বাংলাদেশে আকিদা চর্চার প্রয়োজনীয়তা, পদ্ধতি এবং সতর্কতা 
প্রকাশ: ১৮ জুন, ২০২৬, ০২:২৩ দুপুর
নিউজ ডেস্ক

|| আফফান লাবীব ||

আকিদা বিষয়ক আলোচনার মূলে প্রবেশের পূর্বে আমরা কিছু বিষয় জেনে নিই, যাতে করে আজকের বিষয়বস্তুটা শুরুতেই আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে যায়। 

প্রথমত আমরা জানবো– আকিদা কী।
সাধারণ জ্ঞানের দৃষ্টিতে আকিদা বলতে আমরা বুঝি– একজন মানুষ বুঝমান হওয়ার পর থেকে যা কিছু সে নিজের মনে বিশ্বাস করে, যে চেতনা-বিশ্বাস নিজের মধ্যে লালন করে এবং যে মতাদর্শের ভিত্তিতে সে নিজের জীবনকে পরিচালনা করে সেটাই আকিদা। উদাহরণত, একজন মানুষ যখন এককভাবে আল্লাহর রুবুবিয়্যত এবং উলুহিয়্যতকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবে এবং এটা মেনে নিবে– পৃথিবীতে যা কিছু হচ্ছে সব কিছুই আল্লাহর কর্তৃত্বে হচ্ছে— আমরা বলব আল্লাহ তায়ালার পরিচয়ের ক্ষেত্রে এটাই তার আকিদা‌। 

আর শাস্ত্রীয়ভাষায় আকিদার পরিচয় হলো–
ডক্টর সাঈদ বিন মুসফির আল কাহত্বানি তার عقيدة اهل السنة والجماعة على ضوء الكتاب والسنة কিতাবে আকিদার সংজ্ঞায়ন করতে গিয়ে বলেন–
اما تعريفها في الاصطلاح: فهي الايمان الجازم الذي ينبعث من اعماق النفس البشرية ولا يخالطه او يتطرق اليه ادنى شك بالله عز وجل وما يجب له من التوحيد والطاعة وبملائكته وكتبه ورسله واليوم الاخر والقدر وجميع ما ورد من امور الغيب 

অর্থাৎ আকিদা হলো এমন এক দৃঢ় ও অবিচল বিশ্বাস, যা মানুষের অন্তরের গভীর থেকে উৎসারিত হয় এবং যার মধ্যে আল্লাহ তাআলা, তাঁর একত্ব ও আনুগত্য, ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, পরকাল, তাকদীর ও সকল গায়েবী বিষয়ের প্রতি বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ থাকে না। 

এরপর ইসলামে আকিদা চর্চার মৌলিক গুরুত্ব অনুধাবন করতে গেলে আমরা দেখতে পাই– শরীয়তের দৃষ্টিতে মানুষের সামগ্রিক জীবনযাত্রা মূলত পাঁচভাগে বিভক্ত— ইবাদত, আকায়েদ, মুআমালাত, মুআশারাত ও আখলাক।

আর ফিকহের আলোচনায় এই বিষয়গুলোকে তিনটি প্রধান স্তরে বিন্যস্ত করা হয়েছে। এবং সর্বপ্রথম স্তরেই রয়েছে আকায়েদ বা আকিদাচর্চা। এ কারণেই ফিকহের পরিভাষায় আকিদা-সংক্রান্ত বিধিবিধানের জ্ঞানকে ‘আল-ফিকহুল আকবার’ বা সর্বশ্রেষ্ঠ ফিকহ বলে অভিহিত করা হয়েছে। 
ইসলামে আকিদা চর্চার গুরুত্ব বোঝার জন্যে আশা করি এতোটুকুই যথেষ্ট। 

উপরোক্ত আলোচনা সামনে রেখে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আকিদা চর্চার গুরুত্ব বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই, এ অঞ্চলের সাধারণ মুসলমানরা দীর্ঘদিন ধরেই বিশুদ্ধ আকিদা চর্চার ঘাটতিতে আক্রান্ত। ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক নানা প্রভাবের কারণে বাংলার মুসলিম সমাজ কখনোই পুরোপুরি বিজাতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে মুক্ত হতে পারেনি। 

