
|
ইলমের সঙ্গে জীবনের দক্ষতা: কওমি শিক্ষার সামনে নতুন বাস্তবতা
প্রকাশ:
২৭ জুন, ২০২৬, ০৫:৫৪ বিকাল
নিউজ ডেস্ক |
|| আবদুল আহাদ সালমান || বাংলাদেশের কওমি মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা মুসলিম সমাজের একটি ঐতিহ্যবাহী ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই ধারার শিক্ষা কুরআন, হাদিস, ফিকহ, তাফসির, আরবি ভাষা এবং ইসলামের নৈতিক মূল্যবোধ সংরক্ষণ ও প্রচারে অসামান্য ভূমিকা পালন করে আসছে। ধর্মীয় নেতৃত্ব, সামাজিক দিকনির্দেশনা এবং ইসলামের মৌলিক শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষায় কওমি আলেমদের অবদান অনস্বীকার্য। তাই এই শিক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্ব নিয়ে কোনো বিতর্কের অবকাশ নেই। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর চতুর্থ দশকে এসে বাস্তবতা বদলেছে। বিশ্বায়ন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব (4IR), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডিজিটাল অর্থনীতি এবং দ্রুত পরিবর্তিত কর্মবাজার মানুষের জীবন ও জীবিকার ধারণাকেই পাল্টে দিয়েছে। এই পরিবর্তনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আজ সামনে এসেছে। একজন শিক্ষার্থী যখন ১০ থেকে ১৫ বছর কওমি মাদরাসায় অধ্যয়ন শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন, তখন তিনি আধুনিক জীবনের বাস্তব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য কতটা প্রস্তুত? এই প্রশ্ন অস্বস্তিকর হতে পারে, কিন্তু উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ইসলামি ইতিহাস কী শিক্ষা দেয়? অনেকে মনে করেন, দ্বীনি ইলমের সঙ্গে পেশাগত দক্ষতার কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ ইসলামি ইতিহাস সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। ইসলাম কখনো জ্ঞানকে ধর্মীয় ও পার্থিব এই দুই ভাগে বিভক্ত করে দেখেনি। বরং মানুষের কল্যাণে উপকারী সব জ্ঞানকেই গুরুত্ব দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা:) নবুয়তের পূর্বে একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। খুলাফায়ে রাশেদীনের মধ্যে হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত উসমান (রা.) ছিলেন তৎকালীন আরবের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) মদিনায় হিজরতের পর শূন্য হাতে শুরু করেও নিজের ব্যবসায়িক দক্ষতার মাধ্যমে অন্যতম সফল উদ্যোক্তায় পরিণত হন। তাঁদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ইসলামের দাওয়াত, সমাজকল্যাণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। পরবর্তী যুগেও একই ধারা দেখা যায়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ছিলেন একজন প্রখ্যাত ফকিহ, আবার একই সঙ্গে সফল কাপড় ব্যবসায়ী। ইবনে সিনা চিকিৎসাবিজ্ঞানে, আল-খাওয়ারিজমি গণিতে, ইবনে খালদুন সমাজবিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে বিশ্বসভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছেন। কিন্তু তাঁদের সবার ভিত্তি ছিল ইসলামী শিক্ষা। অর্থাৎ, জীবিকার জন্য দক্ষতা অর্জন কখনো দ্বীনি ইলমের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং তারই পরিপূরক। মেধার প্রাচুর্য, কিন্তু সুযোগের সীমাবদ্ধতা কওমি শিক্ষার্থীদের মেধা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। দীর্ঘ সময় ধরে কঠিন আরবি গ্রন্থ অধ্যয়ন, ফিকহি বিতর্ক বিশ্লেষণ, হাদিসের সনদ মুখস্থ রাখা এবং গভীর মনোযোগের সঙ্গে গবেষণা করার যে সক্ষমতা তারা অর্জন করেন, তা অসাধারণ মানসিক দক্ষতার পরিচয় বহন করে। কিন্তু সমস্যাটি মেধার নয়; সমস্যাটি কর্মসংস্থানের। প্রতি বছর হাজার হাজার ফারেগ আলেম দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করে বের হচ্ছেন। অথচ তাঁদের সামনে কর্মক্ষেত্র হিসেবে প্রধানত তিনটি পথই খোলা থাকে। মসজিদের ইমামতি, মাদরাসায় শিক্ষকতা কিংবা খতিবের দায়িত্ব। এসব পেশা অত্যন্ত সম্মানজনক হলেও বাস্তবতা হলো, পদসংখ্যা সীমিত এবং অনেক ক্ষেত্রেই পারিশ্রমিক বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় যথেষ্ট নয়। ফলে একটি পদের বিপরীতে অসংখ্য যোগ্য আলেমকে প্রতিযোগিতা করতে হয়। অনেকেই দীর্ঘদিন কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তায় ভোগেন। এটি শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। নতুন যুগের নতুন সম্ভাবনা বর্তমান বিশ্বের কর্মক্ষেত্র আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বৈচিত্র্যময়। কওমি শিক্ষার্থীদের ভাষাগত দক্ষতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, গবেষণার অভ্যাস এবং অধ্যবসায় সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের সম্পদে পরিণত হতে পারে। ভাষান্তর ও দোভাষী পেশা: আরবি, উর্দু ও বাংলা ভাষায় দক্ষ শিক্ষার্থীরা যদি আধুনিক আরবি উপভাষা এবং ইংরেজিতে পারদর্শী হন, তবে আন্তর্জাতিক