‘ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে আবার সোনালি যুগে ফিরিয়ে নিতে চাই’
প্রকাশ: ১৬ জুন, ২০২৬, ০৯:১০ রাত
নিউজ ডেস্ক

দেশে ইসলামি শিক্ষা, গবেষণা ও দাওয়াহ কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দীনি শিক্ষা বিস্তার, মসজিদভিত্তিক শিক্ষা, ইমাম প্রশিক্ষণ ও ইসলামি সংস্কৃতি প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। এবার প্রথমবারের মতো ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক পদে নিয়োগ পেয়েছেন একজন আলেম—মাওলানা মুহিব্বুল্লাহিল বাকী নদভী, যিনি দীর্ঘদিন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের পেশ ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তাঁর এই নিয়োগ আলেম সমাজে যেমন ইতিবাচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তেমনি কিছু বিতর্ক ও প্রশ্নও সামনে এসেছে। আওয়ার ইসলামকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব সমালোচনার জবাব দিয়েছেন, তুলে ধরেছেন নিজের অবস্থান এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশন নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, ইমরান ওবাইদ।

আওয়ার ইসলাম: দেশের ইতিহাসে আপনিই প্রথম হক্কানি আলেম, যিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি মনোনীত হয়েছেন। ইমাম থেকে মহাপরিচালক, এ ব্যাপারে আপনার অনুভূতি কী?

মুহিব্বুল্লাহিল বাকী নদভী: প্রথম কথা হচ্ছে, বর্তমান সরকার আমাকে নয়; বরং হক্কানি আলেমদের যারা সরকারের সঙ্গে ছিলেন তাদের মধ্য থেকে একজনকে মনোনীত করেছে। সবাইকে যেহেতু একত্রে মনোনীত করা সম্ভব নয়, তাই একজনকে মনোনীত করেছে। ভাগ্যক্রমে সেই ব্যক্তিটি আমি হয়ে গেছি। অতএব, এখানে আমাকে মনোনীত করার চেয়ে, আলেমদের সরকার যে সম্মান দিয়েছেন তার জন্য আমি বেশি আনন্দিত।

আওয়ার ইসলাম: সম্প্রতি একটি পত্রিকা আপনার নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। আপনার একাডেমিক সার্টিফিকেট জালিয়াতির অভিযোগ করেছে। এ আপনার কিছু বলার আছে কি?

মুহিব্বুল্লাহিল বাকী নদভী: আমার ব্যাপারে যা লেখা হয়েছে, তা বানোয়াট। মানুষের কথার ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে। সেগুলোর বাস্তব কোনো প্রতিচ্ছবি নেই। কারণ, শামীম মোহাম্মদ আফজাল (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের সাবেক মহাপরিচালক) আমাকে সাসপেন্ড করার জন্য অনেকবার লঘুদণ্ড-গুরুদণ্ড দিয়ে শোকজ করেছেন। তিনি আমাকে ছোট করার জন্য আমার ১০ বছরের জুনিয়রকে পদোন্নতি দিয়েছেন। আমার সিলেকশন বাতিল করেছেন। তিনি যদি আমার কোনো দোষ খুঁজে পেতেন তাহলে কি তিনি আমাকে চাকরিতে রাখতেন? সুতরাং আমার ব্যাপারে যা লেখা হয়েছে তা বানোয়াট। এখানে বাস্তবতার কোনো প্রতিচ্ছবি নাই।

তারা আমার দাওরায়ে হাদিসের সনদ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তারা লিখেছে আমার দাওরায়ে হাদিসের সনদ নাকি জাল। এর উত্তর হচ্ছে, আমার সনদ যদি জাল হয়ে থাকে, এখনো তো হাটহাজারী মাদরাসায় গিয়ে যাচাই করা যায়। তারা যেন যাচাই করে!

দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, যে বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে আমার দাওরায়ে হাদিসের সনদকে জাল বলা হচ্ছে, তা হাস্যকর। ২০১৫ সালে আবু হেনা মোস্তফা কামাল নামে একজন রমজানের ছুটির দিনে আমার দাওরায়ে হাদিসের সনদ যাচাই করার জন্য হাটহাজারী গিয়েছিলেন। মাদরাসা বন্ধ থাকায় তারা দফতরে যোগাযোগ করতে পারে নাই। তারা দুজন আলেমের সঙ্গে আলাপ করে; যারা হাটহাজারী মাদরাসার শিক্ষক। তারা মন্তব্য করেন, এই মনোগ্রাম এবং এই সাইজের সার্টিফিকেট তো হাটহাজারী মাদরাসার সার্টিফিকেট হতে পারে না। কিন্তু রমজান শেষে মাদরাসা খোলার পর তারা তা আর চেক করেনি।

এই ব্যাপারে আমি মনে করি, যখন তারা বুঝতে পেরেছে, আমার সার্টিফিকেট ঠিক আছে, তখন তারা শামীম মোহাম্মদ আফজাল স্যারের নিকট ফোন দিয়ে বলেছে, স্যার সার্টিফিকেট তো ঠিক আছে। তখন তিনি বললেন, তার সার্টিফিকেট ঠিক আছে এটা প্রকাশ করা যাবে না; বরং তোমরা ধোঁয়াশা একটা রিপোর্ট তৈরি করো, যাতে মানুষের সন্দেহ সৃষ্টি হয়। সেজন্য তারা লিখেছে, আমরা রমজানে মাদরাসায় যাই। মাদরাসা বন্ধ থাকায় কাউকে পাওয়া যায়নি। আমরা মানুষের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছি, সার্টিফিকেট জাল।

আওয়ার ইসলাম: মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর আপনার পরিকল্পনা কী? কোন কাজগুলো আপনি প্রাধান্য দেবেন?

