বাড়ছে পড়ুয়া সংখ্যা, কর্মসংস্থান নিয়ে কী ভাবছে কওমি কর্তৃপক্ষ?
প্রকাশ: ২৯ মার্চ, ২০২৬, ১২:৩৩ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

জহির উদ্দিন বাবর

কওমি মাদরাসাগুলোতে প্রতি বছরই ছাত্রছাত্রী সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। গত কয়েক বছর ধরেই এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নানা কারণে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের মাদরাসায় পাঠাচ্ছে। ইসলামি ও নৈতিক শিক্ষার প্রসারে এই প্রবণতা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। আদর্শ জাতি গঠনে মাদরাসাপড়ুয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে-এমনটা জোরালোভাবে আশা করা যায়। তবে দিন দিন শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও তাদের কর্মসংস্থান নিয়ে তেমন কোনো ভাবনা নেই সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। ফলে কওমিপড়ুয়ার সংখ্যা বাড়তে থাকাটা অনেকটা উদ্বেগেরও কারণ। তাদের জন্য পরিকল্পিত ও উপযুক্ত কর্মক্ষেত্র ব্যবস্থা না করলে আশানুরূপ সুফল মিলবে না বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

দীর্ঘদিন কওমি মাদরাসা শিক্ষার সরকারি কোনো স্বীকৃতি ছিল না। এখানে যারা পড়াশোনা করতেন, সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা মিলবে না সেটা মেনে নিয়েই আসতেন। ২০১৮ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রি দাওরায়ে হাদিসের সনদকে মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে এই স্বীকৃতি শুধু ঘোষণা পর্যন্তই, বাস্তবে এর তেমন কোনো কার্যকারিতা নেই। এই স্বীকৃতির ফলে কওমিপড়ুয়াদের উল্লেখ করার মতো কোনো সুবিধা বা সুফল মিলেনি। নিছক আত্মতৃপ্তি ছাড়া এই স্বীকৃতির কোনোই মূল্য নেই। মূলত সরকার শুধু দাওরায়ে হাদিসকে স্বীকৃতি দিয়েছে, অন্য স্তরগুলোর কোনো স্বীকৃতি নেই। ফলে সরকারি সুযোগ-সুবিধার বিবেচনায় তারা হিসাবেই আসেন না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বাকি স্তরগুলোর একটি স্বীকৃতি প্রদানের আলোচনা শুরু হলেও কওমি কর্তৃপক্ষের অনীহার কারণে সেটা আর বেশিদূর এগোয়নি।

কওমি মাদরাসায় যারা পড়াশোনা করেন তাদের প্রধানত কর্মক্ষেত্র দুটি। একটি হলো কোনো মাদরাসার শিক্ষক হওয়া। অন্যটি কোনো মসজিদের ইমাম-খতিব বা মুয়াজ্জিন পদ। এর বাইরে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় অনেকে আলিয়া মাদরাসায় পরীক্ষা দিয়ে কিংবা সাধারণ ও কারিগরি সার্টিফিকেট অর্জন করে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হন। তবে মসজিদ-মাদরাসার বাইরে কর্মক্ষেত্র বেছে নেওয়া কওমি শিক্ষার্থীদের হার ১০ শতাংশও না। বাকি ৯০ শতাংশই মসজিদ-মাদরাসামুখী। দেশের লাখ লাখ মসজিদ এবং হাজার হাজার মাদরাসা টিকিয়ে রাখতে হলে উপযুক্ত লোকের নিঃসন্দেহে প্রয়োজন আছে। কওমি মাদরাসাপড়ুয়াদের একটি অংশ এই খেদমতে নিয়োজিত হওয়া সময়ের দাবি। কিন্তু শতকরা ৯০ শতাংশই মসজিদ-মাদরাসাকে কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেওয়া কতটা উপযোগী? প্রতি বছর প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থী দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন। সেই তুলনায় মসজিদ-মাদরাসার সংখ্যা কি বাড়ছে? তাহলে এই জনগোষ্ঠীর উপযুক্ত কর্মসংস্থান কোথায় হবে? এটা নিয়ে কি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো ভাবনা আছে? না ভাবলে কেন তারা ভাবছেন না? এটা কি তাদের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত নয়?

