মাদরাসায় শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা নিশ্চিতে বেফাকের একগুচ্ছ জরুরি নির্দেশনা
প্রকাশ: ২৮ জুলাই, ২০২৬, ০৭:১১ বিকাল
নিউজ ডেস্ক

বিশেষ প্রতিনিধি

দেশের কওমি মাদরাসাগুলোতে তালিম, তারবিয়ত, শৃঙ্খলা, নৈতিক পরিবেশ এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একগুচ্ছ জরুরি নির্দেশনা জারি করেছে কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ। ১ সফর ১৪৪৮ হিজরি তারিখে প্রকাশিত ‘দীনি মাদরাসাসমূহের তালীম-তারবিয়ত ও শৃঙ্খলা সম্পর্কিত কিছু নির্দেশনা’ শীর্ষক এ নীতিমালায় কওমি মাদরাসার আদর্শ, মুহতামিম ও শিক্ষকদের দায়িত্ব, ছাত্রাবাস ব্যবস্থাপনা, মহিলা মাদরাসার নীতিমালা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার ক্ষেত্রে করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বেফাকের প্রধান পরিচালক মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী স্বাক্ষরিত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কওমি মাদরাসা হলো আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাত এবং দারুল উলূম দেওবন্দের আদর্শ, মূলনীতি ও মাসলাক-মাশরাবের অনুসারী হক্কানি ওলামায়ে কেরামের প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত দীনি শিক্ষাকেন্দ্র। এসব প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য হলো ঈমান-ইখলাস, তাকওয়া, সুন্নতের অনুসরণ, বাতিল মতবাদের প্রতিরোধ এবং আল্লাহর দ্বীনকে সমুন্নত রাখা। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশুদ্ধ আকিদা, উন্নত চরিত্র এবং আমলী জীবন গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

মুহতামিমের যোগ্যতা ও দায়িত্ব

নীতিমালায় একজন মুহতামিমের জন্য একাধিক যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তিনি কওমি মাদরাসা থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে দাওরায়ে হাদিস উত্তীর্ণ, আরবি, বাংলা ও উর্দু ভাষায় দক্ষ এবং প্রয়োজনীয় পর্যায়ে ইংরেজি জানা ব্যক্তি হবেন। পাশাপাশি প্রশাসনিক দক্ষতা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, শিক্ষক-কর্মচারী পরিচালনার সক্ষমতা এবং প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ শ্রেণিতে পাঠদানের যোগ্যতা থাকতে হবে। পূর্ব অভিজ্ঞতাকেও বিশেষ যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

মুহতামিমদের প্রতি প্রতি সপ্তাহে শিক্ষকদের বৈঠক এবং অন্তত মাসে দুইবার ছাত্র-শিক্ষকদের যৌথ তারবিয়তী জলসা আয়োজনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব জলসায় শিক্ষার্থীদের আমল-আখলাক, পড়াশোনায় মনোযোগ, সুন্নতের অনুসরণ, আবাসিক শৃঙ্খলা এবং আদর্শ মুসলিম হিসেবে গড়ে ওঠার বিষয়ে নসিহত করার কথা বলা হয়েছে। সুযোগ থাকলে বরেণ্য আলেম ও ইসলাহী মুরব্বিদের মাধ্যমে বয়ান আয়োজনেরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশেষ নির্দেশনা

বেফাক নির্দেশনায় পাঠদান পদ্ধতির উন্নয়ন, শিক্ষকদের দক্ষতা অনুযায়ী কিতাব বণ্টন, শিক্ষার্থীদের তাকরার ও মুতালাআর ব্যবস্থা, আকাবির ও আসলাফের জীবনচর্চা পাঠদান এবং আখলাক গঠনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের চিন্তা-চেতনা, পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-আচরণ ও দৈনন্দিন জীবন সুন্নাহভিত্তিক করার জন্য শিক্ষকদের প্রতি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ছাত্রাবাসে সিসিটিভি, স্মার্টফোন নিষিদ্ধ

