
|
বিএনপির সঙ্গে টানাপোড়েন, কোন পথে জমিয়ত?
প্রকাশ:
১৩ জুন, ২০২৬, ০৫:০৪ বিকাল
নিউজ ডেস্ক |
বিশেষ প্রতিনিধি গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ইসলামি দলগুলোর মধ্যে একমাত্র জমিয়তে উলামায়ে ইসলামই বিএনপির সঙ্গে ছিল। দলটি সঙ্গ দেওয়ায় বিএনপিকে ইসলামপন্থীদের বিরোধী বলয়ে পুরোপুরি ঠেলে দিতে পারেনি বিরোধী পক্ষ। জামায়াতে ইসলামীসহ বেশ কয়েকটি ইসলামি দল মিলে যখন শক্তিশালী বিরোধী বলয় গড়ে তুলে তখন একমাত্র জমিয়তই বিএনপির পাশে শক্তভাবে অবস্থান নেয়। ভোটের বিচারে এতে বিএনপির বড় কোনো ফায়দা না হলেও ন্যারেটিভের বিচারে অনেক উপকার হয়েছে। পাশে একটি ইসলামি দলও না থাকলে তখন বিএনপিকে ‘ইসলামবিরোধী’ পক্ষ হিসেবে পরিচিত করানো সহজ হতো। বিশেষ করে ইসলামপন্থীদের ‘একবাক্স নীতি’ যেভাবে মাঠে-ময়দানে জোয়ার তুলেছিল, সেটা শেষ পর্যন্ত অক্ষুণ্ন থাকলে বিএনপির জন্য বড় জয় পাওয়া কঠিন হয়ে যেতো। বিএনপি জমিয়তকে চারটি আসনে ছাড় দিয়েছিল। দলটির আরেকটি ক্ষুদ্র গ্রুপকেও দিয়েছিল একটি আসনে ছাড়। তবে পাঁচটি আসনের কোনোটিতেই জমিয়তের প্রার্থীরা পাস করতে পারেননি। বিএনপির মতো বড় দলের সমর্থন পাওয়ার পরও জয়ের দেখা না পাওয়া বড় আক্ষেপের কারণ। তবে এই ব্যর্থতা শুধু জমিয়তের সাংগঠনিক কারণেই নয়, বিএনপির ব্যর্থতাও এখানে দায়ী। পাঁচটি আসনেই বিএনপি নেতারা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিলেন জমিয়তের প্রার্থীর বিপক্ষে। বিএনপি দায়সারাভাবে বিদ্রোহী প্রার্থী দল থেকে বহিষ্কার করলেও বুঝিয়ে-শুনিয়ে তাদের বসিয়ে দেওয়ার দৃশ্যমান কোনো চেষ্টা করেনি। বিএনপির সর্বোচ্চ মহল থেকে এই চেষ্টাটুকু করলে জমিয়তের কয়েকজন প্রার্থী জয় পেতেন বলে দলটির নেতাকর্মীরা মনে করেন। আর এতেই বিএনপির প্রতি দলটির এক ধরনের ক্ষোভ জন্ম নিয়েছে। বিএনপি দুই তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করলেও কোথাও নেই জমিয়ত। ছোট ছোট কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতাকে বিএনপি মন্ত্রিপরিষদে জায়গা দিলেও রাষ্ট্রের কোনো সম্মানজনক জায়গাতেই জমিয়তের কাউকে বসানোর গরজ অনুভব করেনি দলটি। পুরো ইসলামি শক্তির বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে বিএনপিকে সমর্থন দেওয়ায় জমিয়তকে কম সমালোচিত হতে হয়নি। তবে সবকিছু উপেক্ষা করে জামায়াতে ইসলামীকে ঠেকাতে জমিয়ত তার অবস্থানে দৃঢ়তা বজায় রাখে। একদিকে নির্বাচনে ভরাডুবি, অন্যদিকে বিএনপির কাছ থেকে ন্যূনতম কোনো মূল্যায়নও না পেয়ে জমিয়তের নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা ও ক্ষোভ জন্ম নেয়। সেটা এতদিন ভেতরে ভেতরে থাকলেও সম্প্রতি খোদ দলের সভাপতির কণ্ঠে তা প্রকাশ পেয়েছে। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক গত ঈদুল আজহার পর নিজ নির্বাচনি এলাকা সিলেটের কানাইঘাটে দলের একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি বিএনপির প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিএনপি আগেও রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। এখনো করছে। কিন্তু দলটি আমার সাথে যে আচরণ করেছে সেজন্য দলটিকে ভুগতে হবে। জমিয়ত সভাপতি বলেন, আমি তো দেশ বাঁচিয়েছি। কওমি মাদরাসা বাঁচিয়েছি। আমরা তো আজাদীর সঙ্গে বিচরণ করার পরিবেশ তৈরি করেছি। আমরা চারজন এমপি পেলে কি এ দেশে ইসলামি হুকুমত কায়েম করতে পারতাম? দেশে কোনো একটা বিল পাস করতে পারতাম? কিছুই পারতাম না। এতোটুক হতো যে, আমাদের কিছু সুনাম হতো। জমিয়তের নেতাকর্মীদের ভেতরে যে ক্ষোভ রয়েছে সেটা তাদের সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যায়। জমিয়তের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে একান্তে আলোচনাকালে তারা জানান, বিএনপি তাদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণ করেনি। সরকার গঠনের পর তাদের পাত্তাই দেয়নি। যেহেতু দলটি সরকারে, নানাভাবে জমিয়ত সংশ্লিষ্টদের সম্মানিত করার সুযোগ ছিল। কিন্তু দলটির মধ্যে এক ধরনের উন্নাসিকতা কাজ করছে। এটা বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য বড় ক্ষতি ডেকে আনবে বলে মনে করছেন জমিয়ত নেতারা। তারা বলছেন, ভবিষ্যতে কোনো ইসলামি দল তাদের সঙ্গে জোট বা সমঝোতা করতে শত বার ভাববে।
তবে বিএনপি ও জমিয়তের বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, কিছুই না পাওয়ার পেছনে জমিয়তেরও দায় আছে। দলটি বিএনপির সঙ্গে দর কষাকষির সময় শুধু চারটি আসনে সমর্থনেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। তারা চারটি আসনে বিএনপির সমর্থন পাবে, আর বাকি ২৯৬টি আসনে দলটিকে সমর্থন দেবে-এমনটাই কথা হয় সমঝোতার আলোচনায়। বিএনপি সরকার গঠন করলে জমিয়তকে কোথায় রাখবে, কী পদ দেবে সে ব্যাপারে দলটি কোনো দর কষাকষি করেনি। অথচ জমিয়তের চেয়ে ছোট দলও বিএনপির সঙ্গে দর কষাকষি করে এমপি-মন্ত্রী পদ পেয়েছে। চারটি আসনে ছাড়ের পাশাপাশি জমিয়ত কিছু সুনির্দিষ্ট পদের ব্যাপারে দর কষাকষি করলেই এমনটা হতো না বলে খোদ জমিয়তের কেন্দ্রীয় একজন প্রভাবশালী নেতা জানিয়েছেন। সূত্র আরও জানায়, জমিয়তকে দেওয়া চারটি আসনের মধ্যে একটি আসন ছেড়ে দিতে স্বয়ং বিএনপি প্রধান তারেক রহমান অনুরোধ করেছিলেন। সেই আসনটিতে খালেদা জিয়ার এক আত্মীয় নির্বাচন করার কথা ছিল। সেই আসনটি ছেড়ে জমিয়তকে অন্য কোথাও নিতে বলেছিলেন। কিন্তু জমিয়ত সেটাতে কোনোভাবেই সম্মত হয়নি। এমনকি ওই আসন না পেলে সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন জমিয়তের প্রভাবশালী একজন নেতা। সরকার গঠনের পর বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব সেটা স্মরণ রেখেছে বলে ধারণা কারও কারও। সরকার গঠনের পর বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করেও জমিয়ত