যতটুকু জানি, কওমি মাদরাসায় পড়ুয়াদের কর্মসংস্থানের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের তেমন কোনো ভাবনা নেই। সর্বোচ্চ অথরিটি আল-হাইয়্যাতুল উলয়া লিলজামিয়াতিল কওমিয়া কিংবা সর্ববৃহৎ বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া কেউই এ ব্যাপারে চিন্তা করে না। ফলে কওমিপড়ুয়াদের সিংহভাগই নিজেদের প্রচেষ্টায় মসজিদ, মাদরাসা কিংবা কোথাও নিজেদের কর্মসংস্থান বেছে নিচ্ছেন। বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপনের মতো পেশায় নিয়োজিত হতে পারছেন খুব কমই। গত পাঁচ দশ বছরের মধ্যে ফারেগ হওয়া একটি বড় অংশের চোখে-মুখে হতাশার ছাপ লক্ষ্য করেছি। তাদের অভিযোগ, মুরব্বিরা তাদের কর্মসংস্থানের ব্যাপারে কিছুই ভাবেন না। কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে জোরালোভাবে ভাবলে তারা নিজেরা না হোক, আগামীতে যারা ফারেগ হবেন তাদের অন্তত উপকারে আসবে বলে মনে করেন তরুণ আলেমরা।

তবে কর্মসংস্থান নিয়ে তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ, খেদ কিংবা হতাশা থাকলেও কওমি কর্তৃপক্ষ তথা মুরব্বিদের মধ্যে রয়েছে তৃপ্তিবোধ। তাদের একটা বড় অংশ মনে করেন, মাদরাসায় পড়াশোনা করে অন্য কর্মক্ষেত্র বেছে নিলে বিচ্যুত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এজন্য মাদরাসায় পড়াশোনা করে মসজিদ-মাদরাসার গণ্ডিতে থাকাই নিরাপদ। যদিও কওমি মুরব্বিদের অনেকেই সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবনযাপন করেন। তারা নিজেদের ওপর বিবেচনা করে মনে করেন, কওমি মাদরাসায় পড়লে সবার জীবনযাপনই এমন স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ হবে। যদিও বাস্তবতা ভিন্ন। বর্তমান ঊর্ধ্বমূল্যের বাজার পরিস্থিতিতে মসজিদ-মাদরাসার কর্মক্ষেত্রের সীমিত ইনকামে ন্যূনতম প্রয়োজন পূরণ করাও কঠিন।

কওমি মাদরাসায় পড়াশোনা করে কর্মক্ষেত্র হিসেবে যারা মসজিদ মাদরাসাকে বেছে নিয়েছেন, তাদের বড় অংশটিই জীবন ধারণের ন্যূনতম উপকরণ যোগানে হিমশিম খাচ্ছেন। অনেকটা বাধ্য হয়ে তারা এই জীবনধারায় অভ্যস্ত হয়ে গেলেও তাদের সন্তানাদি কিংবা পরবর্তী প্রজন্ম এটাকে মেনে নিতে পারছে না। অসম প্রতিযোগিতার এই সমাজে কওমি মাদরাসাপড়ুয়ারা নিজেদের আয় এবং ব্যয়ের বাস্তবতার মধ্যে কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছেন না। এতে তাদের মধ্যে প্রায়ই হতাশার উদ্রেক হচ্ছে। কেউ সেটা প্রকাশ করছেন, কেউ নানা ভাবনা থেকে সেটা প্রকাশ করছেন না। যেহেতু আল্লাহকে রাজি-খুশি করাই এই শিক্ষার উদ্দেশ্য, এজন্য আলেমদের একটি বড় অংশ সবর, তাওয়াক্কুল ও অল্পেতুষ্টির জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। তারা আর বিকল্প কিছু ভাবছেন না। কিন্তু অতি সম্প্রতি যারা পড়াশোনা সম্পন্ন করছেন, যারা মাত্র কর্মক্ষেত্রে পা রেখেছেন কিংবা রাখতে যাবেন তাদের অনেকের মধ্যে হতাশা প্রবল আকার ধারণ করছে। এটা সমাজের রূঢ় বাস্তবতা। অন্ধ হলেই যেমন প্রলয় বন্ধ থাকে না, তেমনি এই হতাশাজনক অবস্থা দিন দিন আরও প্রকট হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তরুণ আলেমদের কর্মসংস্থানের ব্যাপারে ভাবার কোনো বিকল্প নেই।