হিন্দুত্ববাদ, ঔপনিবেশিক ইংরেজ সংস্কৃতি এবং শিয়া প্রভাব—এসবের দীর্ঘস্থায়ী ছাপ এ সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ফলে প্রবীণ ও নবীন—উভয় প্রজন্মের মাঝেই নানা ধরনের আকিদাগত বিভ্রান্তি ও সংকট দেখা দিয়েছে। অনেকেই নানা ধরনের বিধর্মীয় উৎসব ও সংস্কৃতিকে দেশীয় ঐতিহ্য কিংবা ইসলামসম্মত সংস্কৃতি মনে করে নির্বিঘ্নে পালন করছেন। হিন্দুদের পহেলা বৈশাখ, খ্রিস্টানদের বড়দিন কিংবা শিয়াদের দশই মুহাররম পালন—এসব বিষয়কে অনেকেই আর ঈমান-আকিদার দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতে রাজি নন।

এছাড়াও বর্তমান মুসলিম সমাজে যে নৈতিক ও চারিত্রিক অধঃপতনের চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে, তারও অন্যতম প্রধান কারণ হলো বিশুদ্ধ আকিদা ও সঠিক ইসলামী মূল্যবোধের অভাব। যখন মানুষের বিশ্বাস, চিন্তা ও জীবনবোধ ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে না, তখন ব্যক্তি ও সমাজ উভয় ক্ষেত্রেই নৈতিক অবক্ষয় ধীরে ধীরে প্রকট হয়ে ওঠে। তাই বলি, বাংলাদেশ চলমান প্রেক্ষাপটে মুসলিম সমাজে শান্তি ঐক্য এবং বিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্যে বিশুদ্ধ আকিদা চর্চার কোন বিকল্প নেই। 

পদ্ধতি এবং সতর্কতা 
আমরা জানি, বর্তমান বিশ্বে একনিষ্ঠ ইসলামচর্চার অন্যতম প্রধান প্রাণকেন্দ্র হলো কওমী মাদরাসা। নববী যুগের আহলে সুফফা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আহলে ইলম উলামায়ে কেরাম যুগে যুগে সমাজে ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। যখনই সমাজ আংশিক বা পূর্ণাঙ্গভাবে ইসলামী মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে গেছে, তখনই সেই সংকট মোকাবেলায় সর্বপ্রথম এগিয়ে এসেছেন উলামায়ে কেরাম। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটেও বিশুদ্ধ আকিদা চর্চার ঘাটতি পূরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন আমাদের ঘরানার আলেমগণ—এটাই প্রত্যাশিত। আর এই উদ্যোগের সূচনা হওয়া উচিত প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় থেকেই। একটু খুলে বললে, আমাদের বর্তমান পাঠ্যসূচিতে আকিদা চর্চার ঘাটতি স্পষ্টভাবেই লক্ষণীয়। দীর্ঘদিন ধরে অপরিবর্তিতভাবে চলে আসা এ পাঠ্যব্যবস্থার যথাযথ সংস্কার না হলে এর নেতিবাচক প্রভাব বর্তমান ও ভবিষ্যৎ মুসলিম সমাজে অব্যাহত থাকবে। কারণ, এখান থেকে শিক্ষা সমাপ্ত করে যখন আমরা সমাজের নেতৃত্বে আসীন হব, তখন সমাজ পরিচালনা ও দিকনির্দেশনা দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও প্রশিক্ষণ যদি আমাদের মাঝে না থাকে, তবে সমাজ আমাদের দ্বারা কতটা উপকৃত হবে—তা সহজেই অনুমেয়।

