কাজের জন্যে তারা মাঠে অবস্থান করছিলেন, ময়দানের সময়গুলো কীভাবে কাটছিল, কখন থেকে তারা আঁচ করতে পারেন- একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে, এরপর কখন কীভাবে হামলাকারী সেই বিপথগামী মানুষগুলো ইজতিমা ময়দানের বিভিন্ন পয়েন্টে, বিশেষত বাটা গেইটের সামনে জড়ো হতে থাকে এবং কী কৌশলে পুলিশের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে হামলার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তারপর কী ভয়ানক রক্তপাত ও তাণ্ডবলীলা চলে ইজতিমা ময়দানজুড়ে সবকিছুরই বিবরণ তারা দিয়েছেন বেদনা ভারাক্রান্ত কণ্ঠে। তাদের সেই বিবরণের নির্বাচিত কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি পাঠকের জন্য, বিভিন্ন উপশিরোনামে, যেন পাঠক নিজেই চাক্ষুস অবলোকন করেন- কেন, কী উদ্দেশ্যে ছিল এই হামলা, কারা ছিল এর নিশানা এবং কত নিষ্ঠুর ও বর্বরোচিত ছিল সেই নির্যাতন, আর কেমন ‘সুসজ্জিত’ ও সংঘবদ্ধ ছিল আক্রমণকারী দল...। আক্রমণের পূর্বাভাস আরজাবাদ মাদরাসার এক বিশিষ্ট মুদাররিস আমাদের জানান, আক্রমণের আগের দিনগুলোতে ময়দানে কী তারতীব চলছিল। তিনি বলেন, ‘মশওয়ারাক্রমে ২২ নভেম্বর থেকে ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য জোড়ের আগ পর্যন্ত ময়দানের হেফাজত ও অপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করার জন্য ঢাকার আটটি শবগুযারী পয়েন্টের মধ্যে যিম্মাদারি ভাগ করে দেওয়া হয়। দু’দিন করে একেকটি পয়েন্টের তারতীব ছিল। সে অনুসারে আমাদের যিম্মাদারি ছিল ২৮ ও ২৯ তারিখ বুধ ও বৃহস্পতিবার। আমাদের মাদরাসার জালালাইন থেকে ইফতা পর্যন্ত দুই শতাধিক ছাত্র ময়দানে উপস্থিত হয়। মিরপুর শবগুযারী পয়েন্টের যিম্মাদারি ছিল বাটা গেইটে। বাটা গেইটের আশেপাশে শামিয়ানা টাঙ্গিয়ে, তাঁবু খাটিয়ে মিরপুরের হালকাগুলো অবস্থান গ্রহণ করে বাটা গেইটের অদূরে যে টিনশেড মসজিদ সেখানে ধারাবাহিকভাবে আমল চলত। এভাবেই আমাদের সময়গুলো ময়দান প্রস্তুতির কাজ ও বিভিন্ন আমলের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হতে থাকে। বৃহস্পতিবার শবগুযারি পয়েন্টের কাছে মুরুব্বীদের যে মশওয়ারার কামরা রয়েছে সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, দু’দিন যথেষ্ট নয়। কাজেই শুক্রবারটা থেকে শনিবার সকালেই সবাই যাবে। কিন্তু পরামর্শ মোতাবেক যথাযথ আমল হয়নি, অনেকে শুক্রবার সকালে চলে গিয়েছে। আবার সন্ধ্যায় ও রাতেও অনেকে চলে যায়। শুক্রবার দিবাগত রাতের পাহারায় আমরা প্রায় সাত-আটশ আলিম-তালিবে ইলম উপস্থিত ছিলাম বাইরে থেকে আমরা সংবাদ পাচ্ছিলাম, ‘সাথী কমে এলে ওরা ভিতরে প্রবেশ করবে।’ কখন থেকে গেইটের পাহারা জোরদার করা হয় সে কথা জানিয়েছেন মিরপুর জামেউল উলূম মাদরাসার এক শিক্ষক : “অন্যান্য বছরের তুলনায় এবারে ইজতিমার প্রস্তুতি এখনও পর্যন্ত অনেক কম হওয়ায় হালকা থেকে আমাদের কাছে জোর তাকাযা পেশ করা হয়, যেন বেশি পরিমাণে ছাত্র একটু বেশি সময় নিয়ে কাজে অংশগ্রহণ করে। সে হিসেবে আমাদের ৫৫০ জন ছাত্র ও ১৮ জন উস্তায ইজতিমার কাজে অংশ নেন। প্রথমে যখন বুধবার আমরা মাঠে যাই তখন অনেকটা শান্তিপূর্ণভাবে ইজতিমার কাজ করি। আমাদের সাথে তাবলীগের অন্যান্য সাথী ভাইয়েরাও সেখানে কাজ করেন বৃহস্পতিবার আমরা জানতে পারি যে, সরকারের নিষেধাজ্ঞার পরও জোড়ের নামে সা‘দপন্থী এতাআতীরা দলে দলে ইজতিমার মাঠের আশেপাশে বিভিন্ন মসজিদে অবস্থান করছে। তখন ভিতরের লোকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে গেইটে পাহারার ব্যবস্থা করা হয়। যাতে তারা ভিতরে ঢুকে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটাতে পারে।” হামলাকারীরা কীভাবে সংগঠিত হচ্ছে তার আগাম সংবাদ পেয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা মারকাযের এক মুকীম সাথী তিনি বলেন : “ওরা দু’দিন আগে থেকেই জেলায় জেলায় গিয়ে সা‘দপন্থীদের তাশকিল করেছে যে, ত্রিশ তারিখের মধ্যে টঙ্গীর ময়দানে ওদের জোড় হবে। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই সে জোড় নিষেধ করে দিয়েছেন। আগের দিন রাতে একটা ম্যাসেজ পেলাম : ‘টঙ্গীর ময়দানকে ওরা পূর্ব-পশ্চিমে মোট ছয়-সাত হালকায় ভাগ করেছে। যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, তারপর কাকরাইল, ডেমরা, কেরাণীগঞ্জ ও সাভার। এভাবে ভাগ করে বিভিন্ন জেলাকে তাদের আন্ডারে দিয়ে ওরা কীভাবে অবস্থান করবে সেটা ঠিক করে দিয়েছে।” ঐ দিন সকালে জামিউল উলূমের ঐ শিক্ষক বলেন, “শনিবার ফজরের নামাযের সময় বাইরে তাদের শোরগোল শোনা যাচ্ছিল। কখনো তাকবীরের আওয়াজও শোনা যাচ্ছিল। বোঝা-ই যাচ্ছিল, তারা বিপুল সংখ্যায় সমবেত হচ্ছে। আমাদের ছাত্ররা নামায থেকে ফারেগ হয়ে বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নেয়। বেলা যত বাড়তে থাকে ওদের সংখ্যাও বাড়তে থাকে।” নারায়ণগঞ্জের মুকীম সাথী বলেন, “সকাল যখন ছয়টা বা সাড়ে ছয়টা, আমি তখন মটরসাইকেল নিয়ে প্রত্যেক পয়েন্টের গেইটগুলোতে একটা চক্কর দিলাম। বাইরের দিক থেকে ওদের শত শত লোক গেটগুলোতে আছে। আমরা বারবার প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলাম। তারা বলল, ‘এগারোটার ভিতরেই ওনাদেরকে আমরা গেইট থেকে সরিয়ে দেব’।” আরজাবাদ মাদরাসার ঐ মুদাররিসের বর্ণনায় রয়েছে আরো তথ্য : “সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে আমরা দেখতে পেলাম, একটা বাস এসে বাটা গেইটের সামনে থামে। বাস থেকে অনেক লোক নেমে আসে। তখন থেকেই আমরা খুব সতর্ক হয়ে গেলাম যে, এখন থেকে আর কোনো সাথীকে প্রবেশ করতে বা বের হতে দেয়া যাবে না। এরপর থেকে একের পর এক বাস আসতে থাকে এবং অসংখ্য লোক ‘আশরাফ সেতু কমপ্লেক্সের সামনে জমায়েত হতে থাকে। একসময় হাজার হাজার মানুষ হয়ে যায়। এরপর দেখতে পেলাম, হ্যান্ডমাইকে ডেকে ডেকে একেক দলকে একেক দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কেউ কাপড়ের নিশানা বানিয়ে লোকদের নেতৃত্ব দিয়ে অন্য কোনো দিকে নিয়ে চলে যাচ্ছে। তখন হ্যান্ডমাইকে বলতে