সেটা পায়নি বলে সূত্রের দাবি। জমিয়তের এই শূন্যপ্রাপ্তির পেছনে দলটির আভ্যন্তরীণ অনৈক্য ও বিভেদকেও কেউ কেউ দায়ী করে থাকেন। জমিয়তকে কোনো পদ দিলে সেটা কে নেবেন- তা ঠিক করতে পারেনি দলটি। এটা নিয়ে দলের ভেতরেই রয়েছে টানাপোড়েন। কে কার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নেতা সেটা বোঝানোর একটা অঘোষিত প্রতিযোগিতাও রয়েছে কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে। নিজেরা নিজেরা টানাটানি করার কারণে বিএনপির সঙ্গে দলীয় বা সম্মিলিতভাবে দর কষাকষিটা হয়ে ওঠেনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপির সঙ্গে সমঝোতাকে জমিয়ত রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে পারেনি দলটির অদূরদর্শিতার কারণে। একদিকে মাত্র চারটি আসনে ছাড় পেয়েই সন্তুষ্ট থাকা অন্যদিকে এই সমঝোতার যৌক্তিকতা বা এর স্বপক্ষে বয়ান তৈরি করতে পারেনি। অথচ জমিয়তের সামনে সেই সুযোগ ছিল। দলটি বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা করার সময় ছয়টি শর্ত দিয়েছিল। সেই শর্তের মধ্যে ছিল- ১. মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন। ২. রাষ্ট্রধর্ম হবে ইসলাম। ৩. আল্লাহ, নবী-রাসুল, সাহাবা ও কুরআনসহ সকল ধর্মের মর্যাদা রক্ষা করা হবে এবং ধর্ম অবমাননার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক আইন করা হবে। ৪. শরিয়াবিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন করা হবে না। ৫. শিক্ষার সর্বস্তরে মুসলমানদের জন্য ইসলামি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে। ৬. কওমি মাদরাসা শিক্ষিতদের ইমাম, কাজি এবং স্কুল কলেজে ধর্ম শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। অথচ পরবর্তী সময়ে এই ছয়টি শর্তের ওপর জমিয়তকে জোর দিতে দেখা যায়নি। এসব শর্তের আলোকে দলটি বয়ান তৈরি করতে পারতো। বলতে পারত, শুধু চারটি আসনে ছাড়ই নয়, ইসলাম এবং কওমি অঙ্গনের স্বার্থে আমরা এই সমঝোতায় সম্মত হয়েছি। ইসলামপন্থীদের একটি বড় অংশ মনে করে, এখনো জমিয়তের উচিত বিএনপির সঙ্গ ত্যাগ না করা। বিএনপির সঙ্গে বোঝাপড়া বাড়ানো। বিএনপি সরকারে রয়েছে, দলটিকে ইসলামবিরোধী বলয়ে ঠেলে দেওয়া সমীচীন হবে না। ইসলাম ইস্যুতে বিএনপি সরকারের কোনো বিচ্যুতি হলে জমিয়তের উচিত সতর্ক করা, অযাচিত কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখা। সরকারের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী একটি ইসলামি দলের সুসম্পর্ক থাকা পুরো জাতির জন্যই মঙ্গলজনক। দিনশেষে বিএনপি জাতীয়তাবাদী ও আলেম-উলামাবান্ধব শক্তি। অতীতে আলেমদের বড় অংশ দলটির সঙ্গে মিলে কাজ করেছে। এখন তাদেরকে দূরে ঠেলে দিলে ক্ষতি দুই পক্ষেরই হবে। এজন্য জমিয়তের নেতৃবৃন্দের সামনে বিএনপির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেই সামনে এগোনোর কোনো বিকল্প নেই। আইও |