সামাজিক ও আকিদাগত বিচ্যুতি সংশোধনের জন্যে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও প্রস্তুতি যদি আমাদের অর্জিত না হয়, তাহলে এ ঘাটতির ক্ষতি মুসলিম সমাজকে দীর্ঘদিন বহন করতে হবে। তাই সমাজের এই অসংগতি দূর করতে হলে আমাদেরকে মাদরাসার এই চার দেয়ালের ভেতর থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। এ কারণেই পাঠ্যসূচির যুগোপযোগী সংস্কার এবং আকিদা বিষয়ক পাঠকে আরও সমৃদ্ধ ও কার্যকর করা এখন সময়ের অনিবার্য দাবি।

দ্বিতীয়তঃ সামাজিকভাবেও আকিদা চর্চার বিভিন্ন পদ্ধতি হতে পারে। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে কার্যকরী ও স্থায়ী উপায় হলো—শিশু থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ পর্যন্ত সকল শ্রেণির সাধারণ ও শিক্ষিত পাঠকের জন্যে উপযোগী আকিদাভিত্তিক বই-পুস্তক রচনা করা এবং সেগুলোর সহজলভ্য ও ব্যাপক প্রচলন নিশ্চিত করা। পাশাপাশি মসজিদের বয়ান, দৈনন্দিন তালিম, ওয়াজ মাহফিল এবং বিভিন্ন সভা-সেমিনারের মাধ্যমে এসব বই ও বিষয়বস্তুর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরি করতে হবে।
বিশেষভাবে আকিদা চর্চার গুরুত্ব, এর প্রয়োজনীয়তা এবং বিশুদ্ধ ইসলামী বিশ্বাসের মৌলিক দিকগুলো সাধারণ মানুষের সামনে ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করা জরুরি। যেন সমাজের তৃণমূল থেকে শুরু করে সর্বস্তরে বিশুদ্ধ আকিদা চর্চার একটি ব্যাপক জাগরণ সৃষ্টি হয়—আমাদের প্রচেষ্টা হওয়া উচিত সেদিকেই।

সতর্কতার কথা বলতে গেলে সর্বপ্রথম যে বিষয়টি গুরুত্ব পায়, তা হলো—প্রাতিষ্ঠানিক হোক কিংবা সামাজিক, সর্বস্তরের আকিদা চর্চাই আহলে হক উলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হওয়া। কারণ আকিদার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল; এখানে সামান্য বিচ্যুতিও ব্যক্তিকেবিভ্রান্তির দিকে নিয়ে যেতে পারে।

মনে রাখা জরুরি–  ইসলাম কখনোই উলামায়ে কেরামের দিকনির্দেশনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক জ্ঞানচর্চা বা গবেষণাকে উৎসাহিত করে না—চাই তা আকিদা সংশ্লিষ্ট হোক বা অন্য কোনো বিষয়। ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে উলামায়ে কেরামের মূলধারা থেকে আলাদা হয়ে জ্ঞানচর্চা করতে গিয়ে মানুষ বিভ্রান্তি ও পথভ্রষ্টতার শিকার হয়েছে। তাই আকিদা চর্চার ক্ষেত্রে এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। 

আর দ্বিতীয়ত যে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়, তা হলো—আকিদার ক্ষেত্রে সব ধরনের প্রান্তিকতা, বাড়াবাড়ি ও গোঁড়ামি পরিহার করা। কারণ এসব প্রবণতার ফলেই সমাজে বিভক্তি, বিশৃঙ্খলা ও অনৈক্যের সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে শরীয়তের সঠিক মেজাজ ও ভারসাম্যের পরিপন্থী নানা ভ্রান্ত ধারণা সাধারণ মানুষের মনে স্থান করে নেয়। এর ফলে ইসলামের মূল চেতনা ও সৌন্দর্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তাই আকিদা চর্চার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভারসাম্য, প্রজ্ঞা ও সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হওয়া অত্যন্ত জরুরি। সব ধরনের অতি বাড়াবাড়ি ও বিভ্রান্তি থেকে বেঁচে থেকে বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য আকিদার চর্চাই হওয়া উচিত আমাদের মূল লক্ষ্য। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ ও আমলের তাওফিক দান করুন। 

 লেখক: তরুণ লেখক, শিক্ষার্থী( ইসলামি ফিকহ)

 এমএম/