যুদ্ধের প্রভাবে বাড়ছে রাজস্ব ঘাটতির শঙ্কা
প্রকাশ: ২৯ মার্চ, ২০২৬, ১০:৪৩ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাবে দেশের অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগে স্থবিরতা থাকায় রাজস্ব আদায় আগেই দুর্বল ছিল, এর মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই সংকটকে আরও গভীর করেছে। ইতোমধ্যে রাজস্ব ঘাটতি ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টগণ।

ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জ্বালানি সংকট, আমদানি-রফতানিতে বিঘ্ন এবং ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে গতি কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রাজস্ব আদায়ে।

বাংলাদেশের নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, দেশের শিল্প খাত অনেকাংশেই আমদানিনির্ভর। যুদ্ধের কারণে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সময়মতো আমদানি করা যাচ্ছে না, আবার রফতানিতেও বিলম্ব হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সংকট।

তিনি বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগে ইতিবাচক সাড়া মিললেও যুদ্ধ পরিস্থিতি থামিয়ে দিয়েছে সে ‍উদ্যোগ। তিনি আরও বলেন, 'একজন বিনিয়োগকারী পুঁজি ফেরতের নিশ্চয়তা চান। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই নিশ্চয়তা নেই, বরং লোকসানের ঝুঁকি বেশি।'

রাজস্ব খাত বিশ্লেষক ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ জানান, বিনিয়োগ স্থবির থাকলে রাজস্ব আদায় স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। ইতোমধ্যে জ্বালানি সংকট ও কাঁচামালের ঘাটতির কারণে ব্যাহত হচ্ছে শিল্প উৎপাদন।

তার মতে, 'এ অবস্থায় আয়কর, ভ্যাট কিংবা আমদানি শুল্ক—কোনোটিই লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আদায় সম্ভব হবে না। ফলে রাজস্ব ঘাটতি আরও বাড়বে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।'

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা।

খাতভিত্তিক হিসাবে—

* আয়কর খাতে ঘাটতি: ৩৩ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা।

* আমদানি শুল্কে ঘাটতি: ১৭ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা।

* ভ্যাট (মূসক) খাতে ঘাটতি: প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ‘সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ’-এর বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অর্থবছরের বাকি চার মাসে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে হবে, যা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। তার মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই লক্ষ্য অর্জন আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতি দুর্বল অবস্থায় ছিল। ব্যাংক খাত, শেয়ারবাজার ও কর-জিডিপি অনুপাত—সবই চাপের মধ্যে রয়েছে। এর সঙ্গে যুদ্ধের প্রভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

অন্যদিকে এনবিআর চেয়ারম্যান ড. আবদুর রহমান খান বলেন, কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন রাজস্ব আদায় বাড়াতে, তবে যুদ্ধের প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর মনে করেন, অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে হলে বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। তিনি বলেন, 'বিনিয়োগ বাড়লে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়বে, তাতে রাজস্ব আয়ও বাড়বে।'

তিনি আরও জানান, সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে কাজ করছে।

 

জেএম/