নবীজি (সা.) যেভাবে পানি পান করতেন
প্রকাশ: ২৩ জুলাই, ২০২৬, ০৪:৫০ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

|| শরিফ হাসানাত || 

পানি আল্লাহ তাআলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণের অস্তিত্ব পানির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মানবজীবন ও সুস্বাস্থ্য রক্ষায় পানি একটি অপরিহার্য উপাদান। এটি ছাড়া জীবন ধারণ কল্পনাই করা যায় না। আল্লাহ তাআলা পানিকেই সকল জীবের উৎস হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তাই যথার্থই বলা হয়—পানির অপর নাম জীবন। পৃথিবীর সব প্রাণীই বেঁচে থাকার তাগিদে পানি পান করে। তবে মানুষের জন্য পানি পানের ক্ষেত্রেও ইসলাম সুন্দর কিছু আদব ও নির্দেশনা দিয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

"আমি পানি দ্বারা সব জীবন্ত বস্তুকে সৃষ্টি করেছি। তবুও কি তারা ঈমান আনবে না?" (সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৩০)

অন্য আয়াতে তিনি বলেন,

"তোমরা যে পানি পান কর, তা কি তোমরা মেঘ থেকে নামাও, নাকি আমি তা বর্ষণ করি?" (সূরা আল-ওয়াকিয়া, ৫৬:৬৮–৬৯)

‘বিসমিল্লাহ’ বলে পানি পান করা

নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রতিটি ভালো কাজের শুরুতে ‘আল্লাহর নাম’ স্মরণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। পানি পানের ক্ষেত্রেও তিনি "বিসমিল্লাহ" বলতে উৎসাহিত করেছেন।

তিনি বলেন,

"তোমাদের কেউ যখন পান করবে, তখন সে যেন আল্লাহর নাম নিয়ে পান করে।" (জামে তিরমিজি, হাদিস: ১৮৮৫)

এতে বোঝা যায়, একজন মুমিনের কাছে পানি পানও ইবাদতের মর্যাদা লাভ করে, যদি তা আল্লাহর নাম নিয়ে শুরু করা হয়।

ডান হাতে পানি পান করা

নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘কখনো খাবার এবং পানীয় বাম হাতে গ্রহণ করবে না। কেননা শয়তান বাম হাতে খাবার গ্রহণ করে।’ (মুসলিম)

বসে পানি পান করা

নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অধিকাংশ সময় বসে পানি পান করতেন। যদিও বিশেষ প্রয়োজন বা বিশেষ পরিস্থিতিতে তিনি দাঁড়িয়ে জমজমের পানি পান করেছেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৬৩৭), তবে মুহাদ্দিসগণ একমত যে, স্বাভাবিক অবস্থায় বসে পান করাই সুন্নাহ এবং অধিক উত্তম।

হজরত আনাস (রা.) বলেন,

"মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দাঁড়িয়ে পানি পান করতে নিষেধ করেছেন।"

(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২০২৪)

দাঁড়িয়ে পানি পান না করা

নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দাঁড়িয়ে পানি পান করতে নিষেধ করেছেন। কারণ দাঁড়িয়ে পানি পান করলে নানারকম রোগব্যাধি ও ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। দাঁড়িয়ে পানি পান করলে বদহজম, শরীরে তরলের ভারসাম্যহীনতা, জয়েন্টের সমস্যা, ফুসফুস ও হৃদ্‌যন্ত্রের কার্যকারিতায় বিঘ্ন এবং কিডনির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে—এমন দাবি বিভিন্ন গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের মতামতে উঠে এসেছে। তাই সুস্বাস্থ্য এবং সুন্নাহ অনুসরণের লক্ষ্যে দাঁড়িয়ে নয়, বরং বসে পানি পান করাই উত্তম।

আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দাঁড়িয়ে পানি পান করতে নিষেধ করেছেন।’ 

তিন নিঃশ্বাসে পানি পান করা

নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তিন ঢোকে পানি পান করতেন। তিন নিঃশ্বাসে পানি পান করার শিক্ষা তিনি দিয়েছেন। 

আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তিন নিঃশ্বাসে পানি পান করতেন এবং বলতেন, এভাবে পানি পান করলে তৃষ্ণা উত্তমরূপে নিবারিত হয়, খাদ্য অধিক হজম হয় এবং স্বাস্থ্য ভালো থাকে’।  (আবু-দাউদ হাদিস: ৩৬৮৫)

চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, ধীরে ধীরে চুমুক দিয়ে পানি পান করলে তা মুখের লালার সঙ্গে ভালোভাবে মিশে যায়। লালায় থাকা অ্যামাইলেজ (Amylase) নামক এনজাইম কার্বোহাইড্রেটের প্রাথমিক হজমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে খাদ্যের রাসায়নিক পরিপাক মুখ থেকেই শুরু হয় এবং পাকস্থলী ও ক্ষুদ্রান্ত্রে হজম প্রক্রিয়া আরও কার্যকরভাবে সম্পন্ন হতে সহায়তা করে। (দ্য ইকোনমিক টাইমস, এইটিন মার্চ, টোয়েন্টি এইটিন)  