অনুবাদ, কূটনৈতিক মিশন, আন্তর্জাতিক সংস্থা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। ইসলামি ব্যাংকিং ও ফিন্যান্স: বিশ্বব্যাপী ইসলামি অর্থনীতি দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। ফিকহুল মুয়ামালাতের জ্ঞানকে আধুনিক ব্যাংকিং, হিসাববিজ্ঞান ও অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে কওমি আলেমদের জন্য একটি বিশাল কর্মক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল দক্ষতা: গ্রাফিক ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং, কনটেন্ট রাইটিং, অনলাইন শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভিন্ন সেবায় প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির চেয়ে দক্ষতার মূল্য বেশি। সঠিক প্রশিক্ষণ পেলে বহু আলেম ঘরে বসেই বৈধ উপায়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারেন। ই-কমার্স ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন: সততা, বিশ্বস্ততা ও নৈতিকতার শিক্ষা কওমি শিক্ষার্থীদের অন্যতম শক্তি। অনলাইন ব্যবসা, প্রকাশনা, ইসলামি বই, শিক্ষা-প্রযুক্তি বা হালাল উদ্যোক্তা উদ্যোগে এই মূল্যবোধ তাদের বড় সম্পদ হতে পারে। কীভাবে এই পরিবর্তন সম্ভব? পরিবর্তনের অর্থ কখনোই মূল পাঠ্যক্রম পরিবর্তন নয়। দারসে নিজামির মৌলিক কাঠামো ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রেখেই সহায়ক দক্ষতা যুক্ত করা সম্ভব। এক্ষেত্রে কয়েকটি বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, সাপ্তাহিক ছুটি কিংবা রমজানের অবকাশে স্কিল ডেভেলপমেন্ট ক্যাম্পের আয়োজন করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, দাওরায়ে হাদিস শেষে বা পড়াশোনার পাশাপাশি তিন থেকে ছয় মাসের ইংরেজি, কম্পিউটার, অফিস অ্যাপ্লিকেশন, বুককিপিং, ডিজিটাল মার্কেটিং বা ফ্রিল্যান্সিংয়ের স্বল্পমেয়াদি কোর্স চালু করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, কওমি শিক্ষা বোর্ড কিংবা বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে বিশেষায়িত আইটি ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। চতুর্থত, ছাত্রজীবন থেকেই ক্যারিয়ার কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি, যাতে একজন শিক্ষার্থী বুঝতে পারেন, দ্বীনি খেদমতের পাশাপাশি কীভাবে সম্মানজনক জীবিকা অর্জন করা সম্ভব। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন: মানসিকতার প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মানসিকতার পরিবর্তনও অত্যন্ত জরুরি। হালাল উপার্জনের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল হওয়া ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে, ‘কেউ নিজের হাতের উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো ভক্ষণ করেনি।’ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী একজন আলেম সমাজে আরও স্বাধীনভাবে সত্য কথা বলতে পারেন। তিনি কারও অনুগ্রহের ওপর নির্ভর না করে মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পারেন। একই সঙ্গে তিনি অন্যের সহযোগিতা গ্রহণের পাশাপাশি প্রয়োজনে অন্যের সহযোগীও হতে পারেন। সময়ের দাবি আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি প্রযুক্তি, ভাষা কিংবা উদ্যোক্তা দক্ষতা অর্জন করছে। অন্যদিকে কওমি মাদরাসার বহু মেধাবী শিক্ষার্থী এখনও জানেন না, তাঁদের ভাষাগত ও গবেষণাগত দক্ষতাকে কীভাবে আধুনিক কর্মক্ষেত্রে কাজে লাগানো যায়। এটি মেধার সংকট নয়; এটি তথ্য, দিকনির্দেশনা এবং প্রশিক্ষণের সংকট। আমাদের এমন আলেম প্রয়োজন, যিনি মিম্বারে কুরআন-হাদিসের আলো তুলে ধরবেন, আবার নিজের পরিবারকেও সম্মানজনকভাবে পরিচালনা করতে পারবেন। যিনি ইসলামের অর্থনৈতিক নীতিমালা ব্যাখ্যা করবেন, আবার বাস্তব জীবনে হালাল উপার্জনের সফল উদাহরণও হবেন। যিনি সমাজের কাছে শুধু সাহায্যপ্রার্থী নন, বরং সমাজের উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি। কওমি মাদরাসা যুগ যুগ ধরে আখিরাতমুখী মানুষ গড়ে তুলেছে। এখন সময় এসেছে সেই মানুষগুলোকে দুনিয়ার বাস্তব জীবনেও আরও আত্মনির্ভরশীল, দক্ষ এবং সক্ষম হিসেবে গড়ে তোলার। দ্বীনি ইলম মানুষের চরিত্র, নৈতিকতা ও আখিরাতকে সুন্দর করে; আর জীবনমুখী দক্ষতা সেই নৈতিকতাকে বাস্তব জীবনে কার্যকর করার শক্তি দেয়। ইলম ও দক্ষতার এই সমন্বয় যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে আগামী দিনের কওমি আলেমরা শুধু মসজিদের মিম্বারেই নয়, দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, গবেষণা এবং সমাজ বিনির্মাণের প্রতিটি স্তরেও গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দিতে পারবেন। কওমি শিক্ষার মূল দর্শন অক্ষুণ্ন রেখেই সময়োপযোগী দক্ষতার এই সংযোজনই হতে পারে আগামী দিনের সবচেয়ে দূরদর্শী ও সোনালি বাস্তবতা। লেখক: প্রেসিডেন্ট, পর্তুগাল বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (পিবিসিসিআই); সম্পাদক, ইউরোবাংলা |