শুনলাম, যাদেরকে যেই পজিশন দেয়া হয়েছে তারা নিজ নিজ স্পটে গিয়ে সেখানে অবস্থান গ্রহণ করি। হঠাৎ দেখতে পেলাম, অসংখ্য লোক, যারা দাঁড়িয়ে ছিল- আমাদের বাটা গেইটের সামনে এসে বসে পড়ছে। আরেক বিশাল দল টঙ্গী বাসস্ট্যান্ড হয়ে কামারপাড়ার দিকে চলে যাচ্ছে...।” টঙ্গী রেললাইন সংলগ্ন জামেয়া নেসারিয়ার এক ছাত্র জানান “শনিবার বাদ ফযর এতাআতীরা যখন বিভিন্ন গেইটের কাছে অবস্থান নেয়া শুরু করে তখন আমরা শবগুজারী পয়েন্টের পাশের গেটে অবস্থান করছিলাম। তারা গেটের ওপাশে হ্যান্ড মাইকে বিভিন্ন বয়ান করে যাচ্ছিল। তারা সাহাবায়ে কেরামের উদ্ধৃতি দিয়ে জিহাদ বিষয়ক এবং জিহাদের ফযিলত সম্পর্কিত নানা ঘটনা শুনাচ্ছিল”। হামলার পূর্বমুহূর্ত মুকীম সাথী বলেন, ‘পৌনে এগারটার দিকে অনেক পয়েন্ট থেকে আমাদের কাছে প্রশ্ন আসতে থাকে যে,পুলিশ তো অনেক গেইটেই নেই? তখন আমার অনেক ভয় হল। পুলিশ বলল, এগারোটার মধ্যে সরিয়ে দেবে, কিন্তু এখন দেখি পুলিশই সরে গেছে!’ হামলার পূর্বমুহূর্তটাতে বাইরের চাঞ্চল্য ও ভিতরের নির্জীবতার বিবরণ দিয়ে আরজাবাদের মুদাররিস বলেন, এতাআতীরা দু তিন দিন ধরে বাইরে শক্তি সঞ্চয় করেছে। অপর দিকে আমরা সারাদিন ময়দানে কাজ করে ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। আমাদের মধ্যে একটা নির্জীব ভাব চলে এসেছিল। সন্ধ্যার পর কতক্ষণ আর ঘুম হয়েছে। এগারোটার সময় সবাইকে জাগিয়ে দেওয়া হয়। রাত বারোটা থেকে ছয়টা পর্যন্ত আমাদের পাহারা ছিল। এখন ছিল যিম্মাদারি পরিবর্তনের সময়। আরেকটা গ্রুপ আসার কথা ছিল। কিন্তু আমরাই এখন এই গেইটের যিম্মাদার হয়ে গেলাম। আর কেউ নেই...। ওদিকে তাদের চাঞ্চল্য ছিল দেখার মতো। বারবার ওরা হ্যান্ড মাইকে ‘তালিবে ইলম ভাইয়েরা তোমরা চলে যাও। তোমাদের জন্য কামারপাড়া গেট খোলা রেখেছি’ ইত্যাদি প্রচার করে যাচ্ছিল। ওরা ওপর দিয়ে বারবার দেখছিল যে, আমরা সংখ্যায় কমে গেছি। কথা ছিল, সামনের দিকে সাধারণ তাবলীগী ভাইয়েরা থাকবেন। তখন তাদের অনেকের মাঝে অনীহাভাব, উদাসীনতা, অনুপস্থিতি আমরা লক্ষ্য করি। এছাড়া যারা ছিলেন তাদের মধ্যে আবার অধিকাংশই বৃদ্ধ!... আমরা খুবই পেরেশান ছিলাম। সেই রাত থেকে এখন পর্যন্ত না খাওয়া। সবাই ছিলাম ক্লান্ত। হঠাৎ করে সোয়া এগারটার দিকে উত্তেজিত হয়ে শ্লোগান দিয়ে ওপাশ থেকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়।” ওদের প্রস্তুতি ও কৌশল আরজাবাদের মুদাররিস বলেন, “আমাদের দেখা ও তথ্য অনুসারে গেইট ভেঙ্গে প্রবেশের সময় তাদের হাতে কোনো লাঠি ছিল না। কিন্তু বেশিরভাগ লোকের পেছনে ব্যাগ ঝোলানো ছিল। পরে বিশ্বস্তসূত্রে আমরা জানতে পারি, এদের ব্যাগে ছোট ছোট রড ছিল, যা এক হাত লম্বা করে কাটা। আরো ছিল ইট-সুরকি। আর ফজরের পরপরই ইট বোঝাই একটা ট্রাক এসে বাটা গেইটের সামনে থামে। ট্রাকের উপরে ইটের আধলার মতো ছিল। একটু চিন্তিত হলাম, এখানে তো কোনো নির্মাণ কাজ হচ্ছে না। তাহলে এত সকালে ইটের ট্রাক এখানে কেন? কিছুক্ষণ পর ইটবোঝাই সেই ট্রাকটি কোথায় যেন