প্রশ্ন আসতে পারে, কওমি কর্তৃপক্ষ ফারেগিনদের কর্মসংস্থান নিয়ে ভাবনার জায়গা কোথায়? মসজিদ ও মাদরাসার বাইরে তো তাদের কোনো কর্তৃত্ব নেই। হ্যাঁ, এটা সত্য। তবে তারা চাইলে এবং আন্তরিক হলে অনেক বিকল্প বের করা সম্ভব। প্রথমত, কওমি মাদরাসা সনদের সরকারি স্বীকৃতি কার্যকরে তাদের সক্রিয় হতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে হাইয়্যাতুল উলয়ার একটি প্রতিনিধি দল সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে বৈঠক করে কওমিপড়ুয়াদের কর্মসংস্থানের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশ দিয়েছে। সেটার ফলোআপ তাদেরই করতে হবে। বর্তমানে ক্ষমতায় বিএনপি সরকার। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে কওমি সনদের সরকারি স্বীকৃতি ও এর কার্যকারিতার কথা রয়েছে। সরকার যখন ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছে তখন এ ব্যাপারেও তাদের ওপর চাপ দেওয়া যায়। যেহেতু কওমি সনদের প্রথম স্বীকৃতি বিএনপি সরকারই ঘোষণা করেছিল, সে হিসেবে আশা করা যায় এই সনদের যথাযথ কার্যকারিতা তারাই বাস্তবায়ন করবে। তবে এর জন্য কওমি কর্তৃপক্ষকেই আন্তরিক হয়ে দাবিটুকু আদায় করে নিতে হবে।

নতুন শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, নয় হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে। এই পদে নিয়োগের জন্য কওমিপড়ুয়ারা একদম পারফেক্ট হতে পারেন। কিন্তু এর জন্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে দাবি আদায় করতে হবে কওমি কর্তৃপক্ষকেই। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ধর্ম ও আইন মন্ত্রণালয়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে কওমি সনদকে মূল্যায়নের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। সেটা বাস্তবায়ন করলেও হাজার হাজার কওমি তরুণের চাকরির ব্যবস্থা হতে পারে। বিশেষ করে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজী পদে কওমিপড়ুয়াদের নিয়োগের ব্যবস্থা করলে একটি বড় কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত হয়ে যায়।

সনদের স্বীকৃতির মাধ্যমে সরকারি কিছু পদে নিয়োগের মাধ্যমে কওমিপড়ুয়াদের একটি বড় অংশের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়। পাশাপাশি আরও কিছু বিকল্প খুঁজে বের করা যেতে পারে। মাদরাসায় পড়াশোনা করে সবাই মসজিদের ইমাম কিংবা মাদরাসার শিক্ষকই হতে হবে- এমন প্রাচীন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মাদরাসায় দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত পড়াশোনা করলে সবার ইমামতি করা কিংবা মাদরাসায় পড়ানোর যোগ্যতা অর্জিত হয় না। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে যোগ্যরা এসব পেশায় নিয়োজিত হবেন। কিন্তু এর বাইরে অন্যদের ঈমান, আমল, লেবাস-পোশাক ও অবয়ব ঠিক রেখে যেকোনো হালাল পেশায় নিয়োজিত হওয়ার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে। বিশেষ করে কিছু কারিগরি বিদ্যা শিখিয়ে বিভিন্ন সেক্টরে নিজেদের লোক ছড়িয়ে দেওয়ার মিশন বাস্তবায়ন করতে পারে কওমি কর্তপক্ষ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশের লাখ লাখ কর্মীর চাহিদা রয়েছে। সামান্য আরবি ভাষা এবং কিছু কারিগরি যোগ্যতার অভাবে পানির দরে শ্রম বিক্রি করছে বাংলাদেশি প্রবাসীরা। এই জায়গাটিতে কওমিপড়ুয়াদের নিয়োজিত করতে পারলে বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা যেমন হবে তেমনি দেশ বিপুল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা লাভ করবে।

সর্বোপরি যাদের ঝোঁক আছে তাদের ব্যবসার দিকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। নবী-রাসুল ও মাজহাবের ইমামদের একটি বড় অংশ ব্যবসায়ী ছিলেন। অথচ এখনকার আলেমদের ব্যবসার প্রতি একটা অনীহা ভাব রয়েছে। অথচ সবাই চায় ব্যবসায়ীরা সৎ ও আদর্শবান হোক। সিন্ডিকেট, কালোবাজারি, অসততার মতো ত্রুটি থেকে মুক্ত হোক ব্যবসায়িক অঙ্গন। তাকওয়া বা খোদাভীতি আলেমদের শান। সুতরাং আলেম ব্যবসায়ীর সংখ্যা যত বেশি বাড়বে তত এই অঙ্গন কলুষতামুক্ত হবে। এছাড়াও যার যে দিকে ঝোঁক, সেই পেশাটা বৈধ ও হালাল হলে, কওমি মুরব্বিদের উচিত তাকে সেটা বেছে নিতে সহায়তা করা। এভাবেই কাটতে পারে কওমি অঙ্গনের কর্মসংস্থানের সংকট।

লেখক: আলেম সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সম্পাদক

আরএইচ/