পাত্রে মুখ লাগিয়ে পানি পান করা বারণ

বোতল জাতীয় পাত্রের মুখে মুখ লাগিয়ে পানি পান না করা। যেটি অনেকেই করে থাকেন। এভাবে পানি পান করতে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বারণ করেছেন।

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মশকের মুখে মুখ লাগিয়ে পানি পান করতে, অপবিত্র বস্ত্ত ভক্ষণকারী জানোয়ারের পিঠে আরোহণ করতে এবং তীর বিদ্ধ পশুর গোশত ভক্ষণ করতে নিষেধ করেছেন। (আবু দাউদ হাদিস: ৩৬৭৭)

আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মশক উল্টিয়ে ধরে এর মুখে মুখ লাগিয়ে পান করতে নিষেধ করেছেন’। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫১০০) 

আমরা জেনেছি যে, মুখের লালার গুরুত্ব এবং তা কিভাবে হজম প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে। যখন বোতলজাতীয় পাত্র উল্টিয়ে ধরে মুখে মুখ লাগিয়ে পানি পান করা হয় তখন পানি সরাসরী পাকস্থলিতে গিয়ে পড়ে এবং পানির সাথে মুখের লালার মিশ্রণ হয় না। এভাবে পানি পান করলে শরীরের ভিতরে উৎপন্ন হওয়া কার্বন-ডাই-অক্সাইড বাইরে বের হ’তে পারে না এবং তা পানির সাথে মিশে কার্বনিক এসিড তৈরী করে। ফলে খাদ্য হজম প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। তাই মশক বা বোতল উল্টিয়ে ধরে মুখের সাথে মুখ লাগিয়ে পানি পান করা স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর।

পাত্রে ফুঁ বা নিঃশ্বাস না-ফেলা

অনেকে পানি পান করার সময় পাত্রে নিঃশ্বাস ফেলে। গরম পানীয় পান করার সময় বা গরম খাবার ঠান্ডা করার জন্য ফুঁ দিয়ে থাকে। পাত্রে এভাবে নিঃশ্বাস ফেলতে বা ফুঁ দিতে রাসুল (সা.) নিষেধ করেছেন।  

ইবনে আববাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,‘রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পাত্রের মধ্যে শ্বাস ফেলতে এবং তাতে ফুঁ দিতে নিষেধ করেছেন’। (আবু দাউদ হাদিস: ৩৬৮৬)

পানি পানের সময় স্বাভাবিকভাবেই শরীরের ভেতর থেকে কিছু বাতাস বের হয়, যাতে পানি সহজে খাদ্যনালিতে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু পানির পাত্রের ভেতরে নিঃশ্বাস ফেলা বা ফুঁ দেওয়া স্বাস্থ্যসম্মত নয়। কারণ এতে নিঃশ্বাসের সঙ্গে নির্গত কার্বন-ডাই-অক্সাইড, লালার সূক্ষ্ম কণা এবং মুখের জীবাণু পানিতে মিশে যেতে পারে। বিশেষ করে একই পাত্র একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করলে সংক্রমণের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। এ কারণে চিকিৎসাবিজ্ঞানও পানীয়ের ভেতরে ফুঁ না-দেওয়াকে পরিচ্ছন্নতার দৃষ্টিকোণ থেকে উত্তম মনে করে।

ইসলামও এ বিষয়ে সুন্দর আদব শিক্ষা দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পানি পান করার সময় পাত্রের মধ্যে নিঃশ্বাস ফেলতে নিষেধ করেছেন এবং তিন শ্বাসে ধীরে ধীরে পানি পান করতেন। তাই সুন্নাহ অনুযায়ী বসে, ধীরে ধীরে তিন শ্বাসে পানি পান করা এবং পাত্রের ভেতরে নিঃশ্বাস বা ফুঁ না দেওয়া শারীরিক সুস্থতা, পরিচ্ছন্নতা ও উত্তম শিষ্টাচারের প্রতীক। নিয়মিত এই সুন্নাহ অনুসরণ করলে তা ব্যক্তি ও সমাজ—উভয়ের জন্যই কল্যাণকর।

পানি পানের পর ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা

পানি পানের পর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় স্বরূপ সবসময় ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা উত্তম। সুন্দর ও নিরাপদভাবে খাবার ও পানীয় পানের পর আল্লাহর প্রশংসামূলক বাক্য ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বললে তারই শুকরিয়া আদায় করা হয়।

আল্লাহ তাআলা আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সুন্নাহ অনুসরণের তাওফীক দান করুন। আমীন।

এসএইচ/