চলে যায়?!” জামিয়া মুহাম্মাদিয়া আহমদ নগর মিরপুর-১-এর ইফতা বিভাগের এক ছাত্র জানান : “রাত থেকেই এতাআতীদের উপস্থিতি শুরু হয়েছিল। দশ-বারো জন করে করে জামাত। আমরা খুব আতঙ্কে ছিলাম। আমাদের কোনো কোনো যিম্মাদার, মাথায় টুপি, গায়ে জুব্বা, গেইটের বাইরের লোকদের উপস্থিতি যত বাড়ছে তারা যেন তত উৎফুল্ল। কিছুক্ষণ পরপর মোটরসাইকেলে করে আমাদের কাছে আসছেন। আর আমাদের গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। উপদেশ দিচ্ছেন, “হাতে লাঠি রাখা যাবে না, তাহলে পত্রিকায় ছবি চলে আসবে, এতে আমাদের দুর্নাম হবে। আমরা মারামারি করতে আসিনি, সবাই শান্ত থাকেন, দুয়া-ইস্তেগফার পড়তে থাকেন” ইত্যাদি। কিন্তু কে জানত সুন্দর হাসিমাখা চেহারার লোকগুলোই ছিল জালিমদের এজেন্ট!... কিছুক্ষণ পর একজন এসে বললেন, ওরা বলাবলি করছে, ‘আমাদের সাথে নাকি তাবলীগে সময় লাগানো সাথী নেই। সবাই নাকি ছাত্র। তো আপনারা পিছে যান। মুরব্বীদেরকে গেইটের কাছে দিন। ওরা দেখুক!’ তাদের কথামতো আমরা একটু পিছনে সরে এলাম। এরপরপরই ওরা বাইরে থেকে পাথর মারা শুরু করল। আমরা আত্মরক্ষার জন্য পাহারার লাঠি হাতে নিতে চাইলাম। কিন্তু আমীর সাহেবরা বললেন যে, “না, আমরা আল্লাহ্র উপর ভরসা করি”। তখন দেখলাম, সামনের লোকগুলোও আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে। আর গেইটে হৈ চৈটা ক্রমেই বাড়ছে। প্রথমে তাদের কিছু লোক ছোট গেইটটা ভেঙ্গে ভিতরে ঢুকে ছাত্রদের মারতে শুরু করল। এমন সময় দেখি, ভিতরের এই ‘যিম্মাদাররাও’ আমাদেরকে মারতে শুরু করেছে! আমরা আস্তে আস্তে পিছাতে থাকি। এরপর ওরা বড় গেইটটা কীভাবে ভেঙে ফেলল বুঝতেও পারলাম না। জামেউল উলূমের ঐ শিক্ষক বলেছেন, কী করে সহজে ভাঙ্গা সম্ভব হল বাটা গেইটটা : “এদিকে ভিতরে অনেক লোক ছাত্রদেরকে দুআ-ইস্তেগফারের তালকীন করতে থাকে। তাদেরকে গেইটের উল্টোদিকে মুখ করিয়ে সারিবদ্ধভাবে দুআয় লিপ্ত করে দেয়। যারা গেইটের কাছে ছিল তাদেরকে বলে, নিরাপদ দূরত্বে চলে যান। এরপর পৌনে এগারটা কি এগারটার দিকে ওপাশ থেকে একযোগে গেইট ভেঙ্গে ফেলে। গেইটের হুকগুলো ছিল দুর্বল। আমি একবার বলেছিলামও। কিন্তু রাতারাতি ঠিক করার কোনো ব্যবস্থা ছিল না।” হামলা শুরু হওয়ার পর আরজাবাদের ঐ মুদাররিস বলেন, “বাটা গেইট ইজতিমা ময়দানের সবচে মজবুত গেইট মনে করা হয়। যদিও তা কিছুটা দুর্বল ছিল। এই বাটা গেইটটা ধরে শতশত মানুষ ঝাঁকাতে লাগল। একপর্যায়ে তারা গেইট ভেঙ্গে পঙ্গপালের ন্যায় ছুটে আসতে থাকে। পড়ে থাকা লাঠিগুলো নিয়ে নেয়। আর তাদের সাথে তো যা ছিল ছিলই। তারা দশজন দশজন করে দলবদ্ধ ছিল। তাদের অনেকে বিশেষ চিহ্ন ধারণ করেছিল। একশ জনের একজন করে যিম্মাদার ছিল। এভাবে তারা খুবই সংঘবদ্ধ হয়ে আক্রমণ চালায়। হামলার আকস্মিকতা কীভাবে সবাইকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়, সে বিবরণ এসেছে জামেউল উলূমের মেশকাত জামাতের এক ছাত্রের যবানীতে : পৌনে এগারটার দিকে বাটা গেইট ভেঙ্গে সাদপন্থী এতাআতীরা যখন ভিতরে ঢোকে তখন তা |