মুহিব্বুল্লাহিল বাকী নদভী: ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কাজ হচ্ছে, ইমাম প্রশিক্ষণ, গণশিক্ষা, গবেষণা এবং প্রকাশনা ইত্যাদি। প্রতিটি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেন আলেম-উলামাগণ। আমার প্রথম কাজ হবে, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সঙ্গে আলেম-উলামাদের যোগাযোগ বৃদ্ধি করা। কারণ, তাদের সঙ্গ ছাড়া ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কোনো কাজ সম্ভব নয়। আমরা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সোনালি যুগ যাকে বলি, তখন কাজ বেশি হয়েছিল, তার কারণও—আলেমদের সঙ্গে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের যোগাযোগ বেশি ছিল।

আওয়ার ইসলাম: ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গবেষণার একটি সোনালি অতীত ও সুখ্যাতি আছে। আমরা আপনার মাধ্যমে অনুবাদ ও গবেষণার ক্ষেত্রে সেই সোনালি অতীতে ফিরে যেতে পারবো কি না?

মুহিব্বুল্লাহিল বাকী নদভী: আমি মনে করি, দেশের বর্তমান সরকারের সদিচ্ছা আছে এবং আমরা এমন একজন মন্ত্রী পেয়েছি, যিনি খুব ধার্মিক, কাজী মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ সাহেব। সুতরাং যদি আলেমগণ সহযোগিতা করেন, তাহলে খুব সহজেই হারানো সুখ্যাতি ফিরিয়ে আনতে পারবো। এবং আমি আরও বলবো, এতগুলো সৎ মানুষ একত্র হওয়ার পরও যদি আমরা কাজটাকে সুন্দরভাবে এগিয়ে নিয়ে না যেতে পারি, তাহলে বলতে হবে—এটা আমাদের দুর্ভাগ্য।

আওয়ার ইসলাম: ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে তথ্যপ্রযুক্তির দিক থেকে অগ্রসর করা ও আধুনিকায়নে আপনি কী উদ্যোগ গ্রহণ করবেন?

মুহিব্বুল্লাহিল বাকী নদভী: প্রথমে আমাদের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের লাইব্রেরিকে ডিজিটাল করতে হবে। আমি ২০০২ সালে যখন আল আজহারে যাই, তখন সেখানকার লাইব্রেরিকে তারা ডিজিটাল করে ফেলেছে। কিন্তু এখনো আমরা আমাদের লাইব্রেরির উন্নয়ন করতে পারিনি। এর কারণ হলো, আমরা যুগের প্রতি চোখ বন্ধ করেছিলাম। আমাদেরকে এখন চোখ খুলতে হবে এবং সবকিছুকে ডিজিটাল করতে হবে। না হয়, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বর্তমানে যে অবস্থায় আছে তার থেকে আরও খারাপ হয়ে যাবে এবং এর জন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমরা দায়ী থাকবো।

আওয়ার ইসলাম: কওমি মাদরাসার আলেম, গবেষক এবং লেখকদের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে আপনি কী উদ্যোগ গ্রহণ করবেন?

মুহিব্বুল্লাহিল বাকী নদভী: আমরা যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেব। কওমি আলেমগণ একসময় বাংলা তেমন চর্চা করতেন না, কিন্তু এখন করছেন। দেওবন্দি আলেমদের বই এখন বাংলাবাজারে পাওয়া যায়, যা একসময় দেখা যেত না। আমি মনে করি কওমি আলেমগণ যোগ্যতার বিবেচনায় অন্যদের তুলনায় এগিয়ে থাকবেন।

আওয়ার ইসলাম: ইসলামিক ফাউন্ডেশন একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। সাধারণ ধর্মীয় মানুষ যেন একে নিজের প্রতিষ্ঠান মনে করতে পারে এবং দীনি চাহিদা পূরণ করতে পারে, সে জন্য আপনি কী উদ্যোগ গ্রহণ করবেন?

মুহিব্বুল্লাহিল বাকী নদভী: ইসলামিক ফাউন্ডেশন ইসলামের সম্প্রীতি, সৌন্দর্য। জনগণের কাছে পৌঁছার জন্যই ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সূচনা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা রাজনৈতিক চর্চার বিষয় হয়ে গিয়েছিল। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সঠিকভাবে ইসলামের চর্চা করলেই আগের সুনাম এবং মানুষের আস্থাও ফিরে আসবে। অতএব, আমি মনে করি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের লক্ষ্য হওয়া উচিত, এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সঠিক ইসলামকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো। আমরা তাই করবো।

জেডএম/