কেন শিক্ষকতা বিমুখ হচ্ছেন মেধাবী কওমি তরুণরা?
প্রকাশ: ৩০ মার্চ, ২০২৬, ১২:১৭ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

|| জহির উদ্দিন বাবর ||

রাজধানীর ঢাকার মধ্যসারির একটি কওমি মাদরাসার মেধাবী শিক্ষক তিনি। বোর্ড পরীক্ষায় মেধা তালিকায় স্থানও পেয়েছিলেন। বেতন পান দশ হাজারেরও কিছু কম। গ্রামের বাড়ি উত্তরবঙ্গের একটি জেলায়। স্ত্রী ও দুই সন্তানের পরিবার গ্রামেই থাকে। বড় ভাই আলাদা সংসার পেতেছেন। এজন্য মা-বাবার দায়িত্বও তার ওপর। তিনিসহ পরিবারের মোট সদস্যের সংখ্যা ছয়জন। তিনি যে বেতন পান পরিবারের সদস্যদের মাথাপিছু পড়ে দেড় হাজার টাকার মতো। কয়েক মাস পরপর বাড়িতে যান। প্রতিবার আসা-যাওয়াতেই খরচ হয়ে যায় কয়েক হাজার টাকা। ফলে এই বেতনে চাকরি করে তার পক্ষে পরিবার চালাতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে।

মাদরাসা যে ১০ হাজার টাকা বেতন দেয় সেটাও নিয়মিত না। কয়েক মাসের বাকি পড়ে। রমজান এলে মুহতামিম সাহেব রশিদ বই হাতে ধরিয়ে দেন। কালেকশন করে বেতন উসুল করতে বলেন। কিন্তু মাদরাসার বাইরে ওই শিক্ষকের তেমন কোনো যোগাযোগ নেই। ফলে তিনি কালেকশনে খুবই দুর্বল। নিজের বাকি বেতনের সিকিভাগও তিনি উঠাতে পারেন না। ফলে রমজানে অন্য শিক্ষকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ হলেও তার বাকিই থেকে যায়। মাদরাসায় শিক্ষকতার বাইরে যে তিনি কিছু করবেন সেটার সুযোগও রাখেনি কর্তৃপক্ষ। তাকে মাদরাসার নেগরানির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রায় ২৪ ঘণ্টাই চারদেয়ালের ভেতরে থাকতে হয়। সম্প্রতি অনেকটা ক্ষোভ, দুঃখ, আক্ষেপ ও বঞ্চনা থেকে তিনি সেই শিক্ষকতা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কী করবেন সেটা এখনো স্থির করেননি। তবে কোনো একটা কিছু করে পরিবার নিয়ে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার চেষ্টা করবেন- এমনটাই জানালেন তিনি।

মেধাবী শিক্ষকের এমন করুণ দশা কওমি মাদরাসায় শুধু এক-দুজনের নয়, হাজারও শিক্ষকের। বিশেষ করে যারা শিক্ষকতার পেছনে নিজেকে উজাড় করে দেন, বাইরের তেমন কোনো ব্যস্ততা রাখেন না, এমন শিক্ষকদের বঞ্চনাই বেশি। মেধাবী এমন শিক্ষকদের একটি বড় অংশের কওমি মাদরাসার প্রতি বিতৃঞ্চা চলে আসছে। জীবনচলার তাগিদে তারা অন্য পেশা বা কর্মক্ষেত্র বেছে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। যাদের সুযোগ হচ্ছে তারা সেসব পেশায় চলে যাচ্ছেন। আর যাদের বিকল্প মিলছে না তা শত বঞ্চনা নিয়েই টিকে আছেন। কতদিন এভাবে টিকে থাকতে পারবেন সেটা তারা নিজেরাও জানেন না।