ছাত্রাবাস ব্যবস্থাপনায় বেফাক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষার্থীদের বয়সভিত্তিক সিট বণ্টন, সার্বক্ষণিক তদারকি, অসুস্থ শিক্ষার্থীর চিকিৎসা নিশ্চিত করা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখা এবং নিয়মিত শরীরচর্চা ও খেলাধুলার সুযোগ সৃষ্টি।

এছাড়া মাদরাসার অফিস, প্রবেশদ্বার ও ছাত্রাবাসকে যথাসম্ভব সিসিটিভির আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বেফাকের ভাষ্য, কোনো অপবাদ বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার ক্ষেত্রে এসব ভিডিও রেকর্ড গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজে আসতে পারে।

একই সঙ্গে আবাসিক শিক্ষার্থীদের স্মার্টফোন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অভিভাবকের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগের জন্য তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষকের ফোন ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষার্থীকে মারধর সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ

নির্দেশনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তির ওপর কঠোর অবস্থান। এতে বলা হয়েছে, পিতা-মাতা বা অভিভাবকের মতো প্রয়োজনীয় মৌখিক শাসনের বাইরে কোনো শিক্ষার্থীকে বেত্রাঘাত বা মারধর করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

মহিলা মাদরাসার জন্য পৃথক নীতিমালা

মহিলা মাদরাসা পরিচালনার ক্ষেত্রেও পৃথক নীতিমালা নির্ধারণ করেছে বেফাক। এতে আবাসিক ছাত্রীদের তত্ত্বাবধানে মহিলা সুপারভাইজার নিয়োগ, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শরয়ি পরিবেশ বজায় রাখা এবং পুরো ক্যাম্পাসে প্রয়োজনীয় সিসিটিভি স্থাপনের নির্দেশনা রয়েছে।

এছাড়া মাদরাসা প্রাঙ্গণে পুরুষদের বসবাস না থাকা, বিশেষ প্রয়োজনে পুরুষ শিক্ষক পাঠদান করলে শরয়ি পদ্ধতি অনুসরণ করা, ছোট পরিসরের বালিকা মাদরাসায় শ্রেণিকক্ষ পৃথকীকরণ এবং প্রয়োজনে অনাবাসিক ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কওমি অঙ্গনের নীতি-আদর্শবিরোধী কোনো ব্যক্তি নারী বা পুরুষকে মহিলা মাদরাসায় দায়িত্বে রাখা যাবে না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

বোর্ডের বাইরে থাকা দীনি শিক্ষা কেন্দ্রও থাকবে নজরদারিতে

বেফাক বলেছে, বোর্ডভুক্ত নয়—এমন মক্তব, মাদরাসা ও অন্যান্য দীনি শিক্ষা কেন্দ্রগুলোকেও স্থানীয় আলেম এবং নিকটবর্তী বড় মাদরাসার তত্ত্বাবধানে রাখতে হবে। কারণ কোনো বিচ্ছিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনৈতিক ঘটনা ঘটলেও সাধারণ মানুষ সেটিকে পুরো কওমি মাদরাসা অঙ্গনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে দেখে, যা সামগ্রিকভাবে কওমি শিক্ষার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে।

অনৈতিক ঘটনা ঘটলে বেফাককে অবহিত করার নির্দেশ

নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো মাদরাসায় নৈতিক অপরাধ, আত্মহত্যা, হত্যা বা অন্য কোনো গুরুতর ঘটনা ঘটলে তার প্রকৃত তথ্য দ্রুত বেফাককে জানাতে হবে, যাতে বাস্তব ঘটনা ও অপপ্রচারের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া যায়।

এছাড়া পর্দা লঙ্ঘন বা অনৈতিক আচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ইলহাক স্থগিতসহ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার বা মিথ্যা মামলার শিকার হলে দ্রুত বেফাকের দায়িত্বশীলদের অবহিত করারও আহ্বান জানানো হয়েছে। এজন্য বেফাকের তথ্য বিভাগ ও হটলাইনের মাধ্যমে সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থাও উল্লেখ করা হয়েছে।

আইও/