কওমি মাদরাসাগুলো থেকে প্রতি বছর ১৫/২০ হাজার আলেম ফারেগ হচ্ছেন। তাদের একটি বড় অংশ শিক্ষকতা পেশায় যাচ্ছেন। মানুষ গড়ার শ্রেষ্ঠ এই অঙ্গনে নিজেদের পুরোপুরি নিয়োজিত করার মানসিকতাও রয়েছে বেশির ভাগের। কিন্তু মাদরাসাগুলোতে বেতনের যে কাঠামো এবং অপ্রতুল যে সুযোগ-সুবিধা তাতে শিক্ষকদের জন্য এখানে টিকে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। শহরের মাদরাসাগুলোতে বেতন-ভাতার কিছুটা নিশ্চয়তা থাকলেও মফস্বল ও গ্রামের মাদরাসাগুলোতে সেটাও নেই। একে তো বর্তমান বাজারদরের ধারেকাছেও নেই মাদরাসার বেতন কাঠামো। তার ওপর নিয়মিত বেতন পরিশোধ হয় এমন মাদরাসার সংখ্যা খুবই কম। বেশির ভাগ মাদরাসার বেতন মাসের পর মাস বাকি থাকে। এতে যারা মাটি কামড়ে এখানে পড়ে থাকতে চান তাদের পক্ষেও টিকে থাকা কঠিন হয়। এভাবে দিন দিন মাদরাসায় শিক্ষকতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন মেধাবী তরুণ আলেমরা। অবস্থার উন্নতি না হলে ভবিষ্যতে যোগ্য শিক্ষক পাওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন খোদ এই অঙ্গনের কর্ণধারেরা।

এটা সত্য, এদেশের কওমি মাদরাসাগুলো বরাবরই অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে পথ চলেছে। এখন মাদরাসাগুলো আগের চেয়ে অনেক সাবলম্বী হয়েছে। কোটি টাকা খরচ করে এমন মাদরাসার সংখ্যা শত শত। তবে মাদরাসাগুলো সাধারণত অবকাঠামোসহ অন্যান্য খাতে টাকা খরচ করতে যতটা উৎসাহী ততটা আন্তরিক নয় শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধার ব্যাপারে। বিশেষ করে কমিটি শাসিত মাদরাসাগুলোর মূল লক্ষ্যই থাকে অবকাঠামো দৃশ্যমান করা। কে কত বড় ও সুরম্য বিল্ডিং করতে পারলো সেটা নিয়ে অঘোষিত প্রতিযোগিতা চলে। এমন মাদরাসার কথাও আমরা জানি, রাতারাতি আলিশান বিল্ডিং উঠে যাচ্ছে, অথচ মাদরাসার শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বাকি কয়েক মাসের। মাদরাসা পরিচালনার জন্য অবকাঠামো উন্নয়নের দরকার আছে। তবে এর চেয়েও বেশি দরকার সুনাম-সুখ্যাতির কারিগর শিক্ষক-স্টাফদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। আবাসন সংকটের মধ্যেও শিক্ষকরা নিজেদের মানিয়ে নিতে পারেন, কিন্তু মাস শেষে যখন তাদের পেটে ক্ষুধা থাকবে, পারিবারিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাবে তখন শিক্ষা কার্যক্রমের দিকে পুরোপুরি মনোযোগী হতে পারবে না এটাই স্বাভাবিক। এজন্য মাদরাসাগুলোর কর্তৃপক্ষের উচিত অবকাঠামোর দিকের চেয়ে শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধার দিকে মনোযোগী হওয়া। অনেক মাদরাসাকে ঋণ করে চলতে হয়। বছর শেষে রমজানে কিংবা ছাত্র ভর্তির সময় হয়ত সেই ঘাটতি পূরণ হয়ে যায়। কর্তৃপক্ষ একটু আন্তরিক হলে প্রয়োজনে ধারদেনা করে হলেও শিক্ষকদের বেতন-ভাতা নিয়মিত পরিশোধ করা উচিত। এমনিতেই বেতন-ভাতার পরিমাণ খুবই অল্প। তার ওপর নিয়মিত সেটা পরিশোধ না হলে শিক্ষকরা পরিবার-পরিজন নিয়ে কীভাবে জীবন ধারণ করবেন!

মাদরাসার শিক্ষকতাকে যারা পেশা হিসেবে বেছে নেন তারা সীমিত সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি জেনে-বুঝেই এখানে আসেন। সুতরাং এখানে এসে আরও বেশি সুবিধা পাওয়া নিয়ে আক্ষেপ না করাই ভালো। কারণ, অহেতুক আক্ষেপে কষ্ট শুধু বাড়বেই, পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না। এজন্য শিক্ষকদেরও উচিত মহান এই পেশার স্বার্থে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করা। যতটুকু না হলেই নয় জীবনমান ততটুকুতেই সীমিত রাখা। অন্য পেশাজীবীদের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করলে আক্ষেপ ও খেদ বাড়বে ছাড়া কমবে না।

লেখক: আলেম সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সম্